ছয়টি অঙ্গ রাজ্য নিয়ে গঠিত বিশ্বের ৬ষ্ঠ বৃহত্তম দেশ অস্ট্রেলিয়া; অঙ্গরাজ্যগুলো হলো নিউ সাউথ ওয়েলস, কুইন্সল্যান্ড, দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া, তাসমানিয়া, ভিক্টোরিয়া, ও পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া। এর রাজধানী ক্যানবেরা এবং বৃহত্তম শহর দুটোই দক্ষিণের অঙ্গরাজ্য নিউ সাউথ ওয়েলস। ২০০৯ সালে এক ভয়াবহ দাবানলে নিউ সাউথ ওয়েলসের পার্শ্ববর্তী ভিক্টোরিয়া জুড়ে ভয়াবহ আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল। যেটা অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে ব্ল্যাক সেটারডে বুশফায়ার নামে পরিচিত। সেই আগুনের তীব্রতা ছড়িয়ে পড়েছিল পাশ্ববর্তী আরো দুটি অঙ্গ রাজ্যে। এ ঘট্নার ঠিক এক দশক যেতে না যেতেই ফের ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডের শিকার হলো দ্বীপ মহাদেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রটি।
কয়েক মাস ধরে চলা দাবানলে অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসে প্রায় ৫০ কোটি জীবজন্তু প্রাণ হারিয়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে এ প্রাণহানির সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দাবানলের তীব্রতা কিছুটা কমলেও এখনো ১৫০ শতাধিক স্থানে আগুন জ্বলছে। যার মধ্যে আটটি স্থানের আগুন ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। সিডনি মর্নিং হেরাল্ড পত্রিকার অনলাইন ভার্সনের খবরে বলা হয়েছে, গত রাতেও অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরার পাশ্ববর্তী শহর বাটলোতে একজন মারা গেছেন। দমকল বাহিনীর চার সদস্য আহত হয়েছেন। ‘শতাধিক’ ঘরে পুড়ে ধূলিস্মাৎ হয়ে গেছে।
ইউনিভার্সিটি অব সিডনির পরিবেশবিজ্ঞানীরা আনুমানিক এক হিসাবে দেখেছেন, গত সেপ্টেম্বরের পর প্রায় ৪৮ কোটি স্তন্যপায়ী, পাখি ও সরীসৃপ প্রাণ হারিয়েছে। প্রকৃত সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
দক্ষিণ-পূর্ব অস্ট্রেলিয়ায় আঘাত হানা দাবানলে বিস্তৃত বনভূমি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। চারদিকে যেন ধ্বংসযজ্ঞের দৃশ্যই দেখা যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনে রেকর্ড সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ও খরার কারণে সৃষ্ট দাবানলে ১ হাজার ৩০০-এর বেশি বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে এবং ৯০ লাখ একর বনভূমি নষ্ট হয়েছে। এতে এখন পর্যন্ত ২১ জনের প্রাণহানি ঘটেছে; অন্তত এক ডজন অস্ট্রেলীয় এখনো নিখোঁজ রয়েছে বলে জানা গেছে।
গত কয়েক দিনের দাবানল আরো মারাত্মক আকার ধারণ করেছে এবং অস্ট্রেলিয়ায় বেশকিছু প্রজাতির প্রাণী একেবারে বিলুপ্তির হুমকিতে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন দগ্ধ কোয়ালার চিকিৎসার ছবি ও ভিডিও ঘুরতে দেখা গেছে। এছাড়া অনেক মৃত প্রাণীকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। আগুনের লেলিহান থেকে বাঁচতে ক্যাঙ্গারুর দিগ্বিদিক ছোটাছুটির ছবি ও ভিডিও দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দাবানলে কোয়ালা, ওয়ালাবি (ছোট প্রজাতির ক্যাঙ্গারু), ওমব্যাট ও ক্যাঙ্গারুসহ লাখ লাখ প্রাণী মারা গেছে।
ইউনিভার্সিটি অব সিডনির পরিবেশবিজ্ঞানীরা শুক্রবার এক বিবৃতিতে জানান, সরাসরি আগুনে দগ্ধ হয়ে বেশিরভাগ প্রাণী মারা গেছে। অন্যরা খাবার সঙ্কট, আবাসস্থল নষ্ট এবং বাঘের মতো বিড়াল প্রজাতি ও লাল শিয়ালের মতো হিংস্র জীবজন্তুর সামনে পড়ে প্রাণ হারিয়েছে।
গত ২০০ বছরে অস্ট্রেলিয়ায় প্রায় ৩৪ প্রজাতি ও উপপ্রজাতি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। দাবানলের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে কোয়ালা বেশি বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। সরকারি হিসাবে বলা হচ্ছে, আক্রান্ত অঞ্চলের ৩০ শতাংশ কোয়ালা মারা পড়তে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রী সুসান লি গত সপ্তাহে অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশনকে (এবিসি) বলেছেন, দাবানল আক্রান্ত স্থানের ৩০ শতাংশের বেশি আবাসস্থল পুড়ে যাওয়ায় ওই অঞ্চলের ৩০ শতাংশেরও বেশি কোয়ালা মারা পড়তে পারে। আগুন নির্বাপণ এবং যথাযথ হিসাব সম্পন্ন হলে আমরা ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারব।
পরিবেশবিজ্ঞানীরা বলছেন, দাবানল শুরুর পর অন্তত আট হাজার কোয়ালা মারা পড়তে পারে; কারণ এ শ্লথগতির প্রাণীটির পক্ষে দাবানল থেকে পালিয়ে বাঁচা বেশ কঠিন। বিভিন্ন দগ্ধ কোয়ালার ছবি ছড়িয়ে পড়ায় তাদের সহায়তার উদ্দেশ্যে একটি গোফান্ডমি পেজ চালু করেছে অস্ট্রেলিয়ার পোর্ট ম্যাককোয়ারি কোয়ালা হাসপাতাল। গত সেপ্টেম্বরের পর থেকে হাসপাতালটি ২০ লাখ ডলারের বেশি অনুদান পেয়েছে। তবে বিশাল সংখ্যক আহত কোয়ালার চিকিৎসায় তা অপ্রতুল।
ছবি: এএফপি, সিডনি মর্নিং হেরাল্ড










