বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো ভূমধ্যসাগরের তলদেশে নির্মাণাধীন বিশাল সেন্সর নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ‘ঘোস্ট পার্টিকল’ তথা ‘ভুতুড়ে কণা’ বা নিউট্রিনো শনাক্ত করেছেন। এটি এখন পর্যন্ত শনাক্ত হওয়া উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনোগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী। এই নিউট্রিনোর শক্তি পূর্বে ধরা পড়া নিউট্রিনোগুলোর চেয়ে ৩০ গুণ বেশি, যা মহাজাগতিক রহস্য উন্মোচনে নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, নিউট্রিনো হলো প্রায় ভরহীন, অতিক্ষুদ্র কণা, যা আলোর কাছাকাছি গতিতে চলাচল করে। এদের ‘ভুতুড়ে কণা’ বলা হয় কারণ এরা পদার্থের মধ্য দিয়ে সহজেই চলে যেতে পারে—এমনকি গ্রহ, নক্ষত্র বা গ্যালাক্সির মধ্য দিয়েও। প্রতি সেকেন্ডে লক্ষ কোটি নিউট্রিনো আমাদের দেহ ভেদ করে যায়, কিন্তু আমরা টেরও পাই না। এই কণাগুলো মহাবিশ্বের সুদূর প্রান্ত থেকে আসে, যার উৎস হতে পারে ব্ল্যাক হোল, সুপারনোভা বা গামা-রে বিস্ফোরণের মতো অতি-শক্তিশালী ঘটনা।

নিউট্রিনো পর্যবেক্ষণের জন্য কিউবিক কিলোমিটার নিউট্রিনো টেলিস্কোপ নামের একটি বিশাল নেটওয়ার্ক ভূমধ্যসাগরের ৩ হাজার ৪৫০ মিটার গভীরে নির্মাণ করা হচ্ছে। এই টেলিস্কোপের কাজ শুরু হয় ২০১৫ সালে, যা এখনো নির্মাণাধীন।

এই টেলিস্কোপের দুটি অংশ। একটি হলো এস্ট্রোপার্টিকেল রিসার্চ উইথ কসমিক ই দ্য অ্যাবিস বা এআরসিএ (ইতালির সিসিলি উপকূলে)। যা উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো শনাক্ত করে। আরেকটি অংশ হলো অসসিলেশন রিসার্চ উইথ কসমিক ই দ্য অ্যাবিস বা ওআরসিএ, যা নিম্ন-শক্তির নিউট্রিনো অনুসন্ধান করে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ২০২৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি সক্রিয় থাকা অবস্থায়ই এই রেকর্ড-ভঙ্গকারী নিউট্রিনো ধরা পড়ে। এটি প্রায় ২৮ হাজার ফোটন (আলোর কণা) নির্গত করে, যা ডিজিটাল সেন্সরগুলোকে সংকেত দেয়।

এই নিউট্রিনোটির শক্তি ২২০ মিলিয়ন বিলিয়ন ইলেকট্রন ভোল্ট (২২০ পেটাইলেকট্রন ভোল্ট)। এটি সুইজারল্যান্ডের লার্জ হ্যাড্রন কলাইডারের সর্বোচ্চ শক্তির তুলনায় ৩০ হাজার গুণ বেশি। গবেষক ড. ব্র্যাড কে. গিবসনের মতে, ‘একটি ইউরেনিয়াম পরমাণু বিভাজনে যে শক্তি নির্গত হয়, এই নিউট্রিনোটির শক্তি তার ১ বিলিয়ন গুণ’।

বিজ্ঞানীদের মতে, এই নিউট্রিনো মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির বাইরের কোনো উৎস থেকে এসেছে, তবে এর সঠিক উৎপত্তি এখনো অজানা। তারা অনুমান করছেন, এটি হয়তো সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল, গামা রে বিস্ফোরণ বা সুপারনোভা অবশিষ্টাংশ থেকে আসতে পারে।

নিউট্রিনো শনাক্তকরণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের রহস্যময় শক্তিশালী ঘটনাগুলোর ব্যাখ্যা দিতে পারেন। মহাজাগতিক রশ্মি বা কসমিক রে কীভাবে সৃষ্টি হয় এবং কীভাবে এগুলো মহাবিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে তা বোঝার জন্য নিউট্রিনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এই আবিষ্কার নিউট্রিনো জ্যোতির্বিদ্যাকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে বলে মনে করে গবেষকরা।

কিউবিক কিলোমিটার নিউট্রিনো টেলিস্কোপ প্রকল্পের মুখপাত্র প্যাসকেল কোয়লে বলছিলেন, এটি মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণের একটি নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। একইসঙ্গে মহাবিশ্বকে নতুন আঙ্গিকে দেখার পথও দেখিয়েছে।

এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ১২টি সম্ভাব্য ব্লাজার (সক্রিয় গ্যালাক্সির উজ্জ্বল কেন্দ্র) শনাক্ত করেছেন, যা সম্ভবত এই নিউট্রিনোর উৎপত্তি স্থান হতে পারে। বিশেষজ্ঞ এরিক ব্লাউফুস বলছিলেন, অনেক নিউট্রিনো শনাক্তকরণ আমাদের পরিচিত জ্যোতিবৈজ্ঞানিক উৎসগুলোর সঙ্গে সম্পূর্ণ মেলে না। এটি হয়তো নতুন ধরনের মহাজাগতিক বস্তু বা অনেক দূরের উৎস থেকেও আসতে পারে।

গবেষকদের মতে, এই রেকর্ড-ভঙ্গকারী নিউট্রিনো শুধু একটি কণা নয়—এটি আমাদের জন্য হতে পারে মহাকাশের অজানা ইতিহাসের একটি চাবিকাঠি। ভবিষ্যতে, এমন আবিষ্কারগুলো হয়তো জানাবে আমরা কোথা থেকে এসেছি?