মানব পাচার একটি গুরুতর অপরাধ। দেশে এ অপরাধের মামলা হয়। কিন্তু সাজা হয় খুবই কম। এ অপরাধের সাজা কম হওয়ায় মানব পাচার ক্রমেই বাড়ছে। অভিযোগ আছে, মানব পাচারের মতো অপরাধের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং পুলিশের কিছু সদস্যও যুক্ত থাকায় এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। রাজনৈতিক অবহেলা এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত করার ক্ষেত্রে সাহায্য করছে। দৃশ্যত রাষ্ট্রের তরফ থেকে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় মানব পাচারকারীরা সক্রিয় থাকছে সবসময়ই। মানব পাচারের ঘটনায় মামলাও হয়েছে। কিন্তু শাস্তি কিংবা সাজার নজির খুবই কম। ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত মানব পাচারের অভিযোগে মামলা হয়েছে মোট ৪ হাজার ৫৪৬টি। এতে আসামি করা হয়েছে ১৯ হাজার ২৮০ জনকে। বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে সাজা হয়েছে কেবল ১৫৭ জনের। এর মধ্যে ২৪ জনের যাবজ্জীবন ও ১৩৩ জনকে দেয়া হয়েছে অন্যান্য মেয়াদে সাজা। অর্থাৎ এসব মামলায় সাজা হয়েছে ১ শতাংশেরও কম, অর্থাৎ দশমিক ৮১ শতাংশ। এসব মামলায় গুরুতর অভিযোগ থাকলেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির কোনো নজির নেই। মানব পাচার বন্ধ করতে হলে রাষ্ট্রকেই উদ্যোগ নিতে হবে। সঠিক তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত হলেই এ ধরনের অপরাধ কমে আসবে।

দেশে মানব পাচার বন্ধ করতে হলে সরকারকে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সাজাও নিশ্চিত করা জরুরি। এর বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপ নেয়া না হলে কোনোভাবেই মানব পাচার বন্ধ করা যাবে না। বাস্তবতা হলো বাংলাদেশে মানব পাচারের বিরুদ্ধে কোনো সরকারকেই দৃশ্যত কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। বরং বিগত সময়ে সরকারঘনিষ্ঠরাই মানব পাচারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। এমনকি সব সরকারের আমলেই মানব পাচারের সিন্ডিকেট সক্রিয় থেকেছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে ছোটখাটো মানব পাচারকারী ধরা পড়লেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকেছে মূল অপরাধীরা। এখনো সক্রিয় রয়েছে মানব পাচারের সিন্ডিকেট। সরকারের কঠোর অবস্থান না থাকায় অনেকেই মানব পাচারকে কম ঝুঁকির ব্যবসা হিসেবে বেছে নিয়েছে। বাংলাদেশে মানব পাচার প্রতিরোধ করতে না পারার অন্যতম বড় কারণ হচ্ছে বিচারহীনতা ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। কিন্তু জাতিসংঘের মানব পাচার প্রটোকল-২০০০-এ নির্দেশনা রয়েছে পাচারকারীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা। যেসব মামলা চলমান রয়েছে সেখানে শক্ত তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনতে সক্রিয় হওয়া দরকার। যতক্ষণ না অপরাধীদের বিরুদ্ধে জোরালো আইনি পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে ততক্ষণ পাচার একটি কম ঝুঁকির ও উচ্চ লাভের কাজ হিসেবেই বিবেচিত হবে। তবে মানব পাচার বন্ধ করতে হলে দেশের অভিবাসন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। মানব পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশের কার্যক্রমগুলোকে ভুক্তভোগী-সহায়ক করে গড়ে তুলতে হবে, যাতে নারী-পুরুষ বা তরুণ-বয়স্ক সব ভুক্তভোগী অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেবা পায়। এর অর্থ হলো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও দাতাগোষ্ঠীর ব্যাপক প্রচেষ্টার সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতে ভুক্তভোগীদের সেবা জোরদার করা জরুরি। সেই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, চিকিৎসা এবং মানসিক, সামাজিক, আইনি ও পুনর্বাসনসেবাও নিশ্চিত করা উচিত।

