কানাডা ও বিশ্ব যে সন্ধিক্ষণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, আজ রাতে সেই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আপনাদের সঙ্গে থাকতে পারাটা একই সঙ্গে আনন্দের ও দায়িত্বেরও। আজ আমি বলব বিশ্ব ব্যবস্থায় ভাঙন নিয়ে যা সুখকর কল্পনার অবসান এবং কঠোর বাস্তবতার সূচনা ঘটিয়েছে। আমরা এমন এক ভূরাজনীতির মানচিত্রে প্রবেশ করেছি যেখানে মনে হচ্ছে বৃহৎ ও প্রধান শক্তিগুলো কোনো সীমা, নিয়ন্ত্রণ বা বাধ্যবাধকতার অধীন নয়।
আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই—অন্য দেশগুলো বিশেষ করে কানাডার মতো মধ্যবর্তী শক্তিগুলো, শক্তিহীন নয়। তাদের সক্ষমতা আছে এমন একটি নতুন ব্যবস্থা গড়ার, যা আমাদের মূল্যবোধকে ধারণ করে। যেমন মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা, টেকসই উন্নয়ন, সংহতি, সার্বভৌমত্ব এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা। কম শক্তির রাষ্ট্রগুলোর ক্ষমতা শুরু হয় সততা দিয়ে।
প্রতিদিনই আমাদের মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে আমরা বৃহৎ শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার এক যুগে বাস করছি। নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা যেন ফিকে হয়ে যাচ্ছে। সবলরা যা ইচ্ছে তাই করতে পারছে এবং সহে যাওয়াই যেন দুর্বলদের নিয়তি। গ্রিক ঐতিহাসিক থুসিডিডিসের এ বাক্যকে অনিবার্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের স্বাভাবিক যুক্তি আবার নিজেকে প্রতিষ্ঠা করছে। আর এ যুক্তির মুখে বিভিন্ন দেশের মধ্যে এ প্রবণতা প্রবল হতে দেখছি—একটু তাল মিলিয়ে চলি, মানিয়ে নিই, ঝামেলা এড়াই। এই আশা মনে, হয়তো আনুগত্য দেখালে নিরাপত্তা কিনে নেয়া যাবে। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হলো তা হচ্ছে না। তাহলে আমাদের সামনে কী বিকল্প আছে?
১৯৭৮ সালে চেক ভিন্নমতাবলম্বী ভাতচলাভ হাভেল (যিনি পরে প্রেসিডেন্ট হন) ‘দ্য পাওয়ার অব দ্য পাওয়ারলেস’ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন এবং সেখানে তিনি একটি সহজ প্রশ্ন করেন: কমিউনিস্ট ব্যবস্থা কীভাবে নিজেকে টিকিয়ে রেখেছিল? আর তার উত্তর শুরু হয় এক সবজিওয়ালাকে দিয়ে।
প্রতিদিন সকালে এই দোকানদার তার জানালায় একটি সাইন ঝুলিয়ে দেয়: ‘বিশ্বের শ্রমিকরা এক হও।’ সে এতে বিশ্বাস করে না, কেউই করে না, কিন্তু তবু সে সাইনটা ঝুলিয়ে দেয়—ঝামেলা এড়াতে, অনুগত্যের সংকেত দিতে, মিশে চলতে। আর যেহেতু প্রতিটি রাস্তার প্রতিটি দোকানদার একই কাজ করে, ব্যবস্থা টিকে থাকে—শুধু সহিংসতার কারণে নয়, বরং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে, এমন এক ধরনের আচার-অনুষ্ঠানে, যেগুলোকে তারা ব্যক্তিগতভাবে জানে মিথ্যা। হাভেল একে বলেছেন ‘মিথ্যার ভেতরে বেঁচে থাকা।’
ব্যবস্থার শক্তি আসে তার সত্য থেকে নয়, বরং সবার এই আগ্রহ থেকে—যেন এটা সত্য, এমন অভিনয় করার এবং তার ভঙ্গুরতাও আসে একই উৎস থেকে। যখন একজন মানুষও অভিনয় বন্ধ করে, যখন সবজিওয়ালা তার সাইনটা সরিয়ে ফেলে বিভ্রমে ফাটল ধরতে শুরু করে। বন্ধুরা, কোম্পানি ও দেশগুলোর সময় এসেছে তাদের সাইনগুলো নামিয়ে ফেলার।
