সাম্যের কবি কাজী নজরুল লিখেছেন, ‘কোনো কালে একা হয়নি ক’ জয়ী পুরুষের তরবারি, প্রেরণা দিয়াছে, শক্তি দিয়াছে বিজয়-লক্ষ্মী নারী’। নজরুলের জন্য নারী কখনো প্রেরণার অবতার, কখনো শক্তির প্রতীক, আবার কখনো বিজয়ের কান্ডারি। ইতিহাসের পাতা উল্টে পাল্টে দেখলে বোঝা যায়, যুগে যুগে নারীকে সবচেয়ে বেশি দেখা হয়েছে পুরুষের চোখ দিয়ে, নারীর চোখে খুব নগণ্যই। সেখান থেকে বের হয়ে নারীর সামাজিক, রাজনৈতিক অধিকার আদায়ে লড়ে গেছেন নারীবাদী লেখকেরা (যাদের সিংহভাগই নারী)।
উপমহাদেশের বেগম রোকেয়া, মহাশ্বেতা দেবী, ইসমাত চুগতাই, অরুন্ধতী রায়ের মতো নারীবাদী চিন্তক এবং লেখকরা স্ব-স্ব অবস্থানে থেকে আওয়াজ তুলে গেছেন, তুলছেন। তবুও একটা দিনকে নারী দিবস হিসেবে উদযাপনের জন্য কটাক্ষ নেহাতই কম শুনতে হয় না, সেটা নারী-পুরুষ উভয় পক্ষ থেকেই। যার জন্যই হয়তো বলা হয়, পিতৃতন্ত্রের ধ্বজাধারী পুরুষ যত না ভয়ংকর, নারী পিতৃতান্ত্রিক হলে তার চেয়ে বেশি ভয়ংকর হয়। নারীর প্রতি নারীর নিপীড়নের ঘটনাও দিবালোকের মতোই প্রকাশ্য। অন্য নারীর প্রতি হয়ে যাওয়া অন্যায় দেখলেও তাই আমরা নারীরা প্রায়শই চুপ থাকি। যে কয়টি প্রতিবাদ নারীদের পক্ষ থেকে আসে তাদের নামের আগে যুক্ত হয়ে যায় কিছু বিশেষ বিশেষণ যা কিনা পিতৃতন্ত্রের ধারক-বাহক।
মেট্রোরেলের নারীদের জন্য নির্ধারিত বগিতে উঠলে নারী হিসেবে নারীর প্রতি অসহানুভূতির তিতা রূপ দেখা যায়। হয়তো একজন গর্ভবতী নারী দাঁড়িয়ে আছেন, কয়েকবার বলার পরে গিয়ে হয়তো কোনো সহৃদয়বান নারী জায়গা ছেড়ে দিয়েছেন অন্য নারীটির জন্য। তখনই বোধ করি, আমিই যদি আমার মতো আরেকজনের প্রতি সহানুভূতি না দেখাতে পারি তাহলে অন্য কেউ কীভাবে দেখাবে?
কেন নারী দিবস? নারীর নিজের জন্যেই নারী দিবসের জরুরত। আমি সমাজের সর্বোচ্চ সুবিধাভোগী ৩০ শতাংশ নারীদের মধ্যে বিরাজ করি যার পড়াশোনার সুযোগ ছিল, পরিবার সচ্ছল ছিল বিধায় সামাজিক নিরাপত্তা খানিক ছিল। কিন্তু সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্নে আসলে এখন মনে পড়ে, আদৌ তেমন কিছু বর্তমানে আছে কি? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন আমাদের দৈনন্দিন তথ্য সংগ্রহের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। প্রতি মুহূর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীর প্রতি কুরুচিকর মন্তব্য, মব ট্রায়াল এবং ক্রমাগত বুলিং দেখলেই সামাজিক নিরাপত্তার একশ-একশ অবস্থা সম্পর্কে আমাদের স্বচ্ছ ধারণা হয়ে যায়।
প্রতিবারই দেশে নারীর নিরাপত্তা খর্ব হচ্ছে নারীর পোশাক, সুনির্দিষ্ট সময়ের পরে নারীর ঘরের বাহিরে অবস্থানকে পুঁজি করে। নারী কেমন পোশাক পরিধান করবে, ঠিক কতটুকু সময়ের মধ্যে নারী ঘরে ফিরবে সেটার মাপকাঠিই বা কী তা আদৌ জানা নেই।
দেশে একের পর এক ঘটে যাওয়া নারী নিপীড়ন ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি বরং যাবতীয় অন্যায়কে আরো প্রশ্রয় দেয়। যার জন্য তনু হত্যা মামলা কিংবা কল্পনা চাকমার নিখোঁজের ২৮ বছর পেরোলেও দৃশ্যত কোনো অগ্রগতি দেশের মানুষ দেখেনি। অথবা বিপুল অর্থ-প্রতিপত্তির কাছে মুনিয়ার মতো অসহায় নারীরা ন্যায্য বিচার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়। আমরা বরং অভ্যস্ত এটা দেখে কীভাবে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের পরও ফুলের মালা দিয়ে বরণ করা হয় হেনস্তাকারীকে, তাকে সমাজে বাহবা দেয়া হয়, চাকরিতে স্বপদে বহাল রাখার জন্য জনতার মিছিল হয়।
যত দিন না নারী তার অধিকার, তার আশপাশের নারীর অধিকার আদায়ে সচেতন হবে, তত দিন তার প্রতি ঘটে যাওয়া নিপীড়ন কমবে না। ছোটবেলায় পড়েছি, একটা দুয়ার বন্ধ তবে হাজার দুয়ার খোলা। নারীর অধিকার আদায়ের বেলাতেও বুঝি ঠিক একই সুর। নারী দিবসের প্রেরণা তবে তাই হোক।










