দশ বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর পরিবারে যে অর্থকষ্ট ও গভীর বিষণ্নতা নেমে আসে তা শিশু রন ম্যালেটকে ভয়ঙ্কারভাবে নাড়া দিয়েছিল। তবে টেলিভিশন মেরামতকারী বাবা তাকে শিখিয়ে গিয়েছিলেন অমূল্য এক অভ্যাস। প্রচুর বই পড়তে দিতেন ম্যালেটকে। বই পাগল ম্যালেটের হাতেই একদিন এসে পড়ে টাইম ট্রাভেল (কাল ভ্রমণ) নিয়ে একটি কমিক বুক। এইচজি ওয়েলশের ক্লাসিক সায়েন্স ফিকশন উপন্যাস ‘দ্য টাইম মেশিন’ এর একটি ইলাস্ট্রেশন করা কপি। 

সম্প্রতি এ নিয়ে মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনের সঙ্গে কথা বলেছেন রন ম্যালেট। তিনি বলেন, বইটি আমার জীবন বদলে দেয়। অসাধারণ কল্পনাশক্তির জন্য লেখক ওয়েলশকে ধন্যবাদ। বইটি পড়ার পর তার উপলব্ধি হলো, যে পারিবারিক ট্র্যাজেডির স্মৃতি তিনি বয়ে বেড়াচ্ছেন সেটাই শেষ নয়, বরং এটা কেবল শুরু!

সেই ঘটনার ৬০ বছর পর ৭৪ বছর বয়সে ম্যালেট ইউনিভার্সিটি অব কানেটিকাটে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক হন। ক্যারিয়ারের পুরোটা সময় তিনি ব্যয় করেছেন ব্ল্যাকহোল,  আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব, মহাবিশ্ব নিয়ে বিভিন্ন তত্ত্ব, সময় ও মহাকর্ষের রহস্য অনুসন্ধানে। মূলত আইনস্টাইনের প্রিয় বিষয়গুলোকে গবেষণার বিষয় হিসেবে বেছে নেন ম্যালেট।

একই সঙ্গে ম্যালেট টাইম ট্রাভেলের তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরির চেষ্টা করেন। কীভাবে অতীতে ভ্রমণ করা যাবে, যদি বাবার সঙ্গে কাটানো সেই সময়গুলো আবার ফিরে পাওয়া যেত, সেই আশায় বুক বেঁধে তিনি পাগলের মতো গবেষণা চালিয়ে গেছেন।

নিউইয়র্ক শহরের ব্রোঙ্কসে ম্যালেটের জন্ম। পরে তার পরিবার পেনসিলভানিয়াতে চলে যায়। সেখানে রুটিরুজির জন্য খুব কঠিন দিন পার করছিল তার পরিবার। এর মধ্যে বাবার মৃত্যুর পর বইয়ের জগতে নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দিয়ে প্রশান্তি খুঁজেছিলেন তিনি। পড়তে গিয়েই আইনস্টাইনের লেখার সঙ্গে তার পরিচয়। 

হাইস্কুলের পাঠ চুকানোর পর তিনি সাবেক সেনাদের পরিচালিক কলেজে ভর্তি হন। পরে মার্কিন বিমানবাহিনীতে চাকরি করেন। সেখানে চার বছর চাকরির সময় ভিয়েতনাম যুদ্ধেও অংশ নেন তিনি। পরে পদার্থবিদ্যায় স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর করেন। আইনস্টাইনের তত্ত্বের ওপর বিশেষ জ্ঞান অর্জন করেন ম্যালেট।

ম্যালেটের প্রথম চাকরি ছিল বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড টেকনোলজিসে। সেখানে লেজার রশ্মি নিয়ে কাজ করতেন। তার কাজ ছিল জেট ইঞ্জিনের টারবাইনে ছিদ্র করার জন্য লেজার রশ্মিকে আরো কতো কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায় সে কৌশল বের করা। এখানে গণিতের তাত্ত্বিক জ্ঞানের ব্যবহারিক প্রয়োগে হাত পাকান তিনি। এর বছরদুয়েক পরই ইউনিভার্সিটি অব কানেটিকাটে পদার্থবিদ্যার সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।

