এরিক হুয়াং গত মাসে চীনা নববর্ষ উদযাপন করতে পরিবারের কাছে যাননি। কারণ তিনি বাবা-মায়ের সঙ্গে নিয়ে নিয়ে অস্বস্তিকর আলোচনায় পড়তে চাননি। ‘আমরা প্রায়ই ফোনে এই বিষয়ে (বিয়ে প্রসঙ্গে) কথা বলি, যদি আমি এবার বাসায় যেতাম তাহলে কি হতো নিশ্চিতভাবেই আমি তা অনুমান করতে পারি’—বলছিলেন ৩২ বছর বয়সী হুয়াং। তিনি বলেন, ‘আমি এখনো অবিবাহিত—এটা আমার বাবা-মায়ের কছে মোটেই পছন্দের বিষয় নয়।’
হুয়াংয়ের অবস্থা চীনের সমাজে একটি বড় পরিবর্তনকে প্রতিফলিত করে। এখনকার তরুণরা আগের চেয়ে অনেক কম বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে চীনে নতুন বিবাহ নিবন্ধন ২০.৫ শতাংশ কমে মাত্র ৬.১ মিলিয়নে দাঁড়িয়েছে। যা ১৯৭৮ সালের পর সর্বনিম্ন এবং এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ পতন।
এ পরিসংখ্যান মূলত তরুণদের বিবাহ সম্পর্কে কম আগ্রহী হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। এমন সময়ে বিয়ের প্রতি এই অনাগ্রহ বাড়ছে যখন চীন সরকার জন্মহার বাড়াতে নানামুখী উদ্যোগ নিচ্ছে।
বেইজিংয়ের সেন্টার ফর চায়না অ্যান্ড গ্লোবালাইজেশনের জনসংখ্যাবিদ হুয়াং ওয়েনঝেং বলেন, মানুষের বিয়ে করার আগ্রহ নাটকীয়ভাবে কমেছে। এটা স্পষ্ট।
উচ্চশিক্ষার বিস্তার, নগরায়ন ও দুর্বল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব বিয়ের প্রতি অনাগ্রহ বাড়িয়ে তুলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা আগামী বছরগুলোতেও অব্যাহত থাকবে।
চীনের জনসংখ্যা টানা তিন বছর ধরে হ্রাস পাচ্ছে, যা দেশটির দীর্ঘদিনের এক-সন্তান নীতির প্রত্যক্ষ প্রভাব। কম বয়সী ও বিবাহযোগ্য জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কমছে এবং একইসঙ্গে জন্মহারও হ্রাস পাচ্ছে। যদিও ২০২৪ সালে জন্মহার সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা এটিকে স্বল্পমেয়াদী একটি প্রবণতা হিসেবে দেখছেন। কারণ ওই বছরটি চীনা জ্যোতিষশাস্ত্রে শুভ বছর হিসেবে বিবেচিত হয়। যা প্রভাবে ২০২৩ সালে বিয়ের সংখ্যা কিছুটা বেড়েছিল।
২০১৬ সালে এক-সন্তান নীতি বাতিলের পর, চীনা কর্তৃপক্ষ দম্পতিদের বিবাহ ও সন্তান জন্মদানে উৎসাহিত করতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৩ সালে সরকারের পক্ষ থেকে একটি ‘ফার্টিলিটি-ফ্রেন্ডলি সমাজ’ গঠনের পরিকল্পনা নেয়া হয়। যার আওতায় মাতৃত্বকালীন ছুটি বৃদ্ধি এবং প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নসহ বেশ কিছু নীতি চালু করা হয়। বিভিন্ন শহর কর্তৃপক্ষ নতুন বিবাহিত দম্পতিদের ও নতুন বাবা-মায়েদের জন্য নগদ ভর্তুকির ঘোষণাও দিয়েছে।
তবে সরকার যতই উৎসাহিত করুক না কেন, চীনের তরুণ প্রজন্ম বিয়ে ও সন্তান জন্মদানে আগ্রহী নয়। কারণ, তারা কঠিন চাকরির বাজার এবং বড় শহরগুলোর চড়া বাড়িভাড়ার চাপে জর্জরিত।
বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল শহরগুলোতে বাড়িভাড়া ও সম্পত্তির মূল্য এখনও তরুণদের নাগালের বাইরে। তাছাড়া, চাকরির বাজারও ক্রমশ প্রতিযোগিতাপূর্ণ হয়ে উঠছে, যার ফলে অনেক তরুণ তাদের ক্যারিয়ার গড়ে তোলার দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন, বিয়ের দিকে নয়।
চীনের জনসংখ্যাগত পরিবর্তন শুধু দেশটির অর্থনীতিই নয়, সামগ্রিক সামাজিক কাঠামোও বদলে দিচ্ছে। তরুণদের মধ্যে বিবাহ এবং সন্তান গ্রহণের আগ্রহ কমার ফলে ভবিষ্যতে শ্রমবাজার সংকুচিত হতে পারে, যা প্রবৃদ্ধির গতি কমিয়ে দেবে।










