একমাত্র বিনিয়োগের মাধ্যমেই নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, কোনো একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ দিয়ে যদি তার আকার বড় করা যায় তবেই নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা যায়। অথবা কোনো এলাকায় যদি একটি নতুন হাসপাতাল তৈরি করা হয় কিংবা রাস্তা করা হয়, তবে তার ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় অনেক নতুন ব্যবসা তৈরি হয়ে যায়, ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। তবে এর মাঝে রয়েছে শুভংকরের ফাঁকি! বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্যই এ লেখা।
তার আগে দেখা যাক দেশে প্রতি বছর কত লোক নতুন করে কাজ খোঁজে কিংবা বলা যায় কর্মক্ষম হয়ে কাজে যোগদানের উপযুক্ত হয়। দেশে প্রায় ৭০ শতাংশ পরিবার এখনো গ্রামবাসী। কিছু তথ্য দিয়ে শুরু করি। প্রায় ৪ কোটি ২৫ লাখ পরিবারের মধ্যে ২ কোটি ৪৪ লাখ পরিবার জড়িত কৃষিকাজে, ৬৪ লাখ পরিবার অকৃষিকাজে এবং ১ কোটি ১৬ লাখ পরিবার উভয় কাজে জড়িত। মোট ১৭ কোটি জনগণের মধ্যে মাত্র সাত কোটি শ্রমজীবী। প্রায় ৮৫ লাখ লোক কানাবিনা বা কাজে নেই বিদ্যালয়ে নেই অথচ বয়সে তরুণ (অর্থাৎ ৩০ বছরের কম)। কানাবিনার প্রায় ৬২ শতাংশই নারী। কানাবিনার প্রায় ৩৪ লাখের বয়স ১৫-১৯ বছর, ২৪ লাখের বয়স ২০-২৪ এবং ২৫ লাখের বয়স ২৫-২৯ বছর। কর্মসংস্থানের জন্য এ ৮৫ লাখকেই প্রথমে নজরে আনতে হবে। দেশে পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ জনগণ বেকার। তবে উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে প্রায় ১৪ শতাংশ বেকার।
এত সংখ্যার একটি সারমর্ম দিই। বেকারত্বের হার সামগ্রিকভাবে বেশ কম, কারণ বেকার হিসেবে থাকার সামর্থ্য অনেকেরই নেই। কিছু না করলে অনেকেই বা তাদের পরিবার আধাপেট বা না খেয়ে থাকতে পারে এ ভয়ে অনেকেই যেকোনো কাজই করে। বিএ/এমএ পাস করে পিয়নের কাজে পড়ে আছে এমন সংখ্যা কম নয়। যেখানে গার্মেন্ট কারখানায় শ্রমিকের স্বল্প শিক্ষাগত যোগ্যতা হলেই চলে, সেখানেও আমি উচ্চশিক্ষিত মহিলাকে কাজ করতে দেখেছি। কারণ তাদের বেকার থাকার সুযোগ নেই। তাই উচ্চ শিক্ষিত বেকার মানে হলো তাদের পরিবারের বেকার লালন করার সামর্থ্য রয়েছে। সংখ্যা দিয়ে বললে বলা যায় যে মোট ২৬ লাখ (৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ) বেকারের মধ্যে প্রায় নয় লাখই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষিত। প্রায় আট লাখ উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে বসে আছে, পাঁচ লাখ মাধ্যমিক পাস করে বসে আছে, প্রায় তিন লাখ প্রাথমিক বিদ্যালয় পাস করে বসে আছে। লক্ষ করে থাকবেন যে যত শিক্ষিত তত বেশি বেকার। অন্য অর্থে তাদের পরিবার তাদের ভরণপোষণের ক্ষমতা রাখে তাই তারা কানাবিনা।
বলা বাহুল্য যারা কাজ করছে তাদেরও একটি বিশাল অংশ না পেরে যৎসামান্য আয়ে কাজে যোগ দিয়েছে। তারা তাদের শিক্ষাগত কিংবা দক্ষতা অনুযায়ী কাজ খোঁজে পায়নি, কিন্তু তারা বেকার হিসেবে পরিবারের ওপর নির্ভর করে বসে থাকতে পারছে না। তাই যেকোনো কাজে লিপ্ত।
