তবে এ শিল্প বর্তমানে অর্থনৈতিক সাফল্যের পাশাপাশি এক গভীর পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। দেশের মোট গ্রিন হাউজ গ্যাস নির্গমনের ১৫ দশমিক ৪ শতাংশের জন্য দায়ী এ খাত। ফলে এটিকে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রথাগত উৎপাদন ব্যবস্থার গণ্ডি পেরিয়ে একটি কার্যকর ও ন্যায়সংগত জ্বালানি রূপান্তরের পথে হাঁটা জরুরি হয়ে পড়েছে।

বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বিশ্ববাসীর উৎকণ্ঠা অনেকখানি বেড়েছে। শিল্প বিপ্লবের কারণে সৃষ্ট গ্রিন হাউজ গ্যাসের নিঃসরণ কমিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারিত হয়েছে। এদিকে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্রেতা ও ভোক্তারাও বলছেন, ইউরোপের কঠোর পরিবেশগত নীতিমালা মেনে চলতে হলে এ খাতকে অবশ্যই আরো পরিবেশবান্ধব হতে হবে, নৈতিক উৎপাদনচর্চাও বাড়াতে হবে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পোশাক খাত একটি জটিল সন্ধিক্ষণে উপনীত হয়েছে। আমাদের সামনে এখন একটাই পথ; ন্যায়সংগত জ্বালানি রূপান্তরে অবশ্যই যেতে হবে। তবে তা এমনভাবে হতে হবে, যাতে সবাই একসঙ্গে এগিয়ে যায়, কেউ পিছিয়ে না পড়ে।

ন্যায়সংগত জ্বালানি রূপান্তরের অর্থ কী?

আমরা যখন ন্যায়সংগত জ্বালানি রূপান্তরের কথা বলছি, তা কেবল সোলার প্যানেলে যাওয়া অথবা জ্বালানি দক্ষ মেশিন ও ডিজিটাল সরঞ্জামের ব্যবহারই বোঝায় না। এটি আসলে একটি ব্যাপক বিষয়, যা করতে হবে ন্যায়সংগতভাবে, অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে। এক্ষেত্রে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যেসব কর্মী দিন-রাত পরিশ্রম করে শিল্পকে বর্তমান পর্যায়ে এনেছেন, অগ্রগতির নামে তাদের একপাশে ঠেলে দেয়া হবে না। এ ধরনের জ্বালানি রূপান্তর এমন একটি ভবিষ্যৎ তৈরি করে দেবে, যা একই সঙ্গে পরিচ্ছন্ন ও সহমর্মিতাপূর্ণ হবে।

যদিও এ ধরনের পরিবর্তন সহজ নয়। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির দিকে অগ্রসর হওয়ার অর্থ চাকরির বাজারে পরিবর্তন, এমনকি চাকরি হারানোর আশঙ্কাও থাকতে পারে, বিশেষ করে যদি কিছু কাজ পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে প্রয়োজনীয়তা হারায়। এমনকি পরিবেশবান্ধব চাকরির জন্য যে ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন সেক্ষেত্রে শ্রমিকরা নিজেদের অপ্রস্তুত মনে করতে পারেন। দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ গ্রহণকালেও কর্মীদের অনেকেই সাময়িকভাবে কম আয়ের সম্মুখীন হতে পারেন। সতর্কতার সঙ্গে পরিকল্পনা না করে এ পরিবর্তন করা হলে কারখানার অভ্যন্তরে বিদ্যমান সমস্যাগুলোকে আরো বাড়িয়ে দিতে পারে—যেমন কারখানায় হিট স্ট্রেস বেড়ে যেতে পারে অথবা যাদের ওপর আমরা সবচেয়ে বেশি নির্ভর করি, সেই কর্মীরা কর্মক্ষেত্রে বিরূপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারেন।

এ কারণেই ন্যায়সংগত জ্বালানি রূপান্তরের মধ্যে ‘ন্যায়সংগত’ অংশটি এত গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমিকরা কেবল পণ্য উৎপাদনের জন্যই নয়—তারা শিল্পেরই অংশ, অগ্রগতির অংশীদার। আজ বিশ্বব্যাপী যেকোনো পণ্যের ক্ষেত্রেই ক্রেতা ও ভোক্তারা প্রশ্ন তুলছেন, পণ্যটি টেকসই কিনা, কীভাবে তৈরি করা হয়েছে এবং পণ্যটি কার দ্বারা তৈরি করা হয়েছে। যদি শ্রমিকদের প্রতি যত্নবান হওয়া যায়, তাদের ক্ষমতায়ন ত্বরান্বিত এবং তাদের অধিকারগুলো সুরক্ষিত করা হয়, তবে তা শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতারই অংশ হয়ে ওঠে—এর মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই।

ন্যায়সংগত জ্বালানি রূপান্তরে যাওয়ার জন্য করণীয় কী?

প্রথমত, আমাদের বিনিয়োগ করতে হবে মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে—কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নের ওপর। এর অর্থ হলো সহজলভ্য প্রশিক্ষণ ও পুনঃদক্ষতা কর্মসূচি চালু করা, যাতে শ্রমিকরা, বিশেষ করে নারীরা সবুজ অর্থনীতিতে সাফল্য লাভ করতে পারে। নতুন মেশিন পরিচালনা শেখা হোক অথবা ডিজিটাল সরঞ্জাম বিষয়ে জ্ঞান অর্জনই হোক, এ সহায়তা হতে হবে ব্যবহারিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক।

