সম্প্রতি বাংলাদেশের শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ থেকে বাণিজ্যের আড়ালে বছরে গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। এদিকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) এক গবেষণাপত্রে দেখা যায়, দেশ থেকে পাচার হওয়া মোট অর্থের প্রায় ৭৫ শতাংশই পাচার হয় বাণিজ্যের মাধ্যমে। পণ্যের দাম কম-বেশি দেখিয়ে এবং জাল দলিল তৈরি করে আমদানি ও রফতানির মাধ্যমে অর্থ পাচার হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে যা ঘোষণা থাকে বাস্তবে পণ্যের প্রকৃত মূল্য তার চেয়ে অনেক বেশি। এক পণ্যের আড়ালে অন্য পণ্য আনা হয়। আবার অনেক সময় শর্ট শিপিংয়ের মাধ্যমেও টাকা পাচার করা হয়। অর্থাৎ আমদানির পরিমাণ বেশি উল্লেখ করা হয় কিন্তু দেশে পণ্য উল্লিখিত পরিমাণের চেয়ে কম আসে। এর বাইরে মাল্টি ইনভয়েসিং তথা একই চালানের নামে একাধিকবার অর্থ পাঠিয়েও টাকা পাচার করা হয়। বাণিজ্যের আড়ালে মানি লন্ডারিংয়ের সুযোগ ও ব্যাপকতা অন্য মাধ্যমের চেয়ে বেশি। জালিয়াতি বা মিথ্যা ঘোষণাই হচ্ছে বাণিজ্যভিত্তিক মানি লন্ডারিংয়ের ভিত্তি। 

মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসী অর্থায়ন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা, ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্সের (এফএটিএফ) মতে বাণিজ্যভিত্তিক মানি লন্ডারিং (টিবিএমএল) হলো অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত আয়কে আড়াল করা এবং তাদের অবৈধ উৎসকে বৈধতা দেয়ার প্রয়াসে আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যের মাধ্যমে মূল্য স্থানান্তর করার প্রক্রিয়া। অর্থ পাচারে অপরাধীরা বাণিজ্য চ্যানেলটি ব্যবহার করে তার কারণ বাণিজ্যের মাধ্যমে বড় অংকের অর্থ নেয়া যায়। অন্য যেকোনো মাধ্যমের চেয়ে বাণিজ্যের মাধ্যমে অনেক বেশি পরিমাণ অর্থ লেনদেন করা তুলনামূলকভাবে সহজ। ফলে এ মাধ্যমে বড় অংকের অর্থ বিদেশে পাঠানোর আগ্রহ বেশি থাকে। 

মানি লন্ডারিংয়ের অন্যতম কৌশল হলো কালো টাকার উৎস গোপন করা বা সত্যকে মিথ্যা দিয়ে আড়াল করা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে যা ঘোষণা থাকে বাস্তবে পণ্যের প্রকৃত মূল্য অনেক বেশি। অথবা এক পণ্যের আড়ালে অন্য পণ্য আনা হয়। ঘোষণা ও অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের মধ্যে পার্থক্যের মূল কারণ হলো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের শুল্ককর ফাঁকিসংক্রান্ত আর্থিক লাভ বা পাচারের সংযোগ। আর এ জালিয়াতি বা মিথ্যা ঘোষণাই হচ্ছে বাণিজ্যভিত্তিক মানি লন্ডারিংয়ের ভিত্তি।

আমদানি-রফতানিতে আন্ডার ইনভয়েসিং ও ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচার হয়। এ দুর্নীতি বন্ধ করতে প্রযুক্তির ব্যবহারের সুপারিশ করেছেন অর্থনীতির বিশ্লেষকরা। লেনদেনের কাজ আধুনিকায়ন করা আবশ্যক, মিথ্যা ঘোষণা বন্ধে তথ্য প্রদানে স্বচ্ছতা আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বন্দর, লিয়েন ব্যাংক এবং ক্রেতা-বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনলাইনে আদান-প্রদানে পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে ব্যাংক ও কাস্টমস কর্মকর্তাদের মধ্যে সমন্বয় করা যেতে পারে। পণ্যের মূল্য যাচাই করার জন্য আন্তর্জাতিক মূল্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানের সাহায্য নেয়া যেতে পারে। তাছাড়া সরাসরি যে প্রতিষ্ঠান পণ্য জোগান দিচ্ছে তার সঙ্গে তৃতীয় পক্ষ হয়ে অথবা গ্রাহক সেজেও পণ্যের মূল্য যাচাই করা যেতে পারে। আমদানিকারকের ক্রেডিট রিপোর্ট নেয়ার আদি বিধান তো আছেই। সেটা সঠিক কাজ করলে বাণিজ্যভিত্তিক মানি লন্ডারিং ঠেকানো দুঃসাধ্য হওয়ার কথা নয়।

কম মূল্য দেখিয়ে পণ্য আমদানি একদিকে যেমন সরকারের রাজস্ব আয় কমিয়ে দেয় অন্যদিকে ঘটে ব্যাপক অর্থ পাচারের ঘটনা, যা দেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকারক। এমনিতেই আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে সবসময় টানাপড়েন থাকে। বাণিজ্যের আড়ালে মুদ্রা পাচার দেশে অবৈধ আয়ের পথকে উৎসাহিত করে। তাতে দুর্নীতি, ঘুস ইত্যাদি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বিস্তার লাভ করে। আইনের ফাঁকফোকরগুলোর সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা আবশ্যক। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ব্যাপক প্রশিক্ষণের আওতায় আনা উচিত। সর্বোপরি নৈতিকতা চর্চার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। পাঠ্যক্রমে নৈতিকতা বিষয়ে শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা উচিত। অবৈধ পথে অর্থ উপার্জনকে সমাজ ঘৃণার চোখে দেখে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে যাতে অবৈধ লেনদেন সম্পন্ন করা না যায় সে ব্যবস্থা নেয়া উচিত। সেক্ষেত্রে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মধ্যস্থতায় আইনের প্রয়োগ নিশ্চিতে সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।  

আনোয়ার ফারুক তালুকদার: অর্থনীতি বিশ্লেষক