এ রকম একটি দেশে কর্মসংস্থান তৈরি করার প্রচেষ্টা যেমন জরুরি, তেমনি সংখ্যাটি মাথায় রেখে কর্মযজ্ঞ তৈরি করা উচিত। অন্যথায় প্রচেষ্টা ব্যর্থ হতে পারে। মোট কথা কার জন্য কর্মসংস্থান করা উচিত তার একটি নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান থাকা উচিত।
আরো কিছু তথ্য দিই। সম্প্রতি একটি গবেষণা কাজে কিছু বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের পরিসংখ্যান দেখছিলাম সেখানে যা পেলাম তাতে দেখলাম বেশকিছু প্রশিক্ষণার্থী স্কুল বা কলেজের ছাত্র কিন্তু প্রশিক্ষণের জন্য টাকা পাওয়া যায়, তাই তারা সাময়িকভাবে কলেজ ছেড়ে প্রশিক্ষণে যোগ দিয়েছে এবং প্রশিক্ষণ শেষে আবার কলেজে ফেরত গিয়েছে। অর্থাৎ তারা ভাতার জন্য প্রশিক্ষণ নিয়েছে। প্রশিক্ষণ এবং সরকারি অর্থ উভয়ই জলে গিয়েছে। আইসিটি মন্ত্রণালয় একবার অতি উৎসাহে সারা দেশে স্বকর্মসৃষ্টির লক্ষ্যে হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নিয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল যারা প্রশিক্ষণ দেবে তারাই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেবে। দেখা গেল আমরা আর মামারা এর সঙ্গে যোগ দিয়েছে। বলা ছিল প্রশিক্ষণের পরবর্তী ছয় মাসের কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দিলেই প্রশিক্ষণদাতা পূর্ণ অর্থ পাবে। দেখা গেল ভারতসহ বিভিন্ন দেশের ভুঁইফোঁড় কোম্পানি এসে সব অর্থ গায়েব করে দিল। প্রশিক্ষণ দিল নামকাওয়াস্তে। কাজ দিল হাওয়ায় অর্থাৎ ইন্টারনেটভিত্তিক গায়েবি কোম্পানিতে। প্রশিক্ষণার্থী জানাল যে আমরা প্রশিক্ষণ পেয়েছি। কারণ না বললে তারা ভাতা পাবে না। আরো বলল কাজও পেয়েছি। কারণ তা না বললে কোম্পানি তাদের সহায়তা করবে না। সব পরিশ্রম জলে গেল। কারণ যারা প্রশিক্ষণ দিল তাদের এ দেশে কোনো ভিত্তি নেই। তারা এসেছিল কারণ বিশ্বব্যাংকের প্রজেক্ট সেখানে এমন সব শর্ত দিয়েছিল যে তাদের মতো কোম্পানিগুলোই এমন কাজের যোগ্য ছিল।
বলতে পারেন কী করা যায়? কীভাবে কর্মসংস্থান তৈরি করা যায়? কাজটিকে কয়েকভাবে ভাগ করে দিই। প্রথমত, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে যদি প্রতিষ্ঠিত দেশী কোম্পানি নতুন বিনিয়োগ করে তাদের কর্মপরিধি বৃদ্ধির জন্য। দ্বিতীয়ত, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে। যেমন রাস্তা তৈরি হলে বা উন্নত হলে যাতায়াত ও সেবা খাতে কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। তবে তা নির্ভর করবে যাতায়াত ব্যবস্থায় কী নিয়মনীতি বিদ্যমান তার ওপর। যেমন ধরুন আমাদের দেশে এক রুটের বাস অন্য রুটে যাতায়াত করতে পারে না। কারণ বাস মালিক সিন্ডিকেট রয়েছে। বাস মালিক সমিতির অনুমতি ব্যতিরেকে নতুন বাস রুটে নামতে পারে না। উদাহরণ স্বরূপ তীব্র যানজট থাকা সত্ত্বেও ঢাকায় নতুন বাস নামছে না। কেন? চামড়া নেই, রঙ নেই, বাতি নেই এমন লক্কড়-ঝক্কড় বাস ঢাকায় চলছে। পৃথিবীর কোন কোন দেশে এমন বাস রাজধানীতে পাবেন? আবার সরকার একীভূত বাস ব্যবস্থা গত তিন-চার