জাপানি গৃহিণী কিরিনা মোচিজুকির কাছে ‘ওকোনোমিয়াকি’ সবসময়ই ছিল প্রিয় খাবার। হিরোশিমার এই জনপ্রিয় প্যানকেক তার কাছে শুধু সুস্বাদুই নয়, বরং সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী। কিন্তু এখন পরিচিত স্বাদের এই খাবার রান্না করা হয়ে উঠেছে চ্যালেঞ্জিং।
কারণ, মূল উপাদান বাঁধাকপির দাম সম্প্রতি তিনগুণ বেড়েছে। হিরোশিমার বাসিন্দা মোচিজুকি এখন প্রতিদিন সুপারমার্কেটে ছুটছেন ডিসকাউন্টের খোঁজে। অথবা বিকল্প হিসেবে শুকনো সামুদ্রিক শৈলী ব্যবহার করছেন। ‘কখনো ভাবিনি ওকোনোমিয়াকি বিলাসবহুল খাবার হয়ে উঠবে’, বলেন এই দুই সন্তানের মা। যিনি এখন পানির গ্লাসে পেঁয়াজের গোড়া পুনরায় জন্মানোর কৌশলও রপ্ত করেছেন খরচ কমাতে।
জাপানে দীর্ঘদিন ধরে স্থিতিশীল মূল্যের পর এখন মূল্যস্ফীতি কঠোরভাবে আঘাত হেনেছে। মূল্যস্ফীতির এই ঢেউ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। টোকিওতে বাঁধাকপির গড় মূল্য গত বছরের তুলনায় তিনগুণ ছাড়িয়েছে, যা একজন শ্রমিকের ঘণ্টাপ্রতি আয়ের সমান। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বরে জাপানি প্রাপ্তবয়স্কদের সবজি গ্রহণের পরিমাণ রেকর্ড পর্যায়ে নেমেছে। অন্যদিকে, সস্তা ফুরিকাকে (শুকনো মশলা) রাতের খাবারের প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহার বেড়েছে—গত বছর এর বিক্রি রেকর্ড ছুঁয়েছে। নিত্যপণ্যের দাম অনেক পরিবারকে তাদের খাদ্যাভ্যাস বদলাতে বাধ্য করছে। শুধু বাঁধাকপি নয়, চালের দামও দ্রুত বাড়ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছে যে চালের দাম ২০২৬ সালের বসন্ত পর্যন্ত বেশিই থাকবে।
এই সংকট সামলাতে নাগরিকদের মধ্যে নতুন উপায় খুঁজে নেয়ার প্রবণতা বাড়ছে। যার মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে—বাড়ির ভেতরে কৃষিকাজ বা ‘লিভিং রুম ফার্মিং’। ইউটিউবার কাজুকি নাকাতা প্রথমে মহামারীকালে শখের বশে ঘরে সবজি চাষ শুরু করেছিলেন, কিন্তু এখন এটি তার পূর্ণকালীন পেশা। ২০২৩ সালে তিনি চাকরি ছেড়ে ঘরের মধ্যে প্লাস্টিকের বোতল, বিয়ারের ক্যান এমনকি সাইকেলের ঝুড়িতে ৪৭ ধরনের সবজি চাষ শুরু করেন। তার ইউটিউব চ্যানেলে প্রায় ৯০,০০০ অনুসারী রয়েছে, যেখানে তিনি দেখান কীভাবে বাজার থেকে কেনা সবজির অপ্রয়োজনীয় অংশ দিয়ে নতুন শাকসবজি উৎপাদন করা যায়।
তবে এই চাষের পদ্ধতিতে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। নাকাতার পরিবারকে গরমের রাতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘর ছাড়াই থাকতে হয়, কারণ বিদ্যুতের ব্যয় বাঁচাতে চান তিনি। এমনকি তার স্ত্রী অভিযোগ করেন যে নবজাতককে স্তন্যপান করানোর সময় লিভিং রুমের পর্দা বন্ধ রাখা যায় না, কারণ গাছগুলোর জন্য সূর্যের আলো প্রয়োজন।
তবে সব কষ্টের পরেও নাকাতা মনে করেন, এটি একটি কার্যকর সমাধান। সম্প্রতি তিনি রান্নাঘরের একটি বাটিতে বাঁধাকপির ফেলে দেয়া মূল অংশ দিয়ে চাষ করে সফল হয়েছেন। ‘ঘরে সবজি চাষ করে আমরা খাবারের খরচ অনেক কমিয়ে আনতে পেরেছি। এখন আমি আমার অভিজ্ঞতা অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই‘, বলেন তিনি।
ব্যয় সংকোচনের এই সংস্কৃতি জাপানের সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। ঘরোয়া কৃষি, পুনর্ব্যবহার ও বিকল্প খাদ্যাভ্যাস শুধু অর্থ সাশ্রয়ই নয়, এক নতুন জীবনদর্শনের প্রতীক হয়ে উঠছে।
মোচিজুকির কথায়, প্রতিদিনের জিনিসে ১০ ইয়েন বৃদ্ধিও কয়েক মাসে বিশাল অঙ্ক। ঘরোয়া কৃষি খাদ্য নিরাপত্তা দিচ্ছে। মূল্যস্ফীতির এই যুগে জাপানিরা প্রমাণ করছেন, সৃজনশীলতা আর সহনশীলতাই হতে পারে টেকসই সমাধানের চাবিকাঠি। সূত্র- রয়টার্স










