জীববৈচিত্র্য রক্ষার বৈশ্বিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত ‘৩০ শতাংশ ভূমি ও জলাধার সংরক্ষণ’-এর লক্ষ্য থাকলেও বাংলাদেশকে বিকল্প বিজ্ঞানভিত্তিক সমাধানের ওপর নির্ভর করতে হবে। এক্ষেত্রে স্থানীয় অংশীদারত্ব বাড়ানোর মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে কার্যকর ও টেকসই করা সম্ভব। এজন্য তৃণমূল পর্যায়ের উদ্যোগ, কমিউনিটিভিত্তিক সংরক্ষণ কার্যক্রম ও স্থানীয় সরকারের সক্রিয় সম্পৃক্ততার মাধ্যমে সমন্বিত কার্যক্রম বাড়ানো জরুরি। বিশ্ব জীববৈচিত্র্য দিবসে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় রয়েছে। কারণ বৈশ্বিক নানা চ্যালেঞ্জের এ সময়ে নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের মাধ্যমে স্থানীয় জীবিকার চাহিদা পূরণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকেও টিকিয়ে রাখা সম্ভব। কিন্তু দেশে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কৌশল ও আইন নির্ধারণ হলেও এগুলোকে বাস্তব প্রয়োগে রূপান্তর করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বণিক বার্তার দুটি বিশেষ প্রতিবেদনেও তার আভাস মিলেছে। এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাদাগাস্কারের শুষ্ক বনের গাছ কৃষ্ণচূড়া যখন ঢাকার কংক্রিটে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, তখন দেশীয় সোনালু, জারুল, কদম আর কুরসির মতো গাছ হারিয়ে যাচ্ছে। একই অবস্থা জলজ বাস্তুতন্ত্রের ক্ষেত্রেও। দেশের নদ-নদীতে একসময়ের প্রাচুর্যশালী দেশী মাগুর, বাঘাইড়, মহাশোল আর শাপলাপাতা মাছও নানা কারণে আজ বিপন্নের তালিকায়। নগর পরিকল্পনায় ভারসাম্যহীন সবুজায়নের উদ্যোগের কারণে দেশীয় ও প্রাণপ্রকৃতির জন্য উপকারী গাছ হারিয়ে যাচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন দাঁড়ায়, এত আইন, এত প্রকল্প আর এত উদ্যোগের পরও কেন এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে?

দেশে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আইনের অভাব নেই। বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২, মৎস্য সংরক্ষণ আইন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইনসহ একাধিক আইনি কাঠামো রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন বিপন্ন প্রজাতির তালিকা তৈরি করেছে আর সিএমএস মূল্যায়ন প্রতিবেদন দিয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তর নতুন প্রকল্প নেয়ার কথা বলছে। অথচ বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বাঘাইড় এখন ‘মহাবিপন্ন’, মহাশোলের দেখা মেলে কালেভদ্রে, দেশী মাগুর ক্রমেই দুষ্প্রাপ্য। আইনগুলো কার্যকর হচ্ছে না কেন? উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, আইন প্রণয়ন আর আইন প্রয়োগের মধ্যে এক বিশাল ব্যবধান বিদ্যমান। নগর উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনে কংক্রিট, ইট বা অন্য কোনো সাশ্রয়ী পদ্ধতি প্রাধান্য পাচ্ছে। গাছের পরিবেশগত উপযোগিতা, শেকড়ের গঠন ও নিরাপত্তার বিষয়টি প্রাধান্য পায় না, বরং একঘেয়ে উন্নয়নের কারণে একই ধরনের গাছ রোপণ করা হয় (এক্ষেত্রে খরাসহনশীল কৃষ্ণচূড়ার উদাহরণ টানা যায়)। এজন্য গত এক দশকে রাজধানীতে দেশীয় জাতের অনেক মূল্যবান গাছ আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। এদিকে জলাশয় সংরক্ষণ, তদারক ও উদ্ধারের কার্যক্রমও প্রয়োজনের তুলনায় কম। নগরীতে পরিকল্পনাহীনভাবে বিদেশী গাছ লাগানো হচ্ছে, অথচ কোথায় কোন গাছ লাগাতে হবে সে বিষয়ে কোনো বাধ্যতামূলক বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা নেই। নদীতে নির্বিচারে বালি উত্তোলন করা হয়, আবাসন ও অন্য চাহিদা মেটাতে জলাভূমি ভরাট ও দখল করা হয়, কৃষিজমিতে যথেচ্ছ কীটনাশক ব্যবহারের ফলে পানি দূষণ ঘটছে। এগুলো আইনবিরুদ্ধ হলেও বন্ধ হওয়ার লক্ষণ নেই। এ সমস্যাগুলোর কারণেই জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বারবার ব্যর্থ হচ্ছি আমরা।

দেশে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে প্রকল্পের সংখ্যা কম নয়। বৃক্ষরোপণ অভিযান প্রতি বছর হয়, নদী পুনরুদ্ধারের কথা ওঠে, মাছের অভয়াশ্রম ঘোষণা পাওয়া যায়। কিন্তু এ প্রকল্পগুলোর বড় অংশই টেকসই হয় না। কারণ প্রকল্পগুলো প্রায়ই লক্ষণভিত্তিক, মূলকারণভিত্তিক নয়। কৃষ্ণচূড়া লাগানো হয় কারণ দ্রুত বড় হয়, সুন্দর দেখায়। অথচ এর শেকড় দুর্বল হওয়ায় দুর্যোগের সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। ধানমন্ডিতে ২০১৬ ও ২০১৮ সালে দুটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর সংশ্লিষ্টদের এ বিষয়ে মনোযোগ বাড়ানো প্রয়োজন ছিল। একইভাবে মাছের অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হলেও নদীর উজানে বাঁধ থাকলে, নদীতে পলি জমলে, পানিতে কীটনাশকের বিষ থাকলে সেই অভয়াশ্রম অর্থহীন। সমস্যার গভীরে না গিয়ে উপরিভাগে সমাধান খোঁজার এ প্রবণতাই প্রকল্পনির্ভর পরিবেশ সংরক্ষণকে ব্যর্থ করে দিচ্ছে বারবার।