বছরেও চালু করতে পারেনি। এছাড়া অন্য রকম প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। একবার যাচ্ছিলাম ঢাকার বাইরে একটি মাইক্রোবাস ভাড়া করে। বিজয় স্মরণীর মোড়ে সার্জেন্ট গাড়িটি দাঁড় করাল। ড্রাইভার আমাকে বলল স্যার বলবেন আপনার অফিসের গাড়ি। বললাম আমি বলতে পারব না। আমার পক্ষে এমন জলজ্যান্ত মিথ্যা বলা প্রায় অসম্ভব। ধরা পড়ে যাবে। অবস্থা বুঝে সে বলল। আচ্ছা স্যার। সার্জেন্ট এলেন না একজন কনেস্টবল এলেন। গাড়ির কাগজ চাইলেন। বললেন স্লিপ আছে কিনা। ড্রাইভার বলল না। আমাদেরকে দেখলেন অতঃপর ড্রাইভারকে বললেন ওদিকে আস। কিছুক্ষণ পর ড্রাইভার এল গালাগাল দিতে দিতে। গাড়ি চলল। জিজ্ঞেস করলাম কী হলো। বলল স্যার টাকা দিতে হলো। বললাম ওই স্লিপটা কী? জানাল—মাসিক মাসোহারা। ওটা দেয়া থাকলে টাকাটা লাগত না। কত টাকা? যতদূর মনে পড়ে বলেছিল ৮ হাজার টাকা মাসিক। হুম। বললাম দাওনি কেন? স্যার আমি তো সবসময় যাই না। মাঝেমধ্যে ভাড়ায় যাই। তাই করিনি। অনেক টাকা। আমি তো কেবল সপ্তাহের ছুটির একদিন কাজ করি। মাসে চারদিন। এ মাসোহারায় পোষায় না। অনেক সময় নানা নিয়ম অনিয়ম সৃষ্টি করে। অন্য কথায় বলা যায়, নিয়ম তৈরি হয় যেন ঘুস চলে সেজন্য। প্রায় সব সেক্টরেই এ রকম হাজারো নিয়ম বিদ্যমান। তাই যারা উদ্যোগী তারা কিছু করতে পারে না। নিয়ম তাদের আটকে দেয়। যে দেশে লাখ লাখ বেকার সে দেশে কাজ তৈরি করাকেই সরকারের বাহবা দেয়া উচিত। প্রতি বছর নতুন কর্মসৃষ্টির জন্য কর রেয়াত দেয়া উচিত।
কর্মসৃষ্টি করার আরেকটি ক্ষেত্র হলো সুযোগ তৈরি। যেমন ধরুন এখন সাপ্তাহিক ছুটি দুদিন। অনেক সময় তা তিনদিনও হয়। যদি বন্ধটি ছুটির সঙ্গে হয়। অনেকে মনে করেন এর ফলে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আসলে তা নয়। যারা কর্মজীবী তারা ছুটিতে নানা স্থানে যায়। কেউ বাড়িতে, কেউ বেড়াতে। যেখানেই যাবে সেখানেই সে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করবে। তাই কোথাও দেখবেন যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নত হবে, সংখ্যা বাড়বে। কোথাও হোটেল, রেস্টুরেন্ট কিংবা পর্যটন ব্যবস্থা বৃদ্ধি পাবে। নতুন কর্মসংস্থান হবে। তাই দেখবেন অনেক দেশেই তারা যেকোনো বন্ধ ছুটির দিনের সঙ্গে দেয়। সপ্তাহের মাঝখানে দেয় না। তাতে কর্মসংস্থান বাড়ে। সাপ্তাহিক ছুটি দুদিন হলে পর্যটন শিল্পের প্রসার হয়। নতুন সেবা খাত সৃষ্টি হয়।
তবে কর্মের সুযোগ সৃষ্টি করা যায় বিনিয়োগের মাধ্যমেও। আমি দেখেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু ছাত্রের নানা ব্যবসায়িক ধারণা আছে। তারা এ ধারণাকে বিনিয়োগে রূপান্তর করতে পারছে না, কারণ বিনিয়োগ করার মতো ব্যবস্থা দেশে নেই। একসময় সম্ভবত সোনালী ব্যাংকের এক উদ্যমী এমডি স্বকর্মসংস্থানের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি ব্যবসা ধারণার ভিত্তিতে ডাক্তারদের চেম্বার কিংবা ক্লিনিক স্থাপনের জন্য বিনাবন্ধকে ঋণ দিয়েছিলেন। বাস কিনে দিয়েছিলেন। দোকান তৈরি করে দিয়েছিলেন। যতদূর মনে পড়ে তার নাম ছিল লুৎফুর