নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়, তরুণ আফ্রিকান-আমেরিকান চিত্রশিল্পী ডেরিক অ্যাডামস এক গভীর সত্যের মুখোমুখি হন। তিনি উপলব্ধি করেন, একজন কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পীর প্রতিটি সৃষ্টিতেই রাজনীতির ছায়া পড়ে। এমনকি ফুল কিংবা রংধনু আঁকলেও, তা রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। এই উপলব্ধি প্রথমে তাকে কিছুটা ভারাক্রান্ত করলেও, পরে তা শিল্প সৃষ্টির নতুন স্বাধীনতা এনে দেয়। এ অনুভূতি যেন শেকল ভাঙা মুক্ত এক পাখির মতো। ডেরিক অ্যাডামস বুঝতে পারেন, তার প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি তুলির আঁচড়, এমনকি তার নিশ্বাসও যেন রাজনীতির অংশ। তাই তার শিল্পে জীবনের গভীর অনুভূতির সঙ্গে মিশে থাকে সমাজের নানা অসঙ্গতি ও বৈষম্যের চিত্র।
অ্যাডামসের ক্যানভাসে পাওয়া যায় ইতিহাস ও বর্তমানের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। যেন এক রঙিন স্বপ্ন, যেখানে আফ্রো-আমেরিকান ইতিহাস জীবন্ত হয়ে ওঠে। আবার কখনো ব্যক্তিগত স্মৃতি, নিছক আনন্দময় মুহূর্তও ধরা পড়ে তার তুলিতে। ১৯ শতকের ঐতিহ্যবাহী সিরামিক শিল্প যেমন তার ক্যানভাসে স্থান পায়, তেমনি ১৯৯৭ সালের ‘বি.এ.পি.এস’ সিনেমার রঙিন দৃশ্যও জীবন্ত হয়ে ওঠে। তবে অ্যাডামস মনে করেন, শিল্পের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে দর্শকের চোখে। প্রতিটি দর্শকের নিজস্ব ভাবনার স্বাধীনতা থাকা উচিত।

'সুইটেনিং দ্য পট' (২০২৪) চিত্রকর্মে, ১৯ শতকে দাসত্ব করা অজ্ঞাত শিল্পীদের তৈরি সিরামিকের জগগুলোর প্রতি ডেরিক অ্যাডামসের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
এই প্রদর্শনীতে বিনোদন ও অবসরের মুহূর্তগুলো বিশেষভাবে ফুটে উঠেছে। গবেষণায় দেখা যায়, কৃষ্ণাঙ্গরা প্রায়ই প্রকৃতির সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হন। কিন্তু অ্যাডামসের ক্যানভাসে তারা প্রকৃতির মাঝে অবাধে ঘুরে বেড়ান, যেন এক অন্য জগতে হারিয়ে যান।

'গেটিং দ্য ব্যাগ' চিত্রকর্মে একজন কৃষ্ণাঙ্গ কাউবয়কে দেখানো হয়েছে যিনি একজন বাজপাখিকে আলিঙ্গন করছেন এবং হাতে একটি টেলফার ব্যাগ ধরে আছেন।
অ্যাডামসের শিল্পকে ‘ব্ল্যাক জয়’ বলা হলেও, তিনি মনে করেন এটি একটি সরল ধারণা। তার শিল্পে শুধু আনন্দই নয়, বরং এতে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক গভীর প্রকাশ রয়েছে। প্রদর্শনীতে ১৮০০ সালের কৃষ্ণাঙ্গ দাস শিল্পীদের সিরামিক শিল্পও স্থান পেয়েছে।

ডেরিক অ্যাডামসের প্রদর্শনীতে 'ফ্যান্টাস্টিক ভয়েজ' ও 'বেইকড ইন' নামের দুটি চিত্রকর্ম। শিল্পীর অবসর মুহূর্তের এই দৃশ্যগুলো ‘ব্ল্যাক জয়’ হিসেবে পরিচিত।
আর তাই তো অ্যাডামসের ভাষ্যে ফুটে ওঠে অতীতের প্রতিচ্ছবি। দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ থেকেও যারা শিল্পের মাধ্যমে নিজেদের সৃজনশীলতাকে মেলে ধরে, তাদের প্রতি অন্তরের গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন তিনি। তার এই মন্তব্য যেন শুধু একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়। বরং এক হার না মানা চেতনার বহিঃপ্রকাশ। প্রতিকূলতার প্রাচীর ভেঙে যারা শিল্পের আলো জ্বালিয়ে রেখেছিলেন, তারা আজও শিল্পীদের পথপ্রদর্শক। তাদের সৃষ্টিতে মিশে আছে জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার অদম্য স্পৃহা, যা বর্তমান শিল্পীদের মনেও আশা জাগায়।
—সিএনএন










