দেশের নাগরিকদের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভিসা পাওয়া অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় কঠিন হয়ে উঠেছে। শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে পর্যটক, রোগী, কর্মজীবী—সব শ্রেণীর মানুষই ভিসা জটিলতার সম্মুখীন হচ্ছে। বিদেশে গিয়ে অবৈধভাবে থেকে যাওয়ার প্রবণতা বা অবৈধ অভিবাসন, ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে আবেদন প্রভৃতি কারণে ভিসা রিজেকশন বাড়ছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। এছাড়া অনেক দেশের অভ্যন্তরীণ বা কূটনৈতিক নীতি-পরিকল্পনায় পরিবর্তনের কারণেও দেশের নাগরিকরা ভিসা পাচ্ছেন না। উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের মানুষের যেকোনো ধরনের ভিসা আবেদন বাতিলের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।

সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশেই বাংলাদেশীদের জন্য ভিসা ইস্যু কমে গেছে। কোথাও প্রক্রিয়া ধীরগতি, কোথাও অতিরিক্ত শর্ত, আবার কোথাও সরাসরি নিষেধাজ্ঞা। শিক্ষার্থী ভিসার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নানা দেশে রিজেকশন হার বেড়ে গেছে; আগে যেখানে প্রায় ৩০ শতাংশ আবেদন অনুমোদন পেত, এখন প্রায় ৯৫ শতাংশই বাতিল হচ্ছে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী ভর্তি বাতিল করতে বাধ্য হচ্ছেন, আর টিউশন ফি ফেরত না পাওয়ার অনিশ্চয়তায় পড়ছেন। এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে পর্যটন ও চিকিৎসা ভিসার জন্য আবেদন করা মানুষও। বিশেষত গত বছরের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপড়েন শুরু হয়। এর প্রভাবে কয়েক মাস সব ধরনের ভিসা বন্ধ ছিল। বর্তমানে চিকিৎসা ভিসা সীমিতভাবে দেয়া হলেও পর্যটন ভিসা কার্যত বন্ধ। এছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ—থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া—আগে যেগুলো অন-অ্যারাইভাল ভিসা সুবিধা দিত, সেগুলোও বর্তমানে কঠোর শর্ত আরোপ করেছে। কারণ অতীতে বাংলাদেশ থেকে অনেকেই পর্যটক ভিসায় গিয়ে আর ফিরে আসেননি। তবে শ্রমবাজারের পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক।

বিদেশে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর অন্তত ১০ লাখ মানুষ বিদেশে পাড়ি জমায়। প্রবাসী বাংলাদেশীদের পাঠানো আয় দেশের অর্থনীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। তবে অনিয়ম, দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ এনে প্রায়ই বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেয়া বন্ধের ঘোষণা দিচ্ছে জনশক্তি আমদানিকারক দেশগুলো। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ বছরে ওমান, বাহরাইন, ইরাক, লিবিয়া, সুদান, মিসর, রোমানিয়া, ব্রুনাই ও মালদ্বীপে বাংলাদেশের শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে গেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়া সিন্ডিকেট বাণিজ্যের কারণে বাংলাদেশী কর্মী নেয়া বন্ধ করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের শ্রমবাজার আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ না হলেও গত বছর জুলাই থেকেই ভিসা ইস্যু বন্ধ করে দিয়েছে দেশটি। অর্থাৎ এরই মধ্যে অনেকটাই সংকুচিত হয়ে এসেছে বৈদেশিক শ্রমবাজার। কেবল সৌদি আরবের শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ রয়ে গেছে। আবার ইউরোপের দেশগুলো, যেমন রোমানিয়া, পোল্যান্ড, চেক প্রজাতন্ত্র নতুন গন্তব্য হিসেবে ওঠে এলেও এসব দেশের দূতাবাস বাংলাদেশে না থাকায় ভিসা পাওয়া কঠিন। ফলে শ্রমবাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে সব ধরনের ভিসা প্রাপ্তির জটিলতা কীভাবে দূর করা যায় সেদিকে মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন।

সম্প্রতি বিদেশে বাংলাদেশের শ্রমবাজার সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে ভিসা জটিলতা দ্রুত নিরসনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিশেষ উদ্যোগ নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কেননা অনেক দেশে বাংলাদেশের কোনো দূতাবাস না থাকায় ভিসা প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হচ্ছে। আবার অনেক অভিবাসনপ্রত্যাশীকে বর্তমানে নয়াদিল্লিতে গিয়ে ভিসার আবেদন করতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। এ ধরনের প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা শ্রমবাজার সম্প্রসারণের পথে বড় বাধা। অথচ দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। রফতানি আয়ের পর রেমিট্যান্স বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম উৎস। অথচ বিশ্বের প্রতিযোগিতাপূর্ণ শ্রমবাজারগুলো ধীরে ধীরে নেপাল, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও আফ্রিকার দখলে চলে যাচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে বৈদেশিক শ্রমবাজার ধরে রাখতে চায়, তবে কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগের মাধ্যমে ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা অতি প্রয়োজনীয়। তবে কেবল শ্রমবাজার সম্প্রসারণেই না, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তির পুনরুদ্ধারেও সব ধরনের ভিসা জটিলতা দূর করতে সমমনোযোগ প্রয়োজন।

পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, হাতেগোনা কয়েকটি কারণেই মূলত ভিসা রিজেকশনের হার বেড়েছে। অবৈধ অভিবাসনের প্রবণতা, ভুয়া ও জাল কাগজপত্র, প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতার ঘাটতি এসব কারণে গন্তব্য দেশগুলো বাংলাদেশের নাগরিকদের প্রতি অবিশ্বাসী হয়ে পড়েছে। আর

সে কারণগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে।

বিদ্যমান এসব সমস্যার সমাধান কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগের মাধ্যমে সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্য দেশের নাগরিকদের ভিসা দেয়ার ক্ষেত্রে একটি দেশ অভিবাসনের উৎস দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাসহ নানা বিষয়ে পর্যবেক্ষণ করে। সেগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে কূটনৈতিক নীতি নেয় ও সম্পর্ক গড়ে তোলে। তাই কূটনীতির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপরও জোর দিতে হবে। তবে সর্বাগ্রে জরুরি হলো, অবৈধ অভিবাসন ও ভুয়া নথির মাধ্যমে ভিসা আবেদনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। শিক্ষার্থী ও পর্যটক ভিসার ক্ষেত্রে দূতাবাস পর্যায়ে স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য প্রক্রিয়া তৈরি করতে হবে। এছাড়া পুরনো শ্রমবাজার খোলা ও নতুন শ্রমবাজার তৈরিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়া দরকার। এজন্য অবশ্যই সরকারকে দক্ষ কর্মী তৈরি ও অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টির দিকেও নজর দিতে হবে। বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে। এর পর নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় প্রবেশ করবে। এ সময় বিশ্ববাজারে আমাদের অবস্থান ধরে রাখতে হলে কেবল গুণগত মানসম্পন্ন পণ্য রফতানি নয়, বৈধ অভিবাসন ও দক্ষ কর্মী প্রেরণ নিশ্চিত করা দরকার। সবচেয়ে জরুরি হলো দেশের ভাবমূর্তির পুনরুদ্ধার। তাই ভিসা পেতে যেসব সমস্যা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেগুলো সব গুরুত্বের সঙ্গে সমাধান করা হবে—সেটাই প্রত্যাশা।