চব্বিশের অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আপনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব নেন। দীর্ঘদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ছিল। অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগত মান স্থবির হওয়ার জন্য রাজনীতিকেই দায়ী করছেন। এমন প্রেক্ষাপটে উপাচার্যের দায়িত্ব নেয়ার পর কী কী প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছেন?
গত দুই দশক রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে যারা ছিলেন তারা কোনো ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের অভিভাবকত্ব অর্জন করতে পারেননি। এজন্য দেশে সব প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বিশেষত শিক্ষা ব্যবস্থা নানা ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। এ খাত নিয়ে প্রতিনিয়ত সংস্কার বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। তাতে শিক্ষা ক্ষেত্রই অস্থির হয়েছে। যুগোপযোগী ও টেকসই শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হয়নি। এদিকে রাজনীতিতে ভিন্নমত প্রকাশের সব পথই সরকার বন্ধ রেখেছিল। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের পরও একটি কার্যকর শিক্ষানীতি প্রণয়নে ব্যর্থতা ও মতপ্রকাশের পথ পুরোপুরি রুদ্ধ রাখা দুঃখজনক ও নিন্দনীয়। বিশ্ববিদ্যালয়ও এর বাইরে ছিল না। রাষ্ট্রের অশুভ ও অনাচারের প্রভাব কমবেশি সব উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই ভর করেছে। এমন স্থবিরাবস্থা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তবুদ্ধির চর্চা ফিরে আসতে সংগতই কিছুটা সময় লাগবে। তবে দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে একটা গ্রহণযোগ্য পরিবেশ ফিরে আসার অপেক্ষা করছি। শিক্ষার্থীরা এখন নির্ভয়ে মতামত দিতে পারছেন। এমন একটা পরিবেশ থাকলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও আমরা শিক্ষার গুণগত মান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারব বলেই আমি মনে করি।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে উপাচার্যের দায়িত্ব নেয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশীজনদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকেই আমি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার চেষ্টা করেছি। গত ১৮ মাসে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ৭৬টি নির্ধারিত সভা হয়েছে। অন্যদের সঙ্গে সভা হয়েছে প্রায় ৫০টি। প্রতি সভাতেই ৮-১০ ঘণ্টা সময় দিতে হয়েছে। সভায় অতীতের সব সংকটের বিষয়গুলো উত্থাপিত হয়েছে। তাই এখন সবকিছু পুনর্বিন্যাসের সুযোগ আমাদের সামনে এসেছে। সব প্রতিবন্ধকতা দূর করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে কাজ করে যেতে হবে।
দেশে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বরাবরই টিচিং ইনস্টিটিউট বলা হয়। গবেষণা কার্যক্রমের ক্ষেত্রে বরাদ্দ অপ্রতুল। বিপরীতে এও শোনা যায়, যে পরিমাণ বরাদ্দ দেয়া হয় তাও খরচ করা যায় না। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?
নতুন জ্ঞান সৃষ্টি ও মানবসভ্যতার কল্যাণে তা বিতরণ করাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ। এজন্য পাঠ্যক্রম স্বাভাবিক রাখা অনেক জরুরি। একই সঙ্গে গবেষণার অবারিত সুযোগও তৈরি করতে হয়। গবেষণায় অর্থ বরাদ্দ করতে না পারলে মানসম্পন্ন গবেষণা বাধাগ্রস্ত হয়। আমি উপাচার্যের দায়িত্ব নেয়ার পর গবেষণায় ৫০ শতাংশ বরাদ্দ বাড়িয়েছি। এ পরিমাণ অর্থও পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করি। এ বিষয়ে সরকারি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই সরকারি বরাদ্দের ওপর নির্ভর করে। এটিও এক ধরনের বাস্তবতা যে দেশে রাজস্ব ব্যয়ের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে ঋণ পরিশোধে। এজন্য অনেক সময় বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ কাটছাঁট করতে হয়। শিক্ষা খাতেও সংগতই বরাদ্দ নানাভাবে কমে যায়। এসব কারণে চাহিদার বিপরীতে গবেষণায় বরাদ্দ কম থাকে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা গবেষণা বরাদ্দ রাখাও অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে পড়ছে। এমনটি পরিচালনাগত জায়গার জন্য হচ্ছে। এই যেমন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতে আগের বছরের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে এ বরাদ্দ ইউজিসি সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতে দেয়নি। তারাই এ অর্থের বিতরণ করবে। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা গবেষণা করতে চাইলে এখন থেকে ইউজিসির কাছে আবেদন করতে হবে। এমন পদ্ধতিগত পরিবর্তনে গবেষণার প্রতি শিক্ষকদের আগ্রহ কমবে। ইউজিসির কাছে ছুটতে হবে, আবার আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা মোকাবেলা করতে হবে। গবেষণা খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব আমার ধারণা এ বছর আরো দেখা যাবে। ইউজিসি সবসময়ই বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ আয় বাড়ানোর কথা বলে। সমস্যা হলো, অনেক বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এ সুযোগ সীমিত। সরকার যদি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নীতি তৈরি করে তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রকৃত ব্যয়ের চাহিদা পূরণ করতে পারবে।
ইউজিসি কি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে বলে মনে হয়?
