পরবর্তী সময়ে চূড়ান্ত আকারে ধ্বংসযজ্ঞ এড়ানো গেলেও অস্থিরতা দূর হয়নি। এরই ধারাবাহিকতায় ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ফের হামলা শুরু করে। কৌশলগত পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এরপর প্রণালিটি উন্মুক্ত হলেও তারা জানিয়ে দেয়, এ পথে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না। এরপর তিন সপ্তাহ গড়িয়েছে। এখনো আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধ করার কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হওয়ার শঙ্কা তাই বাড়ছে। তাতে অনিশ্চয়তায় পড়েছে জ্বালানি পণ্য সরবরাহ ও বিপণন। নানা কারণে হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক জ্বালানি পণ্য সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার (আইইএ) প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ পথ দিয়ে বিশ্বের মোট সমুদ্রবাহিত তেলের প্রায় ২৫ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ১৯ শতাংশ পরিবাহিত হয়। এখন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি চলমান থাকায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ রুটের মাধ্যমে জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলো বিপাকে পড়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বেশি বিপদে পড়েছে এশিয়ার দেশগুলো। কারণ ওপেক দেশগুলোর জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ রুট এটি। রুটটি এখন জ্বালানি পণ্য পরিবহনে নিরাপদ নয়। বাধ্য হয়ে জ্বালানি পণ্য পরিবহনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিকল্প রুট ব্যবহার করছে এবং ক্ষেত্রবিশেষে পণ্য পরিবহন করতে পারছে না। সরবরাহের অনিশ্চয়তায় বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কিছু সময়ের জন্য ১০০ ডলার সীমানা অতিক্রম করে। বিশ্লেষকদের মত, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি প্রধান তেল রফতানিকারক দেশ অনিশ্চয়তার কারণে রফতানি সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে এবং উৎপাদন কমিয়েছে। দেশগুলোর সংরক্ষণাগার ভর্তি হলেও জাহাজের মাধ্যমে তেল পাঠানোর রুট অনিশ্চিত। ইরাক ও কুয়েতের মতো দেশগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল পাঠাতে দেরি করেছে। এভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য বৈশ্বিক জ্বালানি পণ্যের সরবরাহ সংকুচিত হয়েছে। এ অবস্থায় অনেক দেশ নগদ দরে জ্বালানি তেল কিনতে বিকল্প বাজারের সন্ধান করছে। অনেক ক্ষেত্রে বেশি দামে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে। ভিয়েতনাম ডিজেল ও পেট্রলের দাম ২১ শতাংশ বাড়িয়েছে। পাকিস্তানে বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। এশিয়ার দেশগুলোর সরকার এখন বিকল্প জ্বালানি সরবরাহ পথ অনুসন্ধান করছে এবং সরবরাহ ব্যাঘাতের প্রভাব কমানোর জন্য তাদের জ্বালানি সংরক্ষণ বাড়াচ্ছে। গ্রুপ সেভেনের অর্থমন্ত্রীরাও বৈশ্বিক বাজার স্থিতিশীল করার জন্য জরুরি তেল সংরক্ষণ মুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছে। বাংলাদেশকেও সংকট মোকাবেলায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।

জ্বালানি তেলের চাহিদা পূরণে আমরা সবসময়ই আমদানিনির্ভর। দেশের প্রায় ৯২ শতাংশ জ্বালানি তেলের চাহিদা আমদানির মাধ্যমে পূরণ হয়, যার বেশির ভাগ আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। এছাড়া সিঙ্গাপুর, চীন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, কুয়েত, থাইল্যান্ড, ওমান ও ভারতের মতো দেশ থেকেও পরিশোধিত তেলের কিছু অংশ আমদানি করা হয়। বিকল্প বাজার থেকে যেহেতু আমরা বিপুল পরিমাণে জ্বালানি সংগ্রহ করি না, তাই মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত আমাদের জন্য উদ্বেগের। জ্বালানি তেলের চাহিদা পূরণ না হলে আমাদের শিল্প, কৃষি, পরিবহন খাতকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করবে। বিশেষত টেক্সটাইল, স্টিল, সার উৎপাদন, স্থিতিশীল বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো কার্যক্রমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সবদিক বিবেচনায় ভূরাজনৈতিক সমীকরণ বিবেচনা করে জ্বালানি নিরাপত্তা অর্জনের কৌশল কীভাবে শক্তিশালী করা যায়, তা নিয়ে ভাবার সময় এখন।

