দেশে ক্রমেই বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী ও মৃতের সংখ্যা। ডেঙ্গু প্রতিরোধে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই। বর্ষা মৌসুম সামনে। আবহাওয়া অধিদপ্তর আগামী সপ্তাহের মধ্যেই বৃষ্টি শুরুর কথা বলেছে। এ সময়ে প্রতি বছরই দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা যায়। এবার ডেঙ্গু আরো জোরালোভাবে আগ্রাসী রূপ ধারণ করতে পারে বলে কীটতত্ত্ববিদরাও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। সারা দেশেই ডেঙ্গুর আগ্রাসী রূপের ইঙ্গিত এরই মধ্যে লক্ষ করা যাচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টার মধ্যে পাঁচজনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে বরিশাল বিভাগের চারজন এবং ঢাকা মহানগরের একজন রয়েছেন। আরো ১৫৯ জন ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। অন্যদিকে একই সময়ে দেশে কভিড আক্রান্ত হয়ে আরো দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় নতুন করে ১৫ জনের দেহে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এ ঘটনাও মানুষের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি করছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে করোনা সংক্রমণের উচ্চ হার আমাদেরও ঝুঁকি বাড়িয়েছে। এমন অবস্থায় কভিডের অতীতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার আলোকে ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়া জরুরি। প্রতি বছরই ডেঙ্গু নিয়ে অনেক উদ্যোগ আয়োজনের কথা শোনা যায়। কিন্তু বর্ষা এলে ডেঙ্গুকে প্রতিহত করা যায় না। গত বছর প্রায় প্রতিদিনই মৃত্যু হয়েছে ডেঙ্গুতে। মৌসুম শুরুর সঙ্গে সঙ্গে এখন আবার ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়তে দেখা যাচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে। আশঙ্কা রয়েছে ডেঙ্গু ও কভিডের মতো রোগের বিস্তার প্রতিরোধে সামান্যতম অবহেলা দেশের জনস্বাস্থ্যে নিয়ে আসতে পারে বড় ধরনের বিপর্যয়।
উষ্ণ-আর্দ্র আবহাওয়া, বৃষ্টিপাত, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও বিশৃঙ্খল বজ্র ব্যবস্থাপনার কারণে ধীরে ধীরে মশার স্বর্গরাজ্যে পরিণত হচ্ছে বাংলাদেশ। মশার উৎপাতে অতিষ্ঠ দেশের মানুষ। ডেঙ্গু রোগের বাহক এডিস মশার প্রজনন বেড়ে যায় বর্ষা মৌসুমে। শুধু বর্ষা মৌসুমই নয়, শীতকালেও ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা পাওয়া যাচ্ছে। শীতকালে যখন বৃষ্টিপাত থাকে না তখনো নির্মাণাধীন ভবনের নিচে, বহুতল ভবনের বেজমেন্টে জমা পানি এবং বাসাবাড়ির ড্রাম-বালতিতে জমিয়ে রাখা পানিতে এডিস মশার সফল প্রজনন লক্ষ করা যায়। চলতি বছর শীত শেষে মার্চের মাঝামাঝি থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টির দেখা মিলেছে। এ অবস্থায় পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এপ্রিল থেকেই ডেঙ্গুর সংক্রমণ ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত বর্ষার আগে থেকেই ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। গত বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর ক্ষেত্রে আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। এ বছর সরকারের আরো জোরালো প্রস্তুতি প্রয়োজন। ডেঙ্গুতে মানুষের আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে, কারণ মশার ঘনত্ব বাড়ছে। এ বছর সরকারের ডেঙ্গু প্রতিরোধে আরো তৎপরতা প্রয়োজন। নয়তো পরিস্থিতি সামাল দেয়া কষ্টকর হবে। ডেঙ্গুর বর্তমান অবস্থা জনস্বাস্থ্যের জরুরি অবস্থা সৃষ্টি করেছে। কিন্তু সরকারের পদক্ষেপ এখনো গতানুগতিক। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট। যথাসময়ে এডিস মশার প্রজনন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয় না বিধায় এ সংকট আরো তীব্র হচ্ছে।
বাংলাদেশে ১৯৬৪ সালে ডেঙ্গু আসে, তখন এটিকে ঢাকা ফিভার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ২০০০ সালে ভয়ালরূপে আবির্ভূত হয় ডেঙ্গু। ওই বছর সরকারি হিসাবে ৫ হাজার ৫০০ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয় এবং ৯৩ জন মারা যায়। বাংলাদেশে ডেঙ্গু বড় আঘাত হানে ২০১৯ সালে। এ বছর প্রায় ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয় এবং দেশের ৬৪টি জেলায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ে। সরকারি হিসাব মতে, ২০২২ সালে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা যথাক্রমে ৬২ হাজার ৩২১ ও ২৮১। বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চসংখ্যক মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল ২০২৩ সালে। এ বছর ৩ লাখ ২১ হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। ২০২৪ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১ হাজার ২১৪। এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৭৫। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ১৬১ জন। ফেব্রুয়ারিতে ৩৭৪ জন। মার্চে এ সংখ্যা ছিল ৩৩৬। এপ্রিলে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৭০১।