পুরোপুরি না। বিগত সময়ে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কলেবর অনেক বেড়েছে। তবুও ইউজিসি স্বাধীনভাবে অনেক সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছেই। এজন্য অনেক গ্র্যাজুয়েটই কাঙ্ক্ষিত মর্যাদাপূর্ণ কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারছেন না। জনমিতিক লভ্যাংশ আদায়ের সুবর্ণ এক সুযোগ আমাদের সামনে এসেছে। তার পরও কাঠামোগত নানা সমস্যার কারণে আমরা এখনো এগুলো আদায় করতে পারছি না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষা ও শিক্ষাজীবন-পরবর্তী কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর কমিশন করা দরকার। এ কমিশনে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনায় নেতৃত্ব যারা দিচ্ছেন তাদের অভিজ্ঞতাকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এ কমিশন শুধু বরাদ্দের বণ্টন করবে না, শিক্ষার মানদণ্ড নির্ধারণেও কাজ করবে। উচ্চ শিক্ষার মানোন্নয়ন, উৎকর্ষ সাধন—একই সঙ্গে বৃহৎ এ পরিসরকে সংগঠিত এবং যুগোপযোগী করে রাখতে উচ্চ শিক্ষা কমিশন হতে পারে কার্যকর পদক্ষেপ। এ কমিশন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, স্বচ্ছ ও যুগোপযোগী প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে দেশের উচ্চ শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে কাজ করবে।
উপাচার্যের দায়িত্ব নেয়ার পর দীর্ঘদিন পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছে। শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বকারী এ অঙ্গটিকে সক্রিয় করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবুও এখনো কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আগামীতে এটিকে আরো সক্রিয় ও কার্যকর করার বিষয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?
দীর্ঘ ৩৩ বছর পর জাকসু নির্বাচন সম্পন্ন হয়। এখন পর্যন্ত এ নির্বাচন নিয়ে যত ধরনের অভিযোগ এসেছে তা আপিল কমিটির মাধ্যমেই নিষ্পত্তি হয়েছে। তার আগে শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও অবাধ অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ নিশ্চিত করেই এ নির্বাচন হয়েছে। নানা চ্যালেঞ্জ থাকার পরও এর আয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানাতে হয়। প্রায় তিন দশকেরও বেশি সময় ধরেই সিনেটে শিক্ষার্থী প্রতিনিধি ছিলেন না। সংগতই অনেকদিন পর চালু হওয়া সংসদের কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা থেকে গেছে। তবে এটা একটা প্রারম্ভিক যাত্রাও। তরুণ প্রতিনিধিরা তাদের কণ্ঠস্বর হবেন এবং নতুন চিন্তাভাবনার প্রয়োগে বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রায় ভূমিকা রাখবেন—এমনটাই প্রত্যাশিত। এ ধারাটিকেই অব্যাহত রাখার বিষয়ে আমরা বেশি জোর দিতে চাই।
এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাসরুম সংকট, নানা ক্ষেত্রে সেশন জট রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে প্রশাসনিকভাবে কী কী উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে?