জ্বালানি তেল সরবরাহ কম হলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন কমবে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা কম নয়। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনে কাঁচামালের সরবরাহ ঘাটতি হলে সক্ষমতার পরিপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায় না। গ্যাস সরবরাহে ঘাটতির কারণে ছয় হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ আমরা উৎপাদন করতে পারি না। এলএনজি, ফারনেস অয়েল ও কয়লার আমদানি খরচ বাড়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও বাড়ে। তখন বাধ্য হয়ে অত্যাবশ্যক চাহিদা মেটানোর উপযুক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। চাহিদা মেটানোর জন্য রেশনিং ভিত্তিতে লোডশেডিং করা হয়। এর প্রভাব গৃহস্থালি কার্যক্রমের পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও পড়ে। কারখানাগুলো উৎপাদন ঘণ্টা কমায় বা সাময়িকভাবে বন্ধ করে। উচ্চতর জ্বালানি খরচ ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো প্রধান ভোক্তা বাজারে মৌলিক পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে। দেশগুলোর স্থানীয়রা নিত্যপণ্যে বেশি খরচ করছে। তাই শৌখিন দ্রব্য বা পণ্যের চাহিদা তুলনামূলকভাবে কমেছে। এর মধ্যে পোশাক একটি। কিছু পোশাক অত্যাবশ্যকীয় বলে ভাবা হয় না। আমাদের তৈরি পোশাক শিল্প এসব পোশাকই রফতানি করে। সেখানে কিছু অর্ডার কমার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অন্য অনেক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক কিছু সমস্যা রয়েছে।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খাতও সংকটে পড়ে। বাংলাদেশে ট্রাক, বাস ও অন্যান্য বাণিজ্যিক যানের প্রধান জ্বালানি ডিজেল। যদি আন্তর্জাতিক ডিজেল মূল্যের বৃদ্ধি হয়, তখন দেশীয় পরিবহন খরচও অনুপাতে বৃদ্ধি পায়। উচ্চতর জ্বালানি খরচ দেশের মধ্যে পণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়ায়, যা পরবর্তী সময়ে খাদ্যপণ্য ও অন্যান্য ভোক্তাসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি করে। ফলে যাত্রী পরিবহন ও মৌলিক পণ্য বিতরণ—দুটোই ব্যয়বহুল হয়। কৃষি খাতও ডিজেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বিশেষত সেচ মৌসুমে চাহিদা আরো বাড়ে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, কৃষি উৎপাদনের জন্য বর্তমানে ৭৫৪টির বেশি ডিজেলচালিত ডিপ টিউবওয়েল, ১০ লাখ ৩৯ হাজারেরও বেশি শ্যালো টিউবওয়েল এবং প্রায় ১ লাখ ৮৪ হাজার লো-লিফট পাম্প সক্রিয় রয়েছে। গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলে ডিজেল ঘাটতি এখনই কৃষকের উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত করছে। সীমিত সরবরাহের কারণে খুচরা পর্যায়ে লিটারপ্রতি ডিজেলে ৮-১০ টাকা অতিরিক্ত চার্জ আদায়ের অভিযোগও মিলেছে। সেচ মৌসুমে সময়ে ডিজেল ঘাটতি থাকলে কৃষি উৎপাদন তুলনামূলকভাবে কমবে। উৎপাদন কমলে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়বে এবং খাদ্যনিরাপত্তার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে।

জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়ায় দেশকে তেল আমদানিতে আরো বেশি খরচ করতে হচ্ছে। সংঘাত প্রবাসী রেমিট্যান্সের প্রবাহকেও পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করতে পারে। বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অভিবাসী শ্রমিকদের কাছ থেকে আসে। যদি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে আঞ্চলিক অর্থনীতি ধীরগতি হয়, অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ কমতে পারে, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রেমিট্যান্স প্রবাহকে প্রভাবিত করতে পারে। জ্বালানি সংকটের সরাসরি প্রভাব দৈনন্দিন জীবনের ওপরও পড়েছে। কৃষি ও পরিবহন খাতে খরচ বাড়লে চাল, সবজি ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে। উচ্চতর জ্বালানি খরচ কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও প্রস্তুত পণ্য উৎপাদনের খরচও বাড়ায়। নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের মজুরি তুলনামূলকভাবে অপরিবর্তিত থাকায় জীবনযাত্রার ব্যয় সংকোচন করতে হচ্ছে। অনেকাংশে ক্রয়ক্ষমতাও কমছে। এভাবে বর্ধিত জ্বালানি দাম বাংলাদেশের মোট অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।

এমন প্রেক্ষাপটে সরকারকে কিছু উদ্যোগ আশু সমাধানে নিতে হবে। এ মুহূর্তে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহে মনোযোগ দিতে হবে। আমদানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা জরুরি। ভারত, চীন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এমনকি আফ্রিকার তেল রফতানিকারক দেশগুলোর বাজার অনুসন্ধান করতে হবে। জ্বালানি আমদানির জন্য সুষ্ঠ অর্থায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। যেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান জ্বালানি পণ্য আমদানির এলসি খোলে, সেগুলোর তারল্যসংকট থাকলে তা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নিতে হবে। জ্বালানি পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সরকারের আছে। স্বল্প সময়ের জন্য মুনাফা না করে এ খাতে মূল্য নিয়ন্ত্রণ করলে ভোক্তা পর্যায়ে স্বস্তি মিলবে। এরপর দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি কৌশলের জন্যও কাজ করে যেতে হবে। কৌশলগত জ্বালানি সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা গড়তে পারলে ভূরাজনৈতিক সংকটে জটিলতা এড়ানো সম্ভব। জীবাশ্ম জ্বালানির বদলে আমাদের নবায়নযোগ্য উৎস নিয়ে ভাবতে হবে। সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থা কৃষি খাতে ডিজেলের চাহিদার চাপ কমাতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিদেশে তেল ও গ্যাস ক্ষেত্রেও বিনিয়োগ বিবেচনা করতে হবে। এলএনজি ক্যারিয়ার ও তেল ট্যাংকারের মতো বৈশ্বিক জ্বালানি অবকাঠামোয় কৌশলগত অংশগ্রহণ সরবরাহ নিরাপত্তা আরো শক্তিশালী করতে পারে। জ্বালানি অবকাঠামোয় ব্যক্তিগত ও বৈদেশিক বিনিয়োগ উৎসাহিত করা আরো স্থিতিস্থাপক জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং উৎপাদন দ্রুত করাও সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। পেট্রোবাংলার মাধ্যমে অনুসন্ধান প্রচেষ্টা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানিগুলোকে সামুদ্রিক বিডিং রাউন্ডে অংশগ্রহণে আকৃষ্ট করলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের দেশীয় গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব।

বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় দেশের জন্য আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। ভারত, চীন, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বহুমাত্রিক জ্বালানি সহযোগিতা জোরদার করা যেতে পারে। নেপাল ও ভুটানের সঙ্গেও জলবিদ্যুৎ সহযোগিতা জোরদার করা অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। এ দুই দেশে প্রচুর জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনা রয়েছে। আঞ্চলিক বিদ্যুৎ গ্রিডের মাধ্যমে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে নেপাল ও ভুটান থেকে পরিবেশবান্ধব জলবিদ্যুৎ আমদানি করতে পারে। বাণিজ্যিক কূটনীতির মাধ্যমে চীনের সঙ্গে প্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। বিদ্যমান জ্বালানি তেলকে ঘিরে যত সংকট আছে তা দূর করার জন্য স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাগুলোকে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এ মুহূর্তে জ্বালানি পণ্যের নিরাপত্তা আমাদের অর্থনীতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

ড. মুহাম্মদ বদরুল হাসান: সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়