দশকের পর দশক ধরে, কানাডার মতো দেশগুলো সমৃদ্ধ হয়েছিল যাকে আমরা বলতাম নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা—তার অধীনে। আমরা তার প্রতিষ্ঠানগুলোয় যোগ দিয়েছি, তার নীতিগুলোকে প্রশংসা করেছি, তার পূর্বানুমেয়তা থেকে লাভবান হয়েছি। এ কারণেই আমরা তার সুরক্ষার অধীনে মূল্যবোধভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে পেরেছি।
আমরা জানতাম, নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার এ গল্পটা আংশিকভাবে মিথ্যা। আমরা দেখেছি সুবিধামতো শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসত। আন্তর্জাতিক আইনের মান্যতার ক্ষেত্রেও এমনটা দেখেছি। অভিযুক্ত বা ভুক্তভোগীর পরিচয়ের ওপর নির্ভর করতে দেখেছি মকদ্দমার ফলাফল। বিশেষ করে আমেরিকান হেজেমনি (মার্কিন নেতৃত্ব/আধিপত্য) জনকল্যাণে (পাবলিক গুডস) সাহায্য করেছিল। খোলা সমুদ্রপথ, স্থিতিশীল আর্থিক ব্যবস্থা, সমষ্টিগত নিরাপত্তা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির কাঠামোর সমর্থনের মতো ফিকশনে আমরা আস্থা রেখেছিলাম। এ কারণে আমরা আমাদের জানালায় সাইনটা ঝুলিয়ে রেখেছিলাম। আমরা আচারগুলোয় অংশ নিয়েছিলাম এবং কথা ও বাস্তবতার ফাঁকগুলোকে বড় করে তুলে ধরতে আমরা বেশির ভাগ সময় এড়িয়ে গেছি।
এ দরকষাকষি আর কাজ করে না। আমি সরাসরি বলি—আমরা এক ভাঙনের মধ্যে আছি, কোনো রূপান্তরের মধ্যে নয়। গত দুই দশকে অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, জ্বালানি ও ভূরাজনীতিতে একের পর এক সংকট চরম বৈশ্বিক সংযুক্তির ঝুঁকি উন্মোচন করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আমরা দেখছি কীভাবে বৃহৎ শক্তিগুলো অর্থনৈতিক সংযুক্তিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার শুরু করেছে। তারা শুল্ককে চাপ তৈরির হাতিয়ার, আর্থিক অবকাঠামোকে জবরদস্তি, সরবরাহ শৃঙ্খলকে দুর্বলতা হিসেবে ও শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
যখন সংযুক্তি আপনার অধীনতার উৎস হয়ে দাঁড়ায়, তখন আপনি সংযুক্তির মাধ্যমে পারস্পরিক লাভের মিথ্যার ভেতরে বাঁচতে পারেন না। যেসব বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর মধ্যবর্তী শক্তিগুলো নির্ভর করেছে তার মধ্যে রয়েছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও), জাতিসংঘ (ইউএন) ও কপ। আজ সমষ্টিগত সমস্যা সমাধানের এ কাঠামোই হুমকির মুখে। এর ফল হিসেবে বহু দেশ একই সিদ্ধান্তে পৌঁছাচ্ছে। তাদের আরো কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন গড়তে হবে জ্বালানিতে, খাদ্যে, গুরুত্বপূর্ণ খনিজে, অর্থায়নে ও সরবরাহ শৃঙ্খলে এবং এই প্রবণতা বোধগম্য। যে দেশ নিজেকে খাওয়াতে পারে না, জ্বালানি জোগাতে পারে না বা নিজেকে রক্ষা করতে পারে না, তার বিকল্প খুব কম। যখন নিয়ম আর আপনাকে রক্ষা করে না, আপনাকে নিজেকেই নিজে রক্ষা করতে হয়। কিন্তু চলুন, পরিষ্কার চোখে দেখি—এটা আমাদের কোথায় নিয়ে যায়।
বিশ্ব যে দুই বলয়ে ভাগ হচ্ছে তার এক বলয়ের বিশ্ব হবে আরো দরিদ্র, আরো ভঙ্গুর এবং কম টেকসই। আরেকটি সত্য আছে: যদি বৃহৎ শক্তিগুলো নিয়ম ও মূল্যবোধের ভানটুকুও ত্যাগ করে এবং বাধাহীনভাবে নিজেদের ক্ষমতা ও স্বার্থ অনুসরণ করে, তাহলে বিনিময়ভিত্তিক ব্যবস্থার সুফল ঘরে তোলার পুনরাবৃত্তি করা আরো কঠিন হবে।
আধিপত্যবাদী শক্তিগুলো সবসময় তাদের সম্পর্কের বিনিময়মূল্য ঘরে তুলতে পারে না। মিত্ররা অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে সুরক্ষার জন্য বৈচিত্র্য আনবে। তারা নিশ্চয়তার অনুসন্ধান করবে, বিকল্প বাড়াবে, সার্বভৌমত্ব পুনর্গঠন করবে। যে সার্বভৌমত্ব একসময় নিয়মের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু ক্রমে দাঁড়াবে চাপ সহ্য করার সক্ষমতার ওপর।
আমরা যারা এখানে সমবেত হয়েছি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কীভাবে করতে হয় তা জানি। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার একটা মূল্য আছে, কিন্তু কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের এ খরচ, সার্বভৌমত্বের খরচ—ভাগও করা যায়। স্থিতিস্থাপকতায় যৌথ বিনিয়োগ, সবাই আলাদা দুর্গ বানানোর চেয়ে সাশ্রয়ী। যৌথ মানদণ্ড বিভাজন কমায়। আর কানাডার মতো মধ্যবর্তী শক্তির সামনে প্রশ্নটা এটা নয় যে আমরা নতুন বাস্তবতায় মানিয়ে নেব কিনা—আমাদের মানিয়ে নিতেই হবে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি কেবল দেয়াল উঁচু করে মানিয়ে নেব, নাকি আরো উচ্চাভিলাষী কিছু করতে পারব।
কানাডা ছিল প্রথমদিককার চরিত্র যে বিশ্ব ব্যবস্থার ওই অশনিসংকেত আমলে নিয়েছিল। তার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা আমাদের কৌশলগত অবস্থান মৌলিকভাবে বদলাতে বাধ্য হয়েছি। কানাডীয়রা জানে, আমাদের ভূগোল এবং জোট-সদস্যতা এমনি এমনিই সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা দেবে—পূর্বে প্রচলিত এ ধারণা আর কার্যকর নয়। আমাদের নতুন যে পন্থা দাঁড়িয়েছে, ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব যাকে বলেছেন ‘ভ্যালু-বেইজড রিয়ালিজম’ (নীতিভিত্তিক বাস্তবতা)। অথবা অন্যভাবে বললে আমরা একই সঙ্গে নীতিনিষ্ঠ এবং বাস্তববাদী হতে চাই। নীতিনিষ্ঠ আমাদের মৌলিক মূল্যবোধের অঙ্গীকারে: সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা, জাতিসংঘ সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে শক্তি প্রয়োগের নিষেধাজ্ঞা এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা। আর বাস্তববাদী এ স্বীকৃতিতে যে অগ্রগতি প্রায়ই ধাপে ধাপে হয়, স্বার্থ ভিন্ন হয় এবং সব অংশীদার আমাদের মূল্যবোধ ভাগ করবে না। তাই আমরা বিস্তৃতভাবে, কৌশলগতভাবে, খোলা চোখে যুক্ত হচ্ছি। পৃথিবী যে বাস্তবতায় দাঁড়িয়েছে সে আলোকেই মোসাবিদা করতে চাই। আমরা যেরকম পৃথিবী চাই, তার জন্য অপেক্ষা করছি না। আমরা এখন আর শুধু আমাদের মূল্যবোধের শক্তির ওপর নির্ভর করছি না, আমরা আমাদের শক্তির মূল্যও গড়ে তুলছি। আমরা স্বদেশে সেই শক্তি তৈরি করছি।