রহমান। অনেক ক্ষেত্রেই তাই ব্যাংক ব্যবস্থার মাধ্যমে কর্মের নতুন সুযোগ তৈরি করা যায়। তবে সেক্ষেত্রে ব্যাংক ব্যবস্থায় কিছুটা পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। যেকোনো ব্যবসার আংশিক মালিকানা ব্যাংকে রেখে নতুন উদ্যোক্তাকে ঋণ দেয়া যায়। তাতে ব্যবসা লোকসান হলে ব্যাংক তার দায়িত্ব গ্রহণ করে নতুন কোনো উদ্যোক্তাকে যুক্ত করতে পারে। অনেকটা ইক্যুইটি ফাইন্যান্সিং। অনেকে ঘরে বসে নানা ব্যবসায় লিপ্ত কিন্তু ঋণ নিতে পারছেন না ফরম ফিলাপের ভয়ে। এমন সব নিয়ম-কানুন যে কনসালট্যান্ট ছাড়া কিছু করা যায় না। অথচ দেখুন কভিডের সময় আমাদের এ ঘরোয়া উদ্যোক্তারাই ঘরে বসে ফেসবুকে লাইভ করে দেশের অর্থনীতিকে বাঁচিয়েছিলেন। তাদেরই আমরা বড় করার সুযোগ দিচ্ছি না। কারণ তাদেরকে বিশেষ ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা আমরা তৈরি করিনি।
আবার দেখুন কোনো এলাকায় একটি হাসপাতাল তৈরি করলেই দেখা যাবে হাজারো নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়ে যায়। হাসপাতালের ভেতরে নয়। বাইরে। যেমন দেখবেন ওষুধের দোকান। থাকার হোটেল। খাবার দোকান। ইত্যাদি। প্রয়োজন সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে হাসপাতাল স্থাপন। একবার আসামে একটি বেসরকারি হাসপাতাল উদ্বোধন অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। স্বাস্থ্যমন্ত্রী পেশায় ডাক্তার নন। তিনি ছিলেন প্রধান অতিথি। বললেন কোনো সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার যদি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার কাজে যোগ দেন তারা যেন সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে তা করেন। নচেৎ নতুন কর্মসংস্থান হবে না। তিনি কঠিন শাস্তির হুঁশিয়ারি দিলেন। আমার আক্কেল গুড়ুম। আমাদের পাশের দেশেই যা সম্ভব আমাদের দেশে তা অসম্ভব। কারণ আমরা অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করেছি। শুধু তাই নয় সব বিখ্যাত হাসপাতাল ঢাকায় তৈরি করেছি। তাতে ঢাকায় চাপ বাড়ছে।
যানজটের ঢাকা। ঢাকা দেশের রাজধানী। অথচ দেখুন এখানে ট্রাফিক লাইট অচল। এ একবিংশ শতাব্দীতে! পৃথিবীর কয়টি দেশের রাজধানীতে ট্রাফিক লাইট অচল সেই অংকে আমাদের গিনিস বুক অব রেকর্ডে স্থান পাওয়ার যোগ্য। পুলিশের গাড়ি উল্টো চলে। লাল বাতিতে পুলিশ গাড়ি চালাতে বলে, সবুজ বাতিতে থামিয়ে দেয় এমন সব ঘটনা ঢাকাতেই সম্ভব। কারণ? আমাদের পুলিশ রঙকানা। আমি নিজে গাড়ি চালাই। তাই এতসব চোখে পড়ে। অবাক হই কিন্তু কী করব বুঝে পাই না।
কেবল ঢাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে চলছে কিম্ভুতকিমাকার ব্যবস্থাপনা। হাজার হাজার লোক বর্জ্য সংগ্রহে ব্যস্ত। হাজার হাজার লোক বর্জ্য বিভাজনে ব্যস্ত। আমার এক গবেষণায় পেলাম ঢাকায় এক্সরে প্লেটও ফেলা হয় না। বর্জ্য ব্যবসায়ীরা পরিত্যক্ত এক্সরে প্লেট থেকে রুপার খাদ বের করে নেয়। একটি পানির বোতল ঢাকায় ৫ ভাগ করে পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে তোলা হয়। একটি বলপেন ৭ ভাগ করে পুনর্ব্যবহার করা হয়। ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এই ব্যবস্থা ব্যবসাও নয়, শিল্পও নয়। ব্যাংক ব্যবস্থা তাকে স্বীকৃতি দেয় না। তারা ঋণও পায় না। অথচ দেখুন বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ প্রকল্পে সরকার হাজার কোটি টাকার ব্যর্থ প্রকল্প তৈরি করছে। ভেবে দেখুন যে দেশে বাতাসে আর্দ্রতা বছরে ছয় মাস প্রায় ৮০ শতাংশ বা তার ওপর, যা কখনই ৪০ শতাংশের নিচে নামে না এবং যে দেশে বৃষ্টির পরিমাণ বছরে ২ মিটার সেই দেশে আমরা বর্জ্য জ্বালিয়ে বিদ্যুৎ তৈরির চেষ্টা করছি। অথচ যে দেশ এ কৌশল আমাদের দিয়েছে তাদের বার্ষিক বৃষ্টির পরিমাণ বছরে ৮৬ সেন্টিমিটার। এ রকম ভেজা বর্জ্য জ্বালিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করে যদি কেবল রোদ কিংবা ব্যাকটেরিয়া দিয়ে সার তৈরি করতাম, তবে আমাদের কত টাকার বৈদেশিক মুদ্রা বেঁচে যেত? অন্যদিকে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ করতে গেলে আমাদের লোকসান তো হবেই তদুপরি বিদেশী ঋণগ্রস্ত হচ্ছি। বিদেশী সাহায্য এবং বিদেশে অবস্থানকারী দেশী বা বিদেশী বিশেষজ্ঞের ‘সহায়তায়’ আমরা কেবল ঋণগ্রস্তই হচ্ছি।
কেবল ট্রাফিক অব্যবস্থা দূর করলে কী পরিমাণ কর্মযজ্ঞ বাড়বে তা বলাইবাহুল্য। বালি শহরে এক চমৎকার ব্যবস্থা দেখে এসেছিলাম। ইন্দোনেশিয়ার বালি শহরে আমাদের মতো মানুষের আধিক্য। বাস ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম বাসগুলো যেখানে-সেখানে দাঁড়ায় না। কী ব্যাপার। তারা নির্দিষ্ট প্লাটফর্মে গিয়ে দাঁড়ায়। কিছুটা অবাক হয়ে দেখলাম। প্রতিটি প্লাটফর্ম ২ ফুট চওড়া কিন্তু ৩ ফুট উঁচু। একদিকে সিঁড়ি। অন্যদিকে হুইল চেয়ার ওঠার র্যাম্প। ভাবলাম আচ্ছা বিশেষ ব্যবস্থা! বাসের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, তাদের দরজা তিনটি উঁচুতে। আমাদের দেশের বাসের মতো দরজায় সিঁড়ি দিয়ে ওঠার ব্যবস্থা রাখেনি। প্লাটফর্ম থেকে সরাসরি বাসে হুইল চেয়ার চলে যায়। আর এ ব্যবস্থার ফলে বাসগুলো যেখানে-সেখানে আঁকাবাঁকা হয়ে রাস্তা বন্ধ করে যাত্রী ওঠানামা করতে পারে না। কী চমৎকার ব্যবস্থা। হুইল চেয়ারের জন্য বিলাতের ব্যবস্থা ভিন্ন। তারা সেখানে বাসকে একদিকে কাত করে দেয় যেন হুইল চেয়ার যাত্রী সহজেই বাসে ওঠেন। বালি শহর নতুন ব্যবস্থা নিয়েছে, কারণ সেখানেও বাস যেখানে সেখানে থামানো হতো আর তাতে সারা শহরে ট্রাফিক জটলা লেগে থাকত। তাদের ব্যবস্থা সহজ, কম খরচের এবং এক ঢিলে দুই পাখি মারার মতো। এজন্যই উন্নত দেশের বিশেষজ্ঞদের বিশেষ জ্ঞান অনেক সময় আমাদের দেশে অচল।
সব আলোচনাতে আমি একটি বিষয়ে প্রাধান্য দিয়েছি। সরকার কম খরচে, কম ঋণগ্রস্ত হয়ে কী করে অধিক কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে। তবে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান তৈরিতে এসব ব্যবস্থা অনেকটা অকেজো। আগামীতে তা নিয়ে লিখব আশা করি।
অধ্যাপক এ কে এনামুল হক; একজন অর্থনীতিবিদ ও বর্তমানে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক










