নেদারল্যান্ডসের রাজধানী আমস্টারডামে গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশ্য দিবালোকে নিজ বাড়ির সামনে খুন হন ৪৪ বছর বয়সী আইনজীবী ড্রেক ওয়্যারসাম। আর এ খুনের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, দেশটির মাদক মাফিয়ারা আর শুধু নিজেদের মধ্যে খুনোখুনিতে সীমাবদ্ধ নেই। পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়ালে তারা যে কোনো পদক্ষেপ নিতে কসুর করবে না।
নেদারল্যান্ডসে দিন দিন মাদক ও এ সংক্রান্ত সন্ত্রাসের ঘটনা বাড়ছে। এ বিষয়ে দেশটির সবচেয়ে বড় পুলিশ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জ্যান স্ট্রিজস বলেন, আমাদের দেশ এখনো মেক্সিকো হয়ে যায়নি। এখানে ১৪ হাজার ৪০০টি খুনও হয়নি। কিন্তু আপনি যদি ইদানীংকালে এখানে মাদক-ব্যবসার বিস্তার, সংগঠন ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থের পরিমানের দিকে তাকান, তবে স্বীকার করতে হবে, আমরা ‘মাদক নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রে’ পরিণত হচ্ছি। মাদক ব্যবসা এখানে ‘সমান্তরাল অর্থনীতিতে’ পরিণত হতে চলেছে।
নেদারল্যান্ডসের সরকারি কৌঁসুলী ফ্রেড ওয়েস্টারবেক বলেন, ড্রেক ওয়্যারসাম খুন হওয়ার পেছনে মূল কারণ মাদক। কারণ তিনি নাবিল বি নামে একজন রাজস্বাক্ষীর আইনজীবী ছিলেন। আর নাবিল বি এমন দুজন সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে স্বাক্ষ্য দিতে যাচ্ছিলেন, যারা এদেশে মাদক মাফিয়াদের মধ্যে মোস্ট ওয়ান্টেড। ওয়্যারসামকে যেভাবে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়েছে তাতে আমাদের সন্ত্রস্ত্র হওয়ারই কথা। কারণ এ ধরনের ঘটনা নাগরিক সমাজ, গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের ওপর সরাসরি আঘাত।
এদিকে ওয়্যারসাম খুন হওয়ার আগে আমস্টারডামের মেয়র কার্যালয় থেকে গত আগস্টে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়, যেখানে রাজধানীকে মাদক-সন্ত্রাসীদের স্বর্গরাজ্য বলে অভিহিত করা হয়েছে। এ বিষয়ে দেশটির বিচারমন্ত্রী ফার্ড গ্রাপারহাউস ওই সময় বলেছিলেন, নেদারল্যান্ডস এখনো পুরোপুরি মাদক-রাষ্ট্রে পরিণত হয়নি, কিন্তু বিপদ ঘনিয়ে আসছে। তিনি আরো বলেন, আমারা জানতাম এমনটা হতে যাচ্ছে। আইনজীবী, মেয়র, পুলিশ কর্মকর্তা- এমন কেউ নেই যে এ সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে হুমকি পাননি। কিন্তু চারদিক থেকে বিপদ ঘনিয়ে এলেও আশ্চর্যজনকভাবে রাজনীতিকরা তেমন কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। ফলে মাদক-সন্ত্রাস সমাজের গভীরে পচন ধরিয়ে দিয়েছে।
এর আগে এক মতামত জরিপে দেখা যায়, নেদারল্যান্ডসের ৫৯ শতাংশ মানুষ মনে করে, দেশ মাদক-রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। অন্যভাবে বললে, দেশের অর্থনীতিই অবৈধ মাদক ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
কিন্তু নেদারল্যান্ডসের মতো চমত্কার একটি দেশের এমন পরিণতি কীভাবে হলো? এ বিষয়ে প্রখ্যাত লেখক রবার্তো সাভিয়ানো (মাফিয়া গ্রুপ নেপলস ক্যামোরার জগত নিয়ে লিখেছেন) মনে করেন, আমস্টারডামে মাফিয়াদের প্রভাব বর্তমানে উদ্বেগজনক। বিশ্বের সব অঞ্চলের গ্যাংয়ের আস্তানা এখানে রয়েছে। এর কারণ হলো, নেদারল্যান্ডস এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পোর্ট। গ্যাংগুলো জানে, যারা নেদারল্যান্ডসের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে, তাদের হাতেই চলে আসবে পুরো বিশ্বের মাদকের বাজার।
এক হিসাবে দেখা যায়, নেদারর্যান্ডসে বর্তমানে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের মাদক উত্পাদন হচ্ছে। ২০১৭ সালে দেশটিতে ২২ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের বিভিন্ন মাদক প্রস্তুত হয়। এছাড়া কলম্বিয়া ও উত্তর আমেরিকা থেকে দেশটিতে সফট ড্রাগ ঢুকছে অন্তত ৩০ বছর ধরে। আর বর্তমানে এখানে বিপুল পরিমানে উত্পাদন হচ্ছে এমডিএমএ, এলএসডি, অ্যাম্ফেটামাইন্স, জিএইচবি ও ক্রিস্টাল মেথের মতো সিনথেটিক ড্রাগ। বাস্তব চিত্র হলো, নেদারল্যান্ডসকে বর্তমানে মাদক উত্পাদনে শীর্ষ দেশ মনে করা হয়।
নেদারল্যান্ডস কি ‘মাদক-রাষ্ট্রে’ পরিণত হচ্ছে
যেদিন ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন, সেদিন আমস্টারডামের স্কিফল এয়ারপোর্টে ‘ট্রাম্পিস’ নামে এক ধরনের মাদক-ট্যাবলেট ধরা পড়ে। আর এর ২৪ ঘণ্টা পরই একই ট্যাবলেট বিক্রি হতে শুরু করে অস্ট্রেলিয়ায়।