বিদেশে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষ অভিবাসনের পথ বেছে নেন। প্রবাসী বাংলাদেশীদের পাঠানো আয় দেশের অর্থনীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে সম্ভাবনাময় এ খাত দীর্ঘদিন ধরে মানব পাচার সিন্ডিকেটের অপতৎপরতায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনিয়ম, দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের কারণে জনশক্তি রফতানির নিরিখে দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ শ্রমবাজার মালয়েশিয়ায় গত বছরের ৩১ মে বন্ধ হয়েছে। এর আগেও একই অভিযোগে একাধিকবার তা বন্ধ হয়েছিল। একই অভিযোগে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপের বড় বড় শ্রমবাজার থেকেও একাধিকবার বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেয়ার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। এসব কারণে অনেকেই অবৈধ পথে বিদেশে যেতে তৎপর হয় এবং মানব পাচারের সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছেন। অবৈধ পথে বিদেশে গিয়ে সেসব দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা পাচারকারী চক্রের হাতে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। দুর্নীতি, সিন্ডিকেটের কারসাজির প্রভাব পড়েছে বৈধ অভিবাসীদের ওপরও। তাদের অনেকেই দালালদের প্রতারণার ফাঁদে পড়ে গন্তব্যে গিয়ে কাজ পাননি। অর্থাৎ সিন্ডিকেট চক্র ও দালালদের দৌরাত্ম্যে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জীবন যেমন ঝুঁকির মুখে পড়ছে, তেমনি বিশ্বের শ্রমবাজার ক্ষতিগ্রস্ত ও দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। এসবের কোনো কিছুই অপ্রকাশিত নয়। গণমাধ্যমগুলোয়ও প্রায় এ-সংক্রান্ত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ পেয়েছে। তথ্যপ্রমাণসহ এর সঙ্গে জড়িতদের নামও সেসব প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে কোনো সরকারের আমলেই মানব পাচার সিন্ডিকেট ও দালালদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান বা কঠোর কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি।

বৈশ্বিক অভিবাসীর উৎস তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ। কর্মসংস্থানের জন্য প্রতি বছর বিদেশে পাড়ি দেন গড়ে অন্তত ১০ লাখ মানুষ। এ মানুষগুলোর জীবনের নিরাপত্তা দেয়া সরকারেরই দায়িত্ব। দালাল চক্র যেন অবৈধ পথে কর্মী পাঠানো, মানব পাচারের মতো অপরাধ করতে না পারে সেজন্য নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে এসব অপরাধ রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে ঘটতে দেখা যায়। সুতরাং সিন্ডিকেট, রিক্রুটিং এজেন্সি, দালাল—সবার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা প্রয়োজন। যাতে ভবিষ্যতে মানব পাচারের নতুন কোনো সক্রিয় সিন্ডিকেট তৈরি না হয়। পাশাপাশি বহির্বিশ্বে অভিবাসন খাতে দেশের ভাবমূর্তি ফেরানো প্রয়োজন।

ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখা বা মানব পাচার রোধে বিগত সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। বরং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মানব পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে খোদ সরকারি দলের নেতাকর্মী, মন্ত্রী-এমপিদের বিরুদ্ধে। কেউ কেউ বিদেশে গ্রেফতার হয়ে জেলও খেটেছেন। গণ-অভ্যুত্থানের মুখে এ সরকারের পতন ঘটেছে। দায়িত্ব নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। দায়িত্ব গ্রহণের দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও এ বিষয়ে তেমন কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি। তবে প্রত্যাশা রয়েছে, সরকার মানব পাচার চক্রের বিরুদ্ধে শিগগিরই দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেবে।

মানব পাচার নির্মূলে বাংলাদেশের আইনে যেসব দুর্বলতা রয়েছে, সেগুলো কাটিয়ে উঠতে জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, পেনাল ল, পুলিশ অ্যাক্ট, সিআরপিসি, এভিডেন্স অ্যাক্ট হয়েছিল মূলত লুণ্ঠন, শোষণ ও নিষ্পেষণের জন্য। যাতে বাংলা ও ভারতবর্ষ থেকে সম্পদ ইংল্যান্ডে সহজে পাচার করা যায়। ১৮৬০ সালের আইন দিয়ে যদি ২০২৫ সালে বিচার করতে হয় তাহলে আইনের কঠোর প্রয়োগ সম্ভব নয়। কারণ এ আইন এখন ব্রিটেনেও নেই। এ আইনে যারা পাচারকারী চক্রের মূল হোতা তাদের সাজা হয় না। সাজা হয় শুধু মানব পাচার চেইনের মধ্যবর্তী অবস্থানে থাকা পাচারকারী বা দালালদের। তাই মানব পাচার আইনকে আরো যুগোপযোগী করে শক্তিশালী করতে পদক্ষেপ দরকার, যাতে মূল অপরাধীদের বিরুদ্ধে শক্তভাবে ব্যবস্থা নেয়া যায়।

বাংলাদেশ বৈধ অভিবাসনের মাধ্যমে অর্জিত রেমিট্যান্স দিয়েই অর্থনীতির মজবুত ভিত্তি গড়তে সক্ষম হয়েছে। বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের অভিবাসী শ্রমিকদের ভালো ভাবমূর্তি ছিল। কিন্তু মানব পাচারের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এ ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সুতরাং জাতীয় স্বার্থেই এখন মানব পাচার বন্ধ করতে হবে। এক্ষেত্রে কালক্ষেপণ না করে মানব পাচারের ঘটনায় যেসব মামলা হয়েছে সেগুলো সঠিকভাবে তদন্ত করার পাশাপাশি অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। মানব পাচার বন্ধ করতে হলে দুটি বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া দরকার। মানব পাচার অপরাধের যেন বিচার হয় এবং অপরাধী যাতে পার পেয়ে না যায়। এক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একসঙ্গে গুচ্ছ পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করলে সুফল আসবে বলে আশা করা যায়।