বহুল কাঙ্ক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। কয়েকটি কেন্দ্রে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলেও ব্যাপক রাজনৈতিক সহিংসতা বা কোনো ধরনের প্রাণহানির ঘটনা ছাড়া ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। এজন্য সরকার, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও রাজনৈতিক দলগুলো অভিনন্দন পেতেই পারে। বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন নিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের যে অঙ্গীকার ছিল তা ভোট আয়োজনের মাধ্যমে পূরণ হলো। এবার এ নোবেলজয়ীর অন্যতম চ্যালেঞ্জ শান্তিপূর্ণভাবে জয়ী রাজনৈতিক দল বা জোটের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ভোট প্রদান শেষে বলেন, ‘ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ, প্রার্থীদের সংযম ও নির্বাচনসংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের পেশাদারত্ব—এই সম্মিলিত প্রচেষ্টাই প্রমাণ করেছে যে গণতন্ত্রের প্রতি আমাদের অঙ্গীকার অটুট। জনগণ তাদের সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।’ দেশের মানুষ তার এ কথায় আস্থা রাখতে চায়।

গতকাল সকাল সাড়ে ৭টায় দেশের ২৯৯টি সংসদীয় আসনে একযোগে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলে। এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন।

ভোটগ্রহণের পর থেকে সবার চোখ ফলাফলের প্রতি। গত দেড় দশকের অভিজ্ঞতা দেশের নাগরিকদের শিখিয়েছে, ভোটের দিন যতই শান্তিপূর্ণ হোক, ফলাফল যদি বিশ্বাসযোগ্য না হয় তবে পুরো প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। ‘রাতের ভোট’, কারচুপি, প্রশাসনিক পক্ষপাত, কেন্দ্র দখল—এসব অভিযোগ শুধু নির্বাচনের ভাবমূর্তিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেনি; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থাও ক্ষয় করেছে। ফলে এবারের নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ফলাফলে যেন অবিকৃতভাবে জনগণের রায়ের প্রতিফলন ঘটে। এ ফলাফল যদি সঠিক ও নির্ভরযোগ্য হয়, তবেই অনুষ্ঠিত নির্বাচন হবে দীর্ঘদিনের অনাস্থা কাটিয়ে ওঠার প্রথম বড় অর্জন। আর যদি এ ঘিরে প্রশ্ন থেকে যায়, তবে ভোটগ্রহণের সব সাফল্যই প্রশ্নের মুখে পড়বে। তাই সরকার ও নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রত্যাশা হলো ভোটের রায় যেন বিশ্বাসযোগ্য করে জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়। বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন, গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ অনেকাংশেই নির্ভর করছে নির্ভরযোগ্য ফলাফলের ওপর।

দীর্ঘ দেড় দশকের এক রুদ্ধশ্বাস সময় পার করে বাংলাদেশ নির্বাচনী ব্যবস্থায় পদার্পণ করেছে। এবারের নির্বাচন বেশকিছু কারণে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, ১৫ বছর ধরে স্থবির হয়ে পড়া নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে পুনরায় সচল করা, অথবা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনী ব্যবস্থায় পদার্পণ; দ্বিতীয়ত, নির্বাচনী প্রক্রিয়াটিকে স্থায়ী রূপ দেয়ার জন্য একটি টেকসই রাজনৈতিক বন্দোবস্ত নিশ্চিত করা।

স্বাধীনতার পর নিয়মতান্ত্রিক ও বিশ্বাসযোগ্য ভোটের সংস্কৃতি তৈরি করতে না পারা ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের কোনো স্বীকৃত পথ বের করা যায়নি। ফলে যিনি বা যারা ক্ষমতায় যান, তারা আইনকানুনের মারফত এমন সব বন্দোবস্ত করেছেন যে তাদের নামাতে জনগণকে রাজপথে নামতে হয়েছে। জীবন বিসর্জন দিতে হয়েছে, পঙ্গুত্ব বরণ করে নিতে হয়েছে। সর্বশেষ জুলাই গণ-অভ্যুত্থান তারই নজির। গতকাল অনুষ্ঠিত ভোট অতীতের রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সংকট কাটিয়ে ওঠার অন্যতম ধাপ হিসেবে বিবেচিত হবে।

নির্বাচনী ফলাফল পাওয়ার মাধ্যমে দেশবাসী নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করবে। পাঁচ বছর পরপর জনগণ যেন নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ ও শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার পালাবদল ঘটাতে পারে, ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় আর যেন কোনো নাগরিকের রক্ত ঝরাতে না হয়—এটা নিশ্চিত করার যে লড়াই, তাতে সবাই প্রবেশ করবে। পাশাপাশি যে সংস্কারের জিকির রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো হরদম জপে যাচ্ছেন, সেটিকে বাস্তবায়নের জন্য আমাদের দীর্ঘমেয়াদি সক্রিয়তা দরকার।

তবে বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নির্বাচনী ফলাফলের পরও যেন রাজনৈতিক দল এবং দলীয় কর্মীরা সর্বোচ্চ সহনশীলতা বজায় রাখে। এমনটাই প্রত্যাশা সবার। আর ভোট গণনা ও ফলাফল প্রকাশে প্রশাসন এবং রাষ্ট্রপক্ষকে সর্বোচ্চ নিরপেক্ষতা দেখাতে হবে।

বিগত তিনটি নির্বাচনে মানুষ স্বাভাবিকভাবে ভোট দিতে পারেনি। ভোটের অধিকার ছিল না। সেসব নির্বাচন রাতের ভোট নামে অভিহিত হয়েছে। বুথের মধ্যে ভূত বসে আছে বলে নানা সময়ে অভিযোগ উঠেছে। এসব বিষয় নির্বাচন ব্যবস্থা ও ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়াকে কলুষিত করে ফেলেছিল। কিন্তু প্রত্যাশিতভাবে এবারের নির্বাচনে জনগণ স্বাধীন এবং নির্ভয়ে ভোটের অধিকার প্রয়োগ করেছেন। সব পক্ষ অর্থাৎ ভোটার, রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্রপক্ষ এবং নির্বাচনী প্রশাসন এ নির্বাচনকে আলাদা বৈশিষ্ট্যময় করে তুলেছে।

তবে মনে রাখা প্রয়োজন, নির্বাচন আয়োজনই গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য যথেষ্ট নয়। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহনশীলতা বজায় রাখা, স্থিতিশীলতা ধরে রাখা প্রয়োজন। এর মধ্যে একটি হলো, ভোটারদের নিজেদের সহনশীলতা। অন্য দলকে ভোট দিয়েছে মনে করে কারো বিষয়ে অসহিষ্ণু হওয়া যাবে না, কারো প্রতি সহিংস আচরণ করা যাবে না। তাই ভোটারদের সহনশীল হতে হবে। বিশেষ করে দলীয় কর্মীদের মধ্যে সহনশীলতা অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া সবচেয়ে জরুরি হলো ফলাফল মেনে নেয়ার সহনশীলতা।

যারা নির্বাচিত হবেন, তারা সরকারি এবং বিরোধী পক্ষ হবেন। দুপক্ষেরই গুরুদায়িত্ব থাকবে এটি। নির্বাচনের পর সরকার গঠন দ্বিতীয় পদক্ষেপ। সরকার ও বিরোধী দল মিলে কার্যকর সংসদ তৈরি করা হচ্ছে তৃতীয় পদক্ষেপ। তার পরের পদক্ষেপ হচ্ছে, সুনির্দিষ্ট কর্মসূচির মাধ্যমে মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণের প্রচেষ্টা।

নির্বাচনে যারাই আসবেন নিজেদের বিজয়ী হিসেবে চিন্তা না করাই ভালো। তাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে ভাবতে হবে। এ জায়গায় মানসিক পরিবর্তন দরকার। তাদের চেষ্টা হতে হবে জাতীয় ঐক্যকে সংহত করা। সর্বস্তরের জনগণ যেন মনে করতে পারে, নির্বাচনের মাধ্যমে আনা পরিবর্তনের যাত্রায় সবাই একজন সহযাত্রী। আর এর সবটাই নির্ভর করবে প্রকৃত ফলাফল এবং শান্তিপূর্ণ ও দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তরের ওপর।