দ্বিতীয়ত, আমাদের পণ্য বহুমুখীকরণে যেতে হবে। একটি ন্যায়সংগত জ্বালানি রূপান্তর পোশাক খাতকে কেবল পরিবেশবান্ধবই করবে না, বরং শিল্পের পণ্য ভিত্তিকেও আরো বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি করে দেবে। টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, রিসাইক্লিং, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন এবং সার্কুলার ব্যবসায়িক মডেলের মতো সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রগুলো অন্বেষণ করে এগুলোর সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে আমরা নতুন ধরনের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারি এবং প্রচলিত পোশাক উৎপাদনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে পারি। এ ধরনের বৈচিত্র্যকরণ দেশের যুবসম্প্রদায় ও নারীদের জন্য নতুন সুযোগ এনে দিতে পারে, উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে আমাদের অর্থনীতিকে যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকার মতো সক্ষম (রেজিলিয়েন্ট) করে তুলতে পারে।

তৃতীয়ত, কারখানাগুলোকে আরো পরিবেশবান্ধব ও মানসম্মত করে তুলতে হবে। কারখানা ভবনগুলোর নকশা এমনভাবে করতে হবে, যাতে শ্রমিকরা তাপ থেকে সুরক্ষা পান, কর্মক্ষেত্রের প্রতিটি দিক শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব হয়। শোভন কর্মপরিবেশের কথা বললে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির বিষয়টিও সামনে চলে আসে।

সবশেষে, আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে রূপান্তর প্রক্রিয়া ধীরেসুস্থে ও পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়ন হচ্ছে। পরিবর্তনের জন্য পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে এবং শ্রমিকদের বোঝাতে হবে কী ধরনের পরিবর্তন আসছে এবং কেন আসছে।

সুসংবাদ হলো, এ রূপান্তর আমাদের জন্য অপার সম্ভাবনার সুযোগও নিয়ে এসেছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির কথাই ধরা যাক—ভবনের ছাদ ব্যবহার করে সৌরশক্তি উৎপাদন ও নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে জ্বালানি ব্যয় সাশ্রয় এবং কার্বন নির্গমন উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যেতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, এ খাত নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করে বার্ষিক আনুমানিক ১ হাজার ১৫৯ কিলোটন তেল (কেটিওই) সাশ্রয় করতে পারে। জ্বালানি দক্ষতা কারখানাগুলোকে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সুফল প্রদান করে। আর বাংলাদেশ এরই মধ্যে পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানার ক্ষেত্রে বিশ্বে শীর্ষস্থানে রয়েছে; অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় দেশটিতে লিড প্রত্যয়িত কারখানা ভবনের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।

আবার কর্মসংস্থান সৃষ্টিরও বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। পরিচ্ছন্ন জ্বালানি এবং সবুজ প্রযুক্তিতে নতুন নতুন রূপান্তর ঘটছে এবং সঠিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হলে কর্মীরা সেগুলোর সঙ্গে সহজেই খাপ খাইয়ে নিতে পারেন। তবে আমাদের মূল চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে হবে। অর্থায়ন এখনো একটি বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে, এক্ষেত্রে আরো সমন্বিত নীতি-সহায়তার প্রয়োজন। সবুজ প্রযুক্তির ওপর আমদানি কর অব্যাহতি, প্রণোদনা প্রদান এবং সাশ্রয়ী মূল্যে অর্থায়নের বিকল্পগুলোর ব্যবস্থা ভবিষ্যতে অব্যাহত থাকলে আমরা আরো দ্রুত ন্যায়সংগত জ্বালানি রূপান্তরের দিকে এগিয়ে যেতে পারব।

এ রূপান্তরে যাওয়ার জন্য আমাদের সব অংশীদারকে নিয়ে সময়সীমা, লক্ষ্যমাত্রা ও সহযোগিতাসহ একটি স্পষ্ট জাতীয় পথনকশা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে কারখানার মালিক, সরকারি সংস্থা, উন্নয়ন অংশীদার এবং ব্র্যান্ডগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। উল্লিখিত বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য, বিশেষ করে কারখানা পর্যায়ে আরো প্রচারণা চালাতে হবে, যেখানে ন্যায়সংগত জ্বালানি রূপান্তরের ধারণাটি এখনো নতুন। যদিও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রূপান্তর যেভাবে ঘটছে, সেই অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের জন্য মূল্যবান, তবে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে রূপান্তরের ক্ষেত্রে স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হবে।

সর্বশেষ কথা হলো, কারখানার মালিকদের একার পক্ষে এ কাজ করা সম্ভবপর নয়। এ কাজে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতারা, যারা সাপ্লাই চেইন থেকে সুবিধা নিচ্ছেন, তাদেরও এগিয়ে আসতে হবে। আর্থিকভাবে অবদান রেখে, প্রযুক্তি হস্তান্তর করে এবং কর্মী উন্নয়নে সহায়তা করে তারা এ দায়িত্ব পালনে অংশ নিতে পারেন। অন্যদিকে সরকারের উচিত হবে যথাযথ নীতি ও সুরক্ষা দিয়ে খাতটিকে নেতৃত্ব প্রদান করা এবং এ পরিবর্তনের সহস্রষ্টা হিসেবে শ্রমিকদের উপযুক্ত সম্মান দেয়া।

তৈরি পোশাক খাত সবসময়ই বাংলাদেশের লড়াকু জনগণ ও উদ্ভাবনের প্রতীক। আজ আবারো আমাদের নেতৃত্ব দেয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে—এবার আরো সবুজ, ন্যায্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যতের দিকে নেতৃত্ব দিতে হবে। বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন, একটি ন্যায়সংগত জ্বালানি রূপান্তর কেবল টেকসই হওয়ার সঙ্গে যুক্ত বিষয় নয়; এটি সংহতির বিষয়, মর্যাদারও বিষয় বটে। এটি এমন একটি ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার প্রয়াস, যেখানে কেউ পিছিয়ে থাকবে না।

মহিউদ্দিন রুবেল: প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস