অন্যদিকে এ অঞ্চল থেকে পাওয়া প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ গোটা অর্থনীতির চালিকাশক্তি যে প্রাকৃতিক গ্যাস, তার অন্যতম প্রধান উৎপত্তিস্থল সিলেট ও এ বিভাগের অন্যান্য জেলা। দেশের উৎপাদিত গ্যাসের ৬০ শতাংশই আসে সিলেটের গ্যাসকূপগুলো থেকে। আবার এসব কূপ থেকে প্রাকৃতিক গ্যাসের সঙ্গে অপরিশোধিত তেলও উত্তোলন করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ডিজেল, পেট্রল ও অকটেন। পাথর ও চুনাপাথরের জোগানও আসে এ অঞ্চল থেকে। অর্থাৎ সব মিলিয়ে সিলেটের পরিবেশগত অবস্থান সিলেটের অর্থনীতি তথা দেশের অর্থনীতির সম্ভাবনা বাড়িয়েছে। কিন্তু এ সম্ভাবনা প্রত্যাশিত মাত্রায় কাজে লাগানো যাচ্ছে না আরামদায়ক ও উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থার অভাবে।
বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নকাজ চলছে। তবে এসব কাজ বাস্তবায়নের গতি একেবারে শ্লথ। ফলে খানাখন্দ, যানজট ও যাত্রাপথে দীর্ঘ সময় চলে যাওয়া হয়ে দাঁড়িয়ে এ মহাসড়কের প্রতিদিনের দৃশ্য। ৪-৫ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগছে ৮-১০ ঘণ্টা। এতে যাত্রীদের দুর্ভোগ যেমন বাড়ছে, তেমনি শিল্প ও বাণিজ্যও পড়ছে বাড়তি চাপের মুখে। কাঁচামাল সময়মতো কারখানায় পৌঁছাচ্ছে না, উৎপাদিত পণ্যও নির্ধারিত সময়ে বাজারে যাচ্ছে না। অর্থাৎ সরবরাহ শৃঙ্খলে একধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে। উপরন্তু বাড়ছে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়। সব মিলিয়ে এ অঞ্চলের চায়ের পাশাপাশি অন্যান্য শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে, যা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়।
সরকারের উচিত দ্রুত ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কাজ শেষ করে যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো। সরকারের মনে রাখা প্রয়োজন, নির্বাচনী প্রচারণার সময় সিলেটের প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার, পর্যটন শিল্পের বিকাশ, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কসহ যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সম্প্রসারণ এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। সিলেটকে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছিল। এ অঙ্গীকারের আশু বাস্তবায়ন করা না হলে সিলেটের অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখের পড়বে। আর ক্ষতির ঝুঁকি কমাতে সর্বাগ্রে প্রয়োজন উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা। রাজধানীর সঙ্গে এর যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নত হওয়ার পাশাপাশি টেকসই হওয়াটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
শিল্প-অর্থনীতির বিকাশে যোগাযোগ অবকাঠামোর গুরুত্ব কতটা তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। একটি নিরাপদ, আরামদায়ক মহাসড়ক শুধু যাতায়াত সহজ করে না; এটি উৎপাদন, সরবরাহ, বিনিয়োগ, পর্যটন ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের গতি কেমন হবে সেটিও নির্ধারণ করে। তাই কোনো গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের উন্নয়নকাজ দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকলে তার প্রভাব কেবল যানজটে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বর্তমান পরিস্থিতি তারই একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
সিলেট অঞ্চলের চা শিল্পও যোগাযোগ ব্যবস্থার ভঙ্গুর দশার মুখোমুখি রয়েছে। শ্রীমঙ্গলে চা নিলাম কেন্দ্র চালু হলেও উৎপাদিত চা সময়মতো চট্টগ্রাম বন্দর বা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছতে পারছে না। এতে রফতানি প্রক্রিয়ায় বিলম্ব, গুদাম ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় জট তৈরি হচ্ছে। যে অঞ্চলের অর্থনীতির সঙ্গে চা শিল্প নিবিড়ভাবে জড়িত, সেখানে দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করছে।
পর্যটন খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, চা বাগান, হাওর ও রিসোর্টগুলো পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হলেও দীর্ঘ ও অনিশ্চিত সড়কযাত্রা অনেককে নিরুৎসাহিত করছে। এতে সিলেটের স্থানীয় হোটেল, রিসোর্ট, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতির মুখে পড়ছেন। অথচ ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক শুধু একটি আঞ্চলিক সড়ক নয়; এটি দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রধান অর্থনৈতিক করিডোর। সিলেট বিভাগের চার জেলা ছাড়াও হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জের শিল্পাঞ্চলের বড় অংশ এ সড়কের ওপর নির্ভরশীল। ভবিষ্যতে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণেও এ করিডোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
উদ্বেগের বিষয়, প্রায় ১৬ হাজার ৯১৯ কোটি টাকার ‘সাসেক ঢাকা-সিলেট করিডোর সড়ক উন্নয়ন’ প্রকল্প ২০২১ সালে শুরু হলেও নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার প্রাক্কালে নির্মাণ অগ্রগতি মাত্র ২১ শতাংশের কিছু বেশি। ভূমি অধিগ্রহণ, ইউটিলিটি লাইন স্থানান্তর, নকশা পরিবর্তন ও প্রশাসনিক জটিলতার কথা প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন। এসব সমস্যা বাস্তব হলেও প্রশ্ন থেকে যায়—জাতীয় অগ্রাধিকারের একটি প্রকল্পে কেন শুরু থেকেই কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা গেল না? প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের অর্থ কেবল সময় ও অর্থের অপচয়, যার প্রভাব পড়ছে ব্যবসায় ও শিল্পেও।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ না ঘটলে বিনিয়োগ, রফতানি ও কর্মসংস্থান বাড়ার মাধ্যমে দেশের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্য কখনই পূরণ হবে না। আর এ লক্ষ্য পূরণে আধুনিক যোগাযোগ অবকাঠামোর প্রয়োজন। শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলতে যেমন জমি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন ও দ্রুত পরিবহন ব্যবস্থা। এ প্রেক্ষাপটেও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের উন্নয়নকাজ দ্রুত শেষ করা প্রয়োজন।
সরকারের উচিত সংশ্লিষ্ট প্রকল্পকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া। ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তরের জটিলতা দ্রুত নিষ্পত্তি, প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং নির্মাণকাজ চলাকালে মহাসড়ক চলাচলযোগ্য রাখতে কার্যকর রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।