শিক্ষার্থীরা যেন ক্লাসরুমের অভাবে পড়ালেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বিঘ্নে শিক্ষাজীবন শেষ করতে পারেন সেটি সবসময়ই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অগ্রাধিকারে থাকে। প্রথমত নতুন একাডেমিক ভবন নির্মাণ ও এখন যে ভবনগুলো আছে সেগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে ক্লাসরুম সংকট মেটানোর চেষ্টা চলছে। প্রয়োজনে ক্লাস রুটিনের পুনর্বিন্যাস ও অবকাঠামোর দক্ষ ব্যবস্থাপনাও করা হচ্ছে। সেশনজট কমাতে নির্ধারিত একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুসরণে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ভর্তি পরীক্ষা, ফল প্রকাশ, কোর্স নিবন্ধন এবং সেমিস্টার পরীক্ষা নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন করার জন্য বিভাগগুলোর সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় করা হচ্ছে। পরীক্ষার উত্তরপত্র দ্রুত মূল্যায়ন এবং ফল প্রকাশের সময়ও কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। এ কাজগুলো অটোমেশনের আওতায় আনার জন্যও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কাজ করছে। অটোমেশনের মাধ্যমে প্রথাগত প্রশাসনিক জটিলতা নানাভাবে কমানো যাবে।
শিক্ষক নিয়োগ, প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় একাডেমিক সহায়তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন করা যায়। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে নানা জটিলতা থাকায় শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রম বন্ধ ছিল। নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করে আমরা নিয়োগের কাজ শুরু করেছি। আশা করছি, প্রকৃত মূল্যায়নের মাধ্যমে আমরা শ্রেণীকক্ষে মেধাবী শিক্ষকদের নিয়োগ দিতে পারব। যখন শ্রেণীকক্ষে শিক্ষাবান্ধব পাঠ দেয়া যাবে তখন অনেক শিক্ষার্থীর উৎকণ্ঠা কমবে।
চলতি বছরই নিরাপত্তা ঘাটতিজনিত কয়েকটি ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটেছে। এ নিয়ে সারা দেশে ব্যাপক তোলপাড় হয়। এসব ঘটনা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের উদ্বেগ যেমন বাড়িয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা জোরদার করতে কী কী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে?
সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক নারী শিক্ষার্থীর ওপর হামলা ও ধর্ষণচেষ্টার অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। জাকসু ও শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সময় নানা ধরনের কর্মসূচি নিয়েছে। দুঃখজনক বিষয় হলেও সত্য, এতদিন পরও অপরাধীকে গ্রেফতার করা যায়নি। আমি ও জাকসুর প্রতিনিধিরা চলতি বছর জুনেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এ বিষয়ে উদ্বেগ জানাই। অপরাধীকে শনাক্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শান্তি নিশ্চিতের দাবি জানাই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে অপরাধীকে গ্রেফতারের জন্য পুলিশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নির্দেশনা দেন। মামলাটিও সিআইডিতে পাঠানো হয়। এক্ষেত্রে সমাধান আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার নিরাপত্তা জোরদারের জন্য প্রশাসনিক উদ্যোগ আলাদাভাবে নেয়া হয়েছে। নিরাপত্তাজনিত সমস্যার জন্য কুইক রেসপন্স টিম গঠন করা হয়েছে। হটলাইন নাম্বার চালু হয়েছে যার মাধ্যমে সবাই অভিযোগ জানাতে পারছেন। বহিরাগত প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের জন্য কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পরিচয়পত্র প্রদর্শন ও লগবুক রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থা চালু, বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত সব নির্মাণ শ্রমিকদের পরিচয়পত্র বহন বাধ্যতামূলক করা এবং তাদের তথ্য প্রকল্প পরিচালকের মাধ্যমে নিরাপত্তা শাখায় জমাদান, দোকান কর্মচারীদের মালিক প্রদত্ত আইডি ও জাতীয় পরিচয়পত্র জমা দেয়ার মাধ্যমে আমরা এ বিষয়গুলোর নিয়ন্ত্রণ করছি। ক্যাম্পাস থেকে সব ধরনের ভ্রাম্যমাণ দোকান অপসারণের পাশাপাশি দোকান কর্মচারীদের তথ্য ডেটাবেজ তৈরি করে আইসিটি সেলের মাধ্যমে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ফটকে দিন-রাত শিফটে নিরাপত্তা প্রহরীর সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। বাড়তি নিরাপত্তা প্রহরী নিয়োগের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবেশ ঠেকাতে অসমাপ্ত সীমানাপ্রাচীরগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শেষ করা হচ্ছে। নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য আসলে সব পক্ষেরই সমন্বিত কার্যক্রম দরকার।
কয়েক বছর ধরে জাবিতে মেধাবী শিক্ষার্থীদের ভর্তির সংখ্যা কমে আসছে বা অনেক শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছেন না এমন খবর পাওয়া যাচ্ছে। অনেক সময় অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়া চলমান থাকায় এখানে ভর্তি হলে পরে ওইসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলে এখানে ভর্তি বাতিল করে চলে যাচ্ছে। মেধাবী শিক্ষার্থীদের আকর্ষণে কী কী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে?