আমার সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে ব্যক্তিগত আয়ের ওপর কর কমিয়েছি, পুঁজিগত মুনাফা এবং ব্যবসায়িক বিনিয়োগে কর কমিয়েছি। আমরা প্রদেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যে সব ফেডারেল বাধা সরিয়ে দিয়েছি। আমরা জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, নতুন বাণিজ্য করিডোর এবং আরো অনেক ক্ষেত্রে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছি। আমরা এই দশকের শেষে প্রতিরক্ষা ব্যয় দ্বিগুণ করে ফেলব। আমরা তা করছি এমনভাবে যা আমাদের নিজস্ব শিল্প গড়ে তোলে।
আমরা বিদেশে দ্রুত বিনিয়োগ বৈচিত্র্য আনছি। আমরা ইইউর সঙ্গে একটি সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারত্বে একমত হয়েছি। যার মধ্যে রয়েছে ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা ক্রয় ব্যবস্থা—‘এসএএফই’। আমরা ছয় মাসে চার মহাদেশে ১২টি বাণিজ্য ও নিরাপত্তা চুক্তি সই করেছি। গত কয়েক দিনে আমরা চীন ও কাতারের সঙ্গে নতুন কৌশলগত অংশীদারত্ব চূড়ান্ত করেছি। আমরা ভারত, আসিয়ান, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন ও মেরকোসুরের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছি।
আমরা আরেকটি কাজ করছি। বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানে আমরা ‘ভেরিয়েবল জিওমেট্রি’ অনুসরণ করছি অর্থাৎ বিভিন্ন ইস্যুর জন্য বিভিন্ন জোট, অভিন্ন মূল্যবোধ ও স্বার্থের ভিত্তিতে। তাই ইউক্রেন বিষয়ে আমরা ‘কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং’-এর মূল সদস্য এবং মাথাপিছু হিসেবে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তায় অন্যতম বড় অবদানকারী। আর্কটিক সার্বভৌমত্বের ব্যাপারে আমরা গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াই এবং গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের তাদের অনন্য অধিকারকে পূর্ণ সমর্থন করি।
ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫-এর প্রতি আমাদের অঙ্গীকার অটল। নর্ডিক-বাল্টিক গেটসহ, জোটের উত্তর ও পশ্চিম প্রান্তকে আরো সুরক্ষিত করতে তাই আমরা ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে কাজ করছি। ওভার-দ্য-হরাইজন রাডার, সাবমেরিন, বিমান এবং স্থলবাহিনীতে বড় অংকের বিনিয়োগ করেছে কানাডা। কানাডা গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে শুল্ক আরোপের তীব্র বিরোধিতা করে এবং আর্কটিকে নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির যৌথ লক্ষ্য অর্জনে লক্ষ্যভিত্তিক আলোচনার আহ্বান জানায়।