পড়াশোনা, চাকরি, গবেষণা, ভিয়েতনাম যুদ্ধে গমন এবং ফিরে আসা- এর মধ্যে কখনোই টাইম ট্রাভেলের (কাল ভ্রমণ) উচ্চাভিলাস ত্যাগ করেননি ম্যালেট। তবে এ নিয়ে তিনি কানেটিকাটের চাকরিটা স্থায়ী হওয়ার আগে কখনোই মুখ খোলেননি। কারণ চাকরি স্থায়ী হলে একজন অধ্যাপক স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন। কর্মকাণ্ড কর্তৃপক্ষ অপছন্দ হলেও বরখাস্ত হওয়ার ভয় থাকে না।

নিজের কাল ভ্রমণের তত্ত্ব গাণিতিকভাবে প্রমাণ করেছেন বলে দাবি করেন ম্যালেট

এ ব্যাপারে ম্যালেট বলেন, পাগলাটে অধ্যাপক বা এ ধরনের তকমার ব্যাপারে তিনি খুব সচেতন ছিলেন। তিনি চাননি তার অভিলাস নিয়ে মানুষ হাসাহাসি করুক বা এতে তার চাকরিটাই হুমকির মুখে পড়ুক। তবে প্রকাশ্যে ঘোষণা দেয়ার পর তিনি খুব অবাক হয়েছিলেন। কারণ দেখা গেল, অনেকেই তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করলেন। কাল ভ্রমণের আকাঙ্ক্ষার ব্যাপারে তার সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী হয়ে উঠলো অনেকেই। এমনকি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ তার সঙ্গে যোগাযোগ করে অতীতে ফিরে যাওয়ার একটা উপায় করে দিতে আবদার জানাতে থাকে!

তবে এখনো পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি করতে পারেননি ম্যালেট। যদিও তাত্ত্বিক ও গাণিতিকভাবে অনেকখানি এগিয়ে গেছেন বলে তার দাবি। ম্যালেটের এ কাল ভ্রমণ কৌশলের মূল ভিত্তি আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সাধারণত তত্ত্ব। যেটি মূলত তৈরি হয়েছে মহাকর্ষের ধারণার ওপর ভিত্তি করে। বিষয়টি বর্ণনা করতে স্থান-কালের ধারণা এনেছেন আইনস্টাইন। ম্যালেট বলেন, মহাকর্ষের কারণে সময় বা কাল প্রভাবিত হতে পারে। আইনস্টাইনের এ তত্ত্ব মতে, বিপুল ভরসম্পন্ন কোনো বস্তু স্থানকে বাঁকিয়ে দিতে পারে। স্থান বাঁকিয়ে দেয়া মানে তাতে সময়ও প্রভাবিত হওয়া। কারণ আইনস্টাইনের মতে, স্থান-কাল পরস্পর সম্পর্কিত বিষয়। 

এইচজি ওয়েলশের ‘দ্য টাইম মেশিন’ উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৬০ সালে নির্মিত চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য

নিজের তত্ত্বকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রচুর পরীক্ষা নিরীক্ষাও চালিয়েছেন ম্যালেট। জেট ইঞ্জিন কোম্পানিতে চাকরির সময় লেজার রশ্মি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে চমৎকার একটি ধারণা পেয়েছেন তিনি। ঘূর্ণায়মান লেজার রশ্মি দিয়ে স্থান-কালকে মুচড়ে দেয়ার তত্ত্ব আবিষ্কার করেছেন তিনি। এ তত্ত্ব গাণিতিকভাবে প্রমাণ করারও দাবি করেন ম্যালেট।

এ গবেষণায় এখনো কোনো স্বীকৃতি না মিললেও হলিউড থেকে ডাক পেয়েছে ম্যালেট। ২০০৮ সালে যৌথ উদ্যোগে লেখা আত্মজীবনী ‘দ্য টাইম ট্রাভেলার’ থেকে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের কথা উঠেছিল। প্রখ্যাত পরিচালক স্পাইক লি এ প্রকল্পে ছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত তা আলোর মুখ দেখেনি। ম্যালেট জানান, বড় একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান তার গল্পের স্বত্ব কিনেছে। আরেকটি চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে কাজ চলছে। 

সিএনএন অবলম্বনে