জীববৈচিত্র্য সংকটের আরেকটি বড় কারণ হলো বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। মৎস্য অধিদপ্তর মাছ বাঁচাতে চায়, কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ড নদীতে বাঁধ দেয়, কৃষি বিভাগ কীটনাশক ব্যবহারে উৎসাহ দেয়, নগর কর্তৃপক্ষ যেকোনো গাছ লাগায়। একটি সংস্থার সিদ্ধান্ত আরেকটির লক্ষ্য নষ্ট করে দেয়। দেশের ৫২টিরও বেশি আন্তঃসীমান্ত নদীর উজানে বাঁধের কারণে স্বাদু পানির প্রবাহ কমছে, লবণাক্ততা উপকূল ছাড়িয়ে ভেতরে ঢুকছে। এও সত্য, এটি কূটনৈতিক ও পানি ব্যবস্থাপনার সমস্যা। তাই শুধু মৎস্য বিভাগের একার পক্ষে সমাধান সম্ভব নয়। তাই সমন্বিত নীতির মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ জরুরি। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করার প্রবণতাও দায়ী। উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও মৎস্য গবেষকরা দশকের পর দশক ধরে দেশীয় প্রজাতির গাছ ও মাছ সংরক্ষণের বিষয়ে সতর্ক করে আসছেন। বাংলাদেশ ন্যাশনাল হারবেরিয়াম থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা বিভাগের সবাই বলছেন, দেশীয় প্রজাতির গাছ ও মাছ বাঁচাতে বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা দরকার। কিন্তু নীতিনির্ধারণে বিশেষজ্ঞ মতামতের প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগ এখনো দুর্বল। যে কারণে দেখতে সুন্দর ও দ্রুতবর্ধনশীল বলে কৃষ্ণচূড়া লাগানো হয়, বাজারদর বেশি বলে মহাবিপন্ন বাঘাইড় নির্বিচারে ধরা পড়ে। বিজ্ঞানকে উপেক্ষা করে নেয়া সিদ্ধান্তের মূল্য গুনতে হচ্ছে জীববৈচিত্র্য দিয়ে।

জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সংকট গভীর, তবে সমাধানের পথ রুদ্ধ নয়। এজন্য নগর সবুজায়নে বৈজ্ঞানিক বাধ্যবাধকতা প্রবর্তন করতে হবে। কোথায় কোন প্রজাতির গাছ লাগানো হবে তা নির্ধারণে বিশেষজ্ঞ কমিটির মতামত বাধ্যতামূলক করতে হবে। সোনালু, জারুল, কদমের মতো দেশীয় প্রজাতিকে পুনরুদ্ধারে বিশেষ নার্সারি ও সংরক্ষণ কর্মসূচি নিতে হবে। এদিকে নদী ব্যবস্থাপনায় সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি আনতে হবে। বালি উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ, জলাভূমি রক্ষা এবং নদীর ন্যূনতম প্রবাহ নিশ্চিত করতে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। আন্তঃসীমান্ত নদীর ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে কার্যকর কূটনৈতিক আলোচনা জরুরি। কৃষি রাসায়নিক ও শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণে আইনের প্রকৃত প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার যেভাবে নদীর পানিকে মাছের অনুপযোগী করছে, তা ঠেকানো না গেলে কোনো অভয়াশ্রম বা পুনরুদ্ধার কর্মসূচিই কাজে আসবে না। অর্থাৎ কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে পরিবেশ সংবেদনশীল, কিন্তু উৎপাদনশীল সমাধান খোঁজার চেষ্টা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য তথ্যভাণ্ডার তৈরি ও হালনাগাদ রাখতে হবে। দেশের কোন নদীতে কোন মাছ, কোন এলাকায় কোন দেশীয় বৃক্ষ—এ জরিপভিত্তিক তথ্য ছাড়া লক্ষ্যভিত্তিক সংরক্ষণ সম্ভব নয়। জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয়দের রক্ষার স্বার্থে সংকট যেসব জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে সেগুলো সর্বসম্মতভাবে কার্যকর করাও জরুরি।

জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে স্থানীয় অংশীদারত্ব বাড়ানোর বিকল্প নেই। যে মানুষের সঙ্গে জীববৈচিত্র্যের নিবিড় সম্পর্ক তারা যদি এগুলো সংরক্ষণের বিষয়ে সচেতন না হন, তাহলে নির্বিচারে গাছ কাটা বা অবাধে মাছ আহরণ করতেই থাকবে। তাই মানুষকে দেশীয় প্রজাতির সৌন্দর্য ও গুরুত্বও তুলে ধরতে হবে। মানুষকে এ কথা বোঝাতে হবে, জীববৈচিত্র্য কোনো বিলাসিতা নয়। এটি খাদ্যনিরাপত্তা, জলবায়ু অভিযোজন ও মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অধিকাংশই মানবসৃষ্ট কারণে হওয়ার প্রতিকারও খুঁজতে হবে আমাদের।