আমরা ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (টিপিপি) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে সেতু তৈরির প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দিচ্ছি। এর মাধ্যমে ১৫০ কোটি মানুষের একটি নতুন বাণিজ্য ব্লক তৈরি হবে। গুরুত্বপূর্ণ খনিজে, আমরা জি৭-কে ভিত্তি করে ‘ক্রেতা ক্লাব’ গড়ছি যাতে বিশ্ব ঘনীভূত সরবরাহ থেকে বৈচিত্র্যে যেতে পারে। আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায়, আমরা সমমনস্ক গণতন্ত্রগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা করছি যাতে শেষ পর্যন্ত আমাদের আধিপত্যশীল রাষ্ট্র এবং হাইপার-স্কেলারদের মধ্যে বেছে নিতে বাধ্য না হতে হয়।
এটা সরল বহুপক্ষীয়তা নয়, আর এটা তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভরতাও নয়। এটা এমন জোট তৈরি করা যা কাজ করে ইস্যু ধরে ধরে, এমন অংশীদারদের সঙ্গে যারা একসঙ্গে কাজ করার মতো যথেষ্ট অভিন্ন ভিত্তি ভাগ করে। কিছু ক্ষেত্রে এটা হবে বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ।
এর মাধ্যমে যা হচ্ছে তা হলো বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সংস্কৃতির ওপর এক ঘন সংযোগজাল তৈরি করছে, যেখান থেকে আমরা ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও সুযোগে শক্তি নিতে পারব। আমি বলি, মধ্যবর্তী শক্তিগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কারণ আমরা যদি টেবিলে না থাকি, আমরা মেনুতে থাকি। কিন্তু আমি এটাও বলব বৃহৎ শক্তিগুলো আপাতত একা চলতে পারে। তাদের বাজারের আকার আছে, সামরিক সক্ষমতা আছে এবং শর্ত চাপিয়ে দেয়ার মতো লিভারেজ আছে। মধ্যবর্তী শক্তির তা নেই।
কিন্তু যখন আমরা কেবল একটি আধিপত্যশীল শক্তির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয়ভাবে দরকষাকষি করি, আমরা দুর্বলতা থেকে দরকষাকষি করি। আমরা যা দেয়া হয় তা মেনে নিই। আমরা একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করি—কে সবচেয়ে বেশি মানিয়ে নেবে। এটা সার্বভৌমত্ব নয়। অধীনতা মেনে নিয়ে এটা সার্বভৌমত্বের অভিনয়। বৃহৎ শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার এ বিশ্বে মধ্যম সারির দেশগুলোর সামনে বাছাই করার সুযোগ এসেছে। তারা একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে, নাকি একত্র হয়ে শক্তিশালী একটি তৃতীয় পথ তৈরি করবে।
মধ্যবর্তী শক্তির জন্য ‘সত্যের মধ্যে বেঁচে থাকা’ মানে কী?
প্রথমত, বাস্তবতার নাম বলা। নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এমনভাবে ডাকা বন্ধ করুন যেন এটা এখনো বিজ্ঞাপনের মতো কাজ করছে। এটাকে যা তা বলুন—এটি এমন ব্যবস্থা যেখানে শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হচ্ছে, যেখানে সবচেয়ে শক্তিশালীরা অর্থনৈতিক সংযুক্তিকে জবরদস্তি হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ অনুসরণ করে।
এর মানে ধারাবাহিকভাবে কাজ করা, মিত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বী সবার ক্ষেত্রে একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা। যখন মধ্যবর্তী শক্তি একদিক থেকে আসা অর্থনৈতিক ভয় দেখানোকে সমালোচনা করে, কিন্তু অন্যদিক থেকে এলে নীরব থাকে, তখন আমরা জানালায় সাইন রেখেই দিচ্ছি।
