আজ নতুন সরকার শপথ নেবে। দায়িত্ব নেয়ার পর পরই সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত রমজানে পণ্যের বাজারদর স্থিতিশীল রাখা। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা।

রোজা শুরুর আর বেশি দিন বাকি নেই। এদিকে এরই মধ্যে বিভিন্ন পণ্যের বাজারদর বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে শবেবরাত থেকে রোজার প্রস্তুতি হিসেবে ভোগ্যপণ্যের কেনাকাটা শুরু হলে দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দেয়, যা এখনো অব্যাহত আছে। এ প্রবণতা কাটিয়ে উঠতে না পারলে রমজানজুড়ে নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হবে। তাদের ওপর আর্থিক চাপ আরো বাড়বে।

দেশে সাড়ে তিন বছরের বেশি সময়জুড়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজমান। অন্তর্বর্তী সরকার এর রাশ কিছুটা টানতে সক্ষম হলেও তা সহনীয় পর্যায়ে আনতে পারেনি। বরং তাদের মেয়াদের শেষকালে মূল্যস্ফীতি আবারো বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে টানা চার মাস ধরে খাদ্যমূল্যস্ফীতি বেড়েছে। গত মাসে এ হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে। এর আগে ডিসেম্বরে এ হার ৭ দশমিক ৭১ শতাংশ ছিল বলে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যে উঠে এসেছে। আশঙ্কা রয়েছে, রমজান ঘিরে খাদ্যপণ্যের দাম আরো বেড়ে যাবে।

রমজান মাসে স্বাভাবিকভাবে কিছু ভোগ্যপণ্য—ছোলা, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি ইত্যাদির চাহিদা বেড়ে যায়। এছাড়া বিভিন্ন আমিষ পণ্যের বাড়তি চাহিদাও তৈরি হয়। এসব পণ্যের দামও তিন মাস ধরে বেড়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ইনফ্লাশন ডায়নামিকস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে খাদ্য মূল্যস্ফীতির ৬২ দশমিক ৮ শতাংশই এসেছে আমিষজাতীয় পণ্য থেকে। মূল্যস্ফীতির বাস্কেটে থাকা আমিষজাতীয় খাদ্যপণ্যের মধ্যে ছিল প্রাণিজ মাংস (গরু, খাসি, হাঁস ও মুরগি), মাছ ও শুঁটকি, বিভিন্ন ধরনের ডাল, দুধ ও পনির।

প্রতি বছরই রমজানে তৈরি হওয়া বাড়তি চাহিদার সুযোগ কাজে লাগিয়ে কিছু ব্যবসায়ী পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন, যাতে বেশি মুনাফা লাভ করতে পারেন। ধারণা করা যায়, দেশব্যাপী নির্বাচনকেন্দ্রিক কার্যক্রম চলায় অন্তর্বর্তী সরকার তাদের মেয়াদের শেষ দিকে বাজার ব্যবস্থাপনায় খুব বেশি মনোযোগ দিতে পারেনি, যার প্রভাব রমজানের ভোগ্যপণ্যের দামে পড়েছে। নয়তো ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন ২০২৫ সালের তুলনায় এ বছর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি ও সরবরাহ পরিস্থিতি তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। ডলারের দাম স্থিতিশীল থাকায় আমদানিকারকরা সহজে ঋণপত্র খুলতে পেরেছেন। আগে শতভাগ মার্জিনে এলসি খুলতে হলেও এবার ১০-২০ শতাংশ মার্জিনে আমদানির সুযোগ পাওয়ায় আমদানি বেড়েছে। এছাড়া সদ্য বিদায়ী বাণিজ্য উপদেষ্টাও এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছিলেন যে দেশে রমজানের পণ্যের কোনো সরবরাহ সংকট নেই। বরং আমদানি গত বছরের চেয়ে ৪০ শতাংশ বেশি হয়েছে। যে কারণে রমজানে পণ্যের দাম গত বছরের চেয়ে কম থাকবে। এর পরও নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়াটা একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত। এটি মূলত এক ধরনের অকার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনারই প্রতিফলন।

