বুদ্ধিমান প্রাণীর উদ্ভব কি মহাজাগতিক সৌভাগ্যের ফল নাকি পরিবেশগত বিবর্তনের স্বাভাবিক ফলাফল তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে দীর্ঘ বিতর্ক রয়েছে। সম্প্রতি সায়েন্স অ্যাডভান্সেস জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণা এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিজ্ঞানীরা বলেন যে প্রায় ৩ লাখ বছর আগে আফ্রিকায় আবির্ভূত হয় উন্নত মানব প্রজাতি হোমো সেপিয়েন্স। তবে ঠিক কীভাবে পৃথিবীতে প্রাণের সঞ্চার হলো এবং বুদ্ধিমান প্রাণীর বিবর্তন হলো তা নিয়ে অনেকেই অনেক তত্ত্ব দিয়ে থাকেন।

১৯৮৩ সালে পদার্থবিদ ব্র্যান্ডন কার্টার প্রস্তাবিত ‘হার্ড স্টেপস’ তত্ত্ব অনুযায়ী, পৃথিবীতে বুদ্ধিমান প্রাণের উদ্ভব এক অসম্ভব রকমের দুর্লভ ঘটনা। এই তত্ত্বে জীবনের বিবর্তনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপকে অত্যন্ত অনিশ্চিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যেমন—প্রথম এককোষী জীবের উদ্ভব, ফটোসিনথেসিসের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের প্রাচুর্য, প্রোক্যারিওটিক থেকে ইউক্যারিওটিক কোষে রূপান্তর, বহুকোষী প্রাণের বিকাশ এবং সর্বশেষে ভাষা ও প্রযুক্তিসম্পন্ন মানবসভ্যতার আবির্ভাব। প্রতিটি ধাপই সময় ও পরিস্থিতির এক জটিল সমন্বয়ের ফল বলে বিবেচিত হয়।

তবে জার্মানির মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের জিওমাইক্রোবায়োলজিস্ট ড্যান মিলসের নেতৃত্বে একদল গবেষক দাবি করছেন, বুদ্ধিমান প্রাণের উদ্ভব আসলে পরিবেশের পূর্বনির্ধারিত ফল। বিজ্ঞান জার্নাল সায়েন্স অ্যাডভান্সেস-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় তারা দাবি করেন, কোনো গ্রহে যদি পুষ্টি উপাদান, সমুদ্রের লবণাক্ততা, বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেন ও উপযুক্ত তাপমাত্রার উপস্থিতিতে ‘হ্যাবিটেবিলিটি উইন্ডো’ সক্রিয় হয়, তবে সেখানে বুদ্ধিমান প্রাণের বিকাশ প্রায় অনিবার্য। পৃথিবীতে এই শর্তগুলো পূর্ণ হওয়ায় মানুষের বিবর্তন তুলনামূলকভাবে দ্রুত ঘটেছে।

পেন স্টেটের মাইক্রোবায়োলজিস্ট জেনিফার ম্যাকালাডি আরও যোগ করেন, জীবনের সূচনা বা জটিল কোষের উদ্ভবের মতো ‘হার্ড স্টেপস’ পরিবেশ-নির্ভর। পৃথিবীর তাপমাত্রা বায়োমলিকিউল ও তরল পানি ধারণের জন্য উপযোগী হয়েছিল বলেই অতি দ্রুত প্রাণের সৃষ্টি হয়েছিল। অন্যদিকে, প্রায় ৫০ কোটি বছর আগে বায়ুমণ্ডলে দ্বিতীয়বার অক্সিজেন বৃদ্ধির পরই কেবল মানুষের আবির্ভাবের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছিল।"

এ গবেষণা কেবল অতীতের রহস্য নয়, ভবিষ্যতের অনুসন্ধানেও প্রভাব ফেলবে। অনুকূল পরিবেশে বুদ্ধিমান প্রাণের উদ্ভব যদি ‘অনিবার্য’ হয়, তাহলে মহাবিশ্বে আমরা একা নই। কিন্তু হার্ড স্টেপস তত্ত্ব সঠিক হলে মানবসভ্যতা এক মহাজাগতিক বিস্ময়।

গবেষক ড্যান মিলসের ভাষ্যে, আমরা কি মহাবিশ্বে এক বিচ্ছিন্ন কাকতালীয় ঘটনা নাকি কোনো জীবন্ত গ্রহের প্রত্যাশিত ফল? এর উত্তর জানা গেলেই আমাদের অস্তিত্বের রহস্য উন্মোচিত হবে।

বিজ্ঞানীরা এখন এক্সোপ্ল্যানেটে প্রাণের সন্ধানে ব্যস্ত। আমাদের সৌরজগতের বাইরে প্রায় ৫,৮০০ এক্সোপ্ল্যানেট শনাক্ত হয়েছে। পেন স্টেট এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল ইন্টেলিজেন্স সেন্টারের পরিচালক জেসন রাইট বলেন, পৃথিবীর আকারের এমন অনেক গ্রহ রয়েছে যেগুলো তাদের নক্ষত্র থেকে উপযুক্ত দূরত্বে অবস্থান করার ফলে তরল পানি ধারণ করতে পারে, যা প্রাণের উদ্ভবের জন্য অপরিহার্য উপাদান।