এর মানে আমরা যা বিশ্বাস করি বলে দাবি করি, সেটা গড়ে তোলা—পুরনো ব্যবস্থা ফিরে আসার অপেক্ষা না করা। এমন প্রতিষ্ঠান ও চুক্তি তৈরি করা যা বলা মতোই কাজ করে। আর জবরদস্তি সম্ভব করে এমন লিভারেজ কমানো—এটা হলো শক্তিশালী ঘরোয়া অর্থনীতি গড়া। এটা প্রতিটি সরকারেরই তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
আর আন্তর্জাতিক বৈচিত্র্য কেবল অর্থনৈতিক বুদ্ধিমত্তা নয়, এটা সৎ পররাষ্ট্রনীতির বস্তুগত ভিত্তি, কারণ দেশগুলো প্রতিশোধের ঝুঁকি কমিয়েই নীতিনিষ্ঠ অবস্থান নেয়ার অধিকার অর্জন করে।
কানাডার কাছে বিশ্বের চাহিদার জিনিস আছে। আমরা জ্বালানির সুপারপাওয়ার। আমাদের কাছে বিপুল গুরুত্বপূর্ণ খনিজ মজুদ আছে। আমাদের আছে বিশ্বের সবচেয়ে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী। আমাদের পেনশন ফান্ডগুলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও পরিশীলিত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। অন্যভাবে বললে আমাদের আছে পুঁজি, প্রতিভা; আমাদের আছে এমন এক সরকার যার বিশাল আর্থিক সক্ষমতা আছে দৃঢ়ভাবে পদক্ষেপ নেয়ার। আর আমাদের আছে এমন মূল্যবোধ, যা আরো অনেকেই চায়।
কানাডা একটি বহুত্ববাদী সমাজ, যা ক্রিয়াশীল। আমাদের জনপরিসর বিস্তৃত, বৈচিত্র্যময় ও মুক্ত। কানাডীয়রা টেকসই উন্নয়নে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকে। আমরা এমন এক বিশ্বে স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার—যে বিশ্বটি স্থিতিশীল ছাড়া সবই। এমন অংশীদার যে দীর্ঘমেয়াদে সম্পর্ক গড়ে এবং সম্পর্ককে মূল্য দেয়। আমাদের কাছে আরেকটি জিনিস আছে। আমাদের আছে কী ঘটছে সেই স্বীকৃতি এবং সেই অনুযায়ী কাজ করার সংকল্প। আমরা বুঝি এ ভাঙন কেবল মানিয়ে নেয়ার চেয়ে বেশি কিছু দাবি করে। এটা দাবি করে পৃথিবী যেমন, তেমনই তাকে দেখার সততা।
আমরা জানালা থেকে সাইনটা নামিয়ে নিচ্ছি। আমরা জানি পুরনো ব্যবস্থা ফিরে আসছে না। আমাদের সেটাকে শোক করা উচিত নয়। নস্টালজিয়া কোনো কৌশল নয়, কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি এ ফাটল থেকে আমরা বড়, ভালো, শক্তিশালী, আরো ন্যায্য কিছু গড়ে তুলতে পারি। এটাই মধ্যম সারির শক্তিগুলোর কাজ। বৈশ্বিক বিচ্ছিন্নতা থেকে যেসব দেশের হারানোর সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, আর প্রকৃত সহযোগিতায় তাদের পাওয়ার সুযোগও সবচেয়ে বেশি।
শক্তিশালীদের আছে তাদের ক্ষমতা। কিন্তু আমাদেরও আছে কিছু ভান করা বন্ধ করার সক্ষমতা, বাস্তবতার নাম বলার সক্ষমতা, ঘরে শক্তি গড়ার সক্ষমতা এবং একসঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা। এটাই কানাডার পথ। আমরা খোলাখুলি ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এটি বেছে নিচ্ছি এবং এটি এমন একটি পথ যা যেকোনো দেশের জন্য খোলা—যারা আমাদের সঙ্গে এটি নিতে রাজি। অনেক ধন্যবাদ।
মার্ক কার্নি: কানাডার প্রধানমন্ত্রী
[সুইজারল্যান্ডের দাভোসে আয়োজিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বার্ষিক সম্মেলন ২০২৬-এ প্রদত্ত বিশেষ ভাষণের সংক্ষেপিত ও সম্পাদিত রূপ]