মেধাবী শিক্ষার্থীরা জাহাঙ্গীরনগরে ভর্তি হচ্ছে না—এ তথ্য পুরোপুরি সঠিক নয়। যারা মেডিকেল, বুয়েট কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যাশিত বিষয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে তারা তুলনামূলক বিচার করে নিজ ইচ্ছে অনুযায়ী ভর্তি হচ্ছেন। এ তুলনামূলক বিচার করে অনেকেই অন্য বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়েও এখানে আসেন। অতীতেও এমনই ছিল। বরং সাম্প্রতিক সময়ের অবস্থা দেখলে বলতে হবে, এখানে ভর্তিচ্ছুক শিক্ষার্থীদের আবেদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণেই রয়েছে। আমি দায়িত্বে আসার পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক প্রথম বর্ষেই শিক্ষার্থীরা হলগুলোতে আসন পেয়েছেন। এটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। কারণ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হলেও বিগত সময়ে শিক্ষার্থীরা প্রথম বর্ষেই আসন পেতেন না। এখন পরিবর্তিত অবস্থায় আবারো জাহাঙ্গীরনগরের প্রতি অনেকের আগ্রহ বেড়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়কে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয় নিয়ে চিন্তাভাবনা আছে? শিক্ষার্থীদের কর্মমুখী বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য করার বিষয়ে পরিকল্পনা রয়েছে কিনা?
শিক্ষা-গবেষণার একাডেমিয়া-ইন্ডাস্ট্রিয়া লিংকেজ শিক্ষাক্ষেত্রে এখন নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবনের আনুষ্ঠানিক পর্ব শেষ করার আগেই কর্মপ্রতিষ্ঠানে যুক্ত হওয়ার সুযোগ লাভ করে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এ অনুশীলন অব্যাহত আছে। আমরা এরই মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক চুক্তি (এমওইউ) স্বাক্ষর করছি। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ইন্ডাস্ট্রিও আছে। এর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ানো হচ্ছে। আমাদের শিক্ষার্থীরা অনেক প্রতিষ্ঠানে স্নাতকোত্তর পর্বে ইন্টার্নশিপ করছে। লেখাপড়া এবং ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করার পর অনেকে সেসব প্রতিষ্ঠানে যোগদান করছে। শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সিলেবাস, ইন্টার্নশিপ ও তাদের গবেষণা কর্মমুখী বিভিন্ন শিল্পের সঙ্গে সংযুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে আরো কর্মমুখী উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত করার বিষয়টি আমাদের পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে অংশীদারত্ব বাড়ানোর বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো হয়েছে। শিক্ষার্থীরা যেন শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন না করে, বাস্তব কর্মক্ষেত্রের জন্য উপযুক্ত হয়ে উঠতে পারে তার ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এজন্য ইন্টার্নশিপ, ইন্ডাস্ট্রি ভিজিট, যৌথ গবেষণা, দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, অতিথি বক্তৃতা এবং শিল্প খাতের বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। বিভিন্ন বিভাগের পাঠ্যক্রম সময়োপযোগী করতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কর্মবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে গড়ে তুলতে ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং, সফট স্কিল উন্নয়ন, উদ্যোক্তা তৈরির প্রশিক্ষণ, তথ্যপ্রযুক্তি ও যোগাযোগ দক্ষতা এবং উদ্ভাবনভিত্তিক কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।









