ডিজিটাল প্রযুক্তি আমাদের জীবন, যাতায়াত ও যোগাযোগের ধরন আমূল বদলে দিয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ হলো অনলাইন বাস টিকিটিং। শুরুটা হয়েছিল মোবাইল অ্যাপ দিয়ে, কিন্তু এখন এ খাতে টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি—মানুষকে নতুন অ্যাপে ঠেলে না দিয়ে, তাদের পরিচিত ও সহজলভ্য প্লাটফর্মেই সেবা পৌঁছে দেয়া। প্রকৃত ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি মানে হলো মানুষকে তাদের পরিচিত জায়গাতেই পাওয়া।
মোবাইল অ্যাপ শহর ও শহরতলির অনেক মানুষের জন্য যাত্রা সহজ করেছে, সন্দেহ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে এটি নতুন প্রতিবন্ধকতাও তৈরি করেছে। পুরনো ফোনে জায়গার অভাব, গ্রামের দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগ, কিংবা নতুন অ্যাপ ডাউনলোডের অনিচ্ছা—সব মিলিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। যে প্রযুক্তি সুবিধা দেয়ার কথা, তা অনেকের জন্য পরিণত হচ্ছে জটিল বাধায়।
এ বাধা কাটিয়ে ওঠার সমাধান নতুন করে আরো বেশি অ্যাপ আনা নয়, বরং যে সুবিধা মানুষের হাতে রয়েছে সেখানেই দেয়া। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক টিকিটিং ব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত, যা যেকোনো ফোনে চলে, অল্প ডাটা ব্যবহার করে, সহজভাবে তথ্য জানায়, আর টিকিট অফলাইনেও দেখানো যায়। বিশ্বজুড়ে এখন এ দৃষ্টিভঙ্গিই জনপ্রিয় হচ্ছে—যেখানে ‘অ্যাকসেসিবিলিটি’ বা সহজপ্রাপ্যতাকেই দেয়া হচ্ছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
উন্নয়নশীল ও উন্নত—দুই বিশ্বেরই আধুনিক পরিবহন সংস্থাগুলো এখন এদিকেই এগোচ্ছে। ভারতের দিল্লি, মুম্বাই ও হায়দরাবাদ মেট্রোর মতো সিস্টেমে হোয়াটসঅ্যাপে টিকিট বুকিং এখন বাস্তবতা। মুম্বাই মেট্রোর প্রায় ১৯ শতাংশ যাত্রী এখন টিকিট কাটেন হোয়াটসঅ্যাপে, নাগপুর মেট্রোতে এ সেবা চালুর পর মুহূর্তেই ডিজিটাল ব্যবহার বেড়ে গেছে। বর্তমানে ভারতের মেট্রো ভাড়ার প্রায় ৬৭ শতাংশই বুক হচ্ছে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে। একইভাবে রাজ্য পর্যায়ের বাস সার্ভিসগুলোতেও এ সেবা সংযুক্তি লাখো যাত্রীর জন্য ডিজিটাল বুকিংকে সহজ করেছে।
এ প্রবণতা কেবল উন্নয়নশীল দেশেই নয়, যুক্তরাজ্যের মতো প্রযুক্তি-অগ্রসর দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে ইস্ট মিডল্যান্ডস রেলওয়ে ও নর্দান রেল হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে যাত্রীদের যাত্রাসংক্রান্ত তথ্য, লাইভ আপডেট ও গ্রাহকসেবা দিয়ে থাকে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার অনেক বিমান সংস্থাও এখন এই প্লাটফর্মে চেক-ইন রিমাইন্ডার, ফ্লাইট আপডেট ও কাস্টমার সাপোর্ট দিচ্ছে। অর্থাৎ যাত্রীরা এখন এমন সেবা পছন্দ করেন, যা তাদের দৈনন্দিন ডিজিটাল অভ্যাসের ভেতরেই মিশে যায়।
বাংলাদেশও এখন এ পরিবর্তনের উপযুক্ত সময়। সম্প্রতি অনলাইন টিকিটিং প্লাটফর্ম সহজ প্রথমবারের মতো দেশে হোয়াটসঅ্যাপে বাস টিকিট বুকিং চালু করেছে—এটি নিঃসন্দেহে একটি উৎসাহজনক উদ্যোগ। যারা আগে কখনো অনলাইনে টিকিট কাটেননি, তাদের জন্য এটি নতুন কোনো প্রযুক্তি শেখার বিষয় নয়, বরং দৈনন্দিন অভ্যাসেরই সম্প্রসারণ। একসময় জটিল মনে হওয়া কাজ এখন হয়ে গেছে মেসেজ পাঠানোর মতোই সহজ। এখানেই মূল বার্তাটি স্পষ্ট—প্রযুক্তি মানুষকে তাদের বাস্তবতায় পৌঁছাক, মানুষকে যেন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না হয়।
এ অগ্রযাত্রাকে আরো দ্রুত করতে কয়েকটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়া জরুরি। প্রথমত, এমন সেবা তৈরি করতে হবে যা সব ধরনের ফোনে কাজ করবে—সহজ ডায়াল কোড বা হালকা ওয়েব লিংকের মাধ্যমে, যাতে কোনো অ্যাপ ডাউনলোডের প্রয়োজন না হয়।
দ্বিতীয়ত, জনপ্রিয় মেসেজিং প্লাটফর্ম ও পেমেন্ট গেটওয়ের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে একটি একীভূত ব্যবহার অভিজ্ঞতা তৈরি করতে হবে।
অনলাইন টিকিটিং অনেক দূর এগিয়েছে, কিন্তু প্রকৃত অগ্রগতি ঘটবে তখনই, যখন সবাই সমানভাবে এর সুফল পাবে। পরিচিত ও বিশ্বাসযোগ্য প্লাটফর্মকে কাজে লাগিয়েই আমরা এ ব্যবধান ঘুচাতে পারি। ভবিষ্যতের টিকিটিং নির্ধারিত হবে জটিলতায় নয়, সরলতায়। যখন বাসের টিকিট কাটতে মেসেজ পাঠানোর মতোই স্বাভাবিক লাগবে, তখনই বলা যাবে—ডিজিটাল অগ্রগতি সত্যিকার অর্থে সবার জন্য অগ্রগতি হয়ে উঠেছে।
মানুষের হাতের এ প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে পারার প্রভাব হবে খুব গভীর। বাংলাদেশের দীর্ঘপথের যাত্রায় বাসই এখনো মূল ভরসা। কোটি মানুষ এর ওপর নির্ভরশীল—গার্মেন্টস শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, চাকরিজীবী সবাই। সহজলভ্য প্লাটফর্মে টিকিটিং চালু হলে ডিজিটাল সুবিধার পরিধি শহর ছাড়িয়ে গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে যাবে।
অনলাইন টিকিটিং অনেকদূর এগিয়েছে, কিন্তু প্রকৃত অগ্রগতি ঘটবে তখনই, যখন সবাই সমানভাবে এর সুফল পাবে। পরিচিত ও বিশ্বাসযোগ্য প্লাটফর্মকে কাজে লাগিয়েই আমরা এ ব্যবধান ঘুচাতে পারি। ভবিষ্যতের টিকিটিং নির্ধারিত হবে জটিলতায় নয়, সরলতায়। যখন বাসের টিকিট কাটতে মেসেজ পাঠানোর মতোই স্বাভাবিক লাগবে, তখনই বলা যাবে—ডিজিটাল অগ্রগতি সত্যিকার অর্থে সবার জন্য অগ্রগতি হয়ে উঠেছে।
কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ: সহকারী অধ্যাপক, অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এআরআই), বুয়েট










