পর্যটকদের জন্য আজ থেকে উন্মুক্ত হচ্ছে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন। দ্বীপে রাতযাপনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ায় ভ্রমণের সুযোগ বাড়লেও পর্যটকদের জন্য কমেনি যাতায়াতের ভোগান্তি ও ব্যয়। মিয়ানমারের সংঘাতের কারণে নাফ নদীকেন্দ্রিক সহজ নৌপথ বন্ধ থাকায় এখন কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া ঘাটসহ দীর্ঘ বিকল্প পথে দ্বীপে যেতে হচ্ছে। এতে কয়েক বছরের ব্যবধানে জাহাজ ভাড়া বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। দীর্ঘ নৌযাত্রা, আবাসন ও আনুষঙ্গিক ব্যয় মিলিয়ে সাধারণ পর্যটকদের কাছে সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ ক্রমেই বিলাসী হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, সাবরাং থেকে সেন্ট মার্টিন যেতে সময় লাগে প্রায় ২ ঘণ্টা, টেকনাফ থেকে আড়াই ঘণ্টা, ইনানী থেকে ৪ থেকে সাড়ে ৪ ঘণ্টা। আর কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া ঘাট থেকে যেতে লাগে ৭-৮ ঘণ্টা, কখনো ৯-১০ ঘণ্টাও। ফলে ঢাকা থেকে গিয়ে এক রাত অবস্থান করে ফিরতে একজন পর্যটককে কমপক্ষে তিনদিন সময় ব্যয় করতে হচ্ছে।

যাতায়াত ব্যয়ও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। ২০২৩ সালে টেকনাফ থেকে সেন্ট মার্টিনের সাধারণ শ্রেণীর যাওয়া-আসার ভাড়া ছিল এক-দেড় হাজার টাকা। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে নুনিয়ারছড়া ঘাট থেকে জাহাজ চলাচল শুরু হলে সর্বনিম্ন ভাড়া নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ৮০০ টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৬০০ টাকায়। জ্বালানি, শ্রমিকের মজুরি ও জাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বৃদ্ধিকে এর কারণ হিসেবে দেখাচ্ছেন অপারেটররা।

ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজারের (টোয়াক) সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাফ-উদ-দোলা আশেক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সেন্ট মার্টিনের জন্য বর্তমান জাহাজ ভাড়া অবশ্যই বেশি। তবে জ্বালানি তেলের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। মুদ্রাস্ফীতির কারণে শ্রমিকের মজুরিসহ পরিচালন ব্যয়ও বেড়েছে। সমুদ্রগামী জাহাজগুলো বছরে মাত্র দুই-আড়াই মাস চলাচল করতে পারে। বাকি সময় কর্মীদের বেতন ও জাহাজ রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় বহন করতে হয়। জাহাজের সংখ্যা বাড়লে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ভাড়া কমতে পারে।’

বিকল্প নৌপথ চালুর সম্ভাবনা থাকলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে সেগুলো কার্যকর হচ্ছে না। শাহপরীর দ্বীপে বড় জাহাজের উপযোগী জেটি ও পর্যাপ্ত নাব্যতা নেই। সাবরাংয়েও প্রয়োজনীয় জেটি অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। ইনানীর নৌবাহিনীর জেটি থেকে একসময় জাহাজ চলাচল করলেও বিরূপ আবহাওয়া ও জেটির পল্টুন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তা বন্ধ হয়ে যায়।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) কক্সবাজার নদীবন্দরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নয়ন শীল বলেন, ‘পর্যটক পরিবহনকারী জাহাজের ভাড়া নির্ধারণ করে স্থানীয় প্রশাসন। বিআইডব্লিউটিএ রুট পারমিট ও নৌযান চলাচলের অনুমোদন দেয়। কক্সবাজার-সেন্ট মার্টিন রুটের ভাড়া নির্ধারণে সংস্থাটির ভূমিকা নেই।’

জাহাজ ভাড়ার বাইরেও পর্যটকদের গুনতে হচ্ছে বিভিন্ন ফি। এর মধ্যে রয়েছে ৫ শতাংশ সেলস কমিশন, জনপ্রতি ১০০ টাকা ইসিএ ফি, জেটি টোল ও বিচ ম্যানেজমেন্ট ফি। সব মিলিয়ে ঢাকা থেকে নন-এসি বাসে কক্সবাজার হয়ে সেন্ট মার্টিন ঘুরে আসতে জনপ্রতি ন্যূনতম ১১-১২ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে। খাবার ও ব্যক্তিগত খরচ যোগ হলে ব্যয় আরো বাড়ে।

এদিকে পর্যটন খাতে নীতিগত অনিশ্চয়তাও বিনিয়োগে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর পর্যটক চলাচলের অনুমতি, দৈনিক পর্যটকের সংখ্যা ও রাতযাপনের সুযোগ নিয়ে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হওয়ায় উদ্যোক্তারা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারছেন না। টোয়াকের সাবেক সভাপতি তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘গত কয়েক বছরে সরকারের বিভিন্ন পরীক্ষামূলক সিদ্ধান্তে সেন্ট মার্টিনের পর্যটন উদ্যোক্তারা লোকসানের মুখে পড়েছেন। দৈনিক পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানো এবং নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত রাতযাপনের সুযোগ দেয়ার দাবি জানিয়েছি।’

চলতি মৌসুমে নতুন জাহাজ যুক্ত হলে ভাড়া কমার সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এবার এমভি মালঞ্চ ও গ্রিনলাইনের একটি জাহাজ এ রুটে যুক্ত হওয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে দীর্ঘ নৌপথের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প ঘাট চালু, ভাড়া নির্ধারণে সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন এবং পর্যটন নীতিতে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত না হলে সেন্ট মার্টিন ভ্রমণের ব্যয় ও ভোগান্তি কমানো কঠিন হবে বলে মনে করছেন তারা।