নতুন সরকার যখন দেশের দায়িত্ব নিচ্ছে, তখন রমজান একেবারে দোরগোড়ায়। এমন পরিস্থিতিতে বলা যায়, সরকারের প্রধানতম চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে রমজানজুড়ে জনগণকে কতটা স্বস্তি দিতে পারবে। অতীতে দেখা গেছে, আগাম প্রস্তুতি ও সমন্বিত উদ্যোগ থাকলে রমজানের বাজার অনেকটাই স্থিতিশীল রাখা সম্ভব। কিন্তু এ বছর নির্বাচনী কার্যক্রমের কারণে তেমন কোনো কার্যক্রম দৃশ্যমান ছিল না। ফলে বাজারে সুযোগসন্ধানী মহলের তৎপরতা বেড়েছে। এর রাশ টানতে নতুন সরকারের জরুরি ভিত্তিতে কিছু কার্যক্রম হাতে নিতে হবে।

এক্ষেত্রে একটি কার্যকর পদক্ষেপ হতে সরকার নির্ধারিত দামে যেন পণ্য বিক্রি হয়, তা নিশ্চিত করা। এজন্য বাণিজ্যসহ কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের সরকারি সংস্থাকে দ্রব্যমূল্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। এছাড়া বাজার ব্যবস্থাপনায় যেসব ঘাটতি রয়েছে সেগুলো দূর করতে হবে। রমজানে দ্রব্যমূল্যের দাম স্বাভাবিক রাখতে অসাধু ব্যবসায়ী ও মজুদদারদের বিরুদ্ধে সরকারকে তৎপর থাকতে হবে। পাশাপাশি ঈদের বাজারে ভোগ্যপণ্যের দামও যেন সহনীয় পর্যায়ে থাকে সেজন্যও সরকারের সচেষ্ট থাকা প্রয়োজন। রমজান ও ঈদে জনগণ যাতে সহনীয় ও স্বস্তিদায়ক মূল্যে ভোগ্যপণ্য ক্রয় করতে পারেন, সেটাই প্রত্যাশা।

তবে এসব তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনতে সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসেবে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি নেয়া হয়েছিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের আমলেই, যা অন্তর্বর্তী সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক অব্যাহত রেখেছে। চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধেও সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি নেয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে এ মুদ্রানীতির আশানুরূপ প্রভাব পড়েনি মূল্যস্ফীতিতে। বরং বাড়তি নীতি সুদহারের প্রভাবে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক শূন্য ১০ শতাংশ, যা ২০ বছরে সর্বনিম্ন। অন্যদিকে বিনিয়োগেও একপ্রকার স্থরিবতা দেখা গেছে। সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিশীলতা কমেছে। অর্থাৎ ব্যবসা-বাণিজ্যসহ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এক ধরনের শ্লথগতি নেমে এসেছে। এর প্রভাবে উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটছে, যা পক্ষান্তরে নানা সময়ে বাজারদর আরো উসকে ‍দিয়েছে। এছাড়া গত বছর সবজির বাজার বেশ চড়া ছিল। বিশেষ করে শীত মৌসুম শুরুর পরও নভেম্বর ও ডিসেম্বরে সবজির দাম তেমন কমেনি। ডিসেম্বরের শেষ দিকে কৃষক পর্যায়ে সবজির দামে বড় পতন হলেও তার সুফল ক্রেতা পর্যায়ে পৌঁছেনি। আবার গত বছর চাল, ডাল, চিনি, আটা, মাছ-মাংস, এলপিজিসহ বেশির ভাগ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। এ কারণে বছরজুড়ে মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশিত মাত্রায় নামিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। যদিও একই সময় বিশ্ববাজারে এসব পণ্যের দাম নিম্নমুখী ছিল।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নেয়ার ক্ষেত্রে সরকারের এসব বিষয় বিবেচনায় রাখা সমীচীন হবে। এক্ষেত্রে প্রথাগত কৌশলের চেয়ে কার্যকর পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নকে সরকার প্রাধান্য দেবে, সেটাই প্রত্যাশা।