কীটতত্ত্ববিদরা বলছেন, পূর্ণাঙ্গ মশা মারার চেয়ে তা লার্ভা থাকা অবস্থায় নির্মূলের মাধ্যমে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা সহজ। কিন্তু সরকার সেদিকেও নজর দিচ্ছে না। ডেঙ্গুর চারটি ধরন রয়েছে। প্রথমবার ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে তেমন আতঙ্কের কিছু নেই। দ্বিতীয়বারও ভাইরাসের একই ধরনে আক্রান্ত হলেও ভয়ের কিছু নেই। তবে কেউ যদি প্রথমবার একটি ধরন এবং দ্বিতীয়বার ভিন্ন ধরনে আক্রান্ত হয় তাহলে মৃত্যুঝুঁকি রয়েছে। এক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকি কমানোর জন্য প্রয়োজন ভাইরাস নিয়ে কাজ করা। কেউ যদি আগে থেকে জানতে পারে এবার ভাইরাসের কোন টাইপের প্রকোপ বেশি বা কোন এলাকায় কোন টাইপ ছড়াচ্ছে, তাহলে ডেঙ্গুতে মৃত্যু প্রতিরোধ করা যাবে। ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যার চেয়ে মৃতের সংখ্যা কমানোয় সরকারকে বেশি মনোযোগী হতে হবে। ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা কমানোর জন্য প্রয়োজন বিস্তর গবেষণা ও তথ্য-উপাত্ত। কিন্তু সরকার সেদিকে মনোযোগ দিচ্ছে না। ডেঙ্গু শুরু হলে সরকার উদ্যোগ নেয়, তাতে কাজের কাজ কিছুই হয় না।
তবে আগের ধারাতেই সব হলে ডেঙ্গু সামলানো সম্ভব হবে না। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে চিকিৎসা ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণ না হলে ডেঙ্গুতে মৃত্যু কমানো সম্ভব না। বর্তমান চিকিৎসা ব্যবস্থা ও পদ্ধতির পরিবর্তন করা জরুরি। কোনো ব্যক্তি জ্বরে আক্রান্ত হলেই যেন তিনি পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে পারেন যে তার ডেঙ্গু হয়েছে কিনা। এজন্য কমিউনিটি ক্লিনিকসহ পরীক্ষা ব্যবস্থা মানুষের হাতের নাগালে নিয়ে যেতে হবে। সরকার যদি ডেঙ্গুর চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ পর্যায়—এই তিন ভাগে ভাগ করে চিকিৎসা দেয়, তাহলে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা ও মৃত্যুহার কমানো সহজ হবে। স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতন হলে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা অনেক সহজ হয়ে যাবে। আমাদের অসচেতনতায় ডেঙ্গু ক্রমেই বিধ্বংসী হয়ে উঠছে। এ বিষয়ে সরকারের আরো কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। মশা নির্মূলে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করতে হবে। উৎসস্থলে হাত দিয়ে ডেঙ্গুকে প্রতিরোধ করতে হবে। চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায়ও প্রয়োজনে পরিবর্তন এনে ডেঙ্গুর বিভিন্ন ধরন বিনাশে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়াসহ গবেষণায় মনোযোগী হতে হবে।
এদিকে মাঝখানে দুই বছর করোনা না থাকায় সরকারের কভিড প্রতিরোধ কার্যক্রম কিছুটা স্তিমিত ছিল। এখন আবার করোনা আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। করোনার নতুন ঢেউয়ের আশঙ্কায় হাসপাতালগুলো নতুন করে প্রস্তুতি নেয়া শুরু করেছে। করোনার কিট ও টিকা বাইরে থেকে আরো বেশি আমদানি ও ক্রয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য ও মহামারী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২০ সালে যখন দেশব্যাপী ব্যাপক হারে করোনা সংক্রমণ শুরু হলো তখন যারা কাজ করেছেন, এখনো তারাই আছেন। অল্প কিছু মানুষ হয়তো অবসরে চলে গেছেন। কিন্তু নতুনদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে নিয়মিত। তাই করোনা সামলাতে চিকিৎসকদের আগের মতো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু অক্সিজেনের সাপ্লাই, ডায়াগনোসিস, টেস্ট—সবই পুনরায় দ্রুত চালু করতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। অবহেলা করার সুযোগ নেই। ডেঙ্গু ও কভিড এ বছর যেভাবে চোখ রাঙাচ্ছে, সতর্ক না হলে ভয়াবহ বিপদ হতে পারে। সংশ্লিষ্ট সব বিভাগ প্রতিরোধ ও প্রতিকারে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করবে—এমন প্রত্যাশা সবার।










