দীর্ঘ নয় মাস মহাকাশে থাকার পর অবশেষে পৃথিবীতে ফিরলেন নাসার নভোচারী সুনীতা উইলিয়ামস ও বুচ উইলমোর। গত বুধবার (মার্চ ১৮) তাদের স্পেসএক্স ক্রু ড্রাগন ক্যাপসুলটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পর চারটি প্যারাশুট খুলে ধীরে ধীরে নেমে আসে ফ্লোরিডা উপকূলের কাছে সমুদ্রে। অবতরণের পর ক্যাপসুলের চারপাশে ঘুরছিল ডলফিনের একটি দল। পরে একটি উদ্ধারকারী জাহাজ ক্যাপসুলটি পানি থেকে তুলে নেয়। এরপরই নভোচারীরা হাঁসিমুখে হাত নেড়ে অভিবাদন জানান। তাদের সঙ্গে ছিলেন সহকর্মী নভোচারী নিক হ্যাগ ও রুশ মহাকাশচারী আলেকজান্ডার গোরবুনভ। খবর বিবিসি।
কেবল যে সুনীতা উইলিয়ামস বা বুচ উইলমোরই মহাকাশে দীর্ঘকাল অবস্থান করেছেন তা কিন্তু নয়। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় সবচেয়ে দীর্ঘ একক মহাকাশ যাত্রার রেকর্ড রাশিয়ান নভোচারী ভ্যালেরি পলিয়াকভের। তিনি ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে টানা ৪৩৭ দিন মির মহাকাশ স্টেশনে অবস্থান করেন। মার্কিন নভোচারী ফ্রাঙ্ক রুবিও ৩৭১ দিন আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস) কাটান। ভ্রমণ করেছেন ২৫ কোটি ৩৩ লাখ কিলোমিটার দূরত্ব।
মহাকাশ অভিযান কেবল বৈজ্ঞানিক সাফল্যই নয়; এটি মানবদেহের সীমা ও সক্ষমতার পরীক্ষা। মহাকাশে অবস্থান মানবদেহে নানান রকম পরিবর্তন আনে—যেমন হাড় ক্ষয়, পেশী দুর্বলতা, উচ্চতা বৃদ্ধি থেকে শুরু করে দৃষ্টিশক্তি ও মস্তিষ্কের পরিবর্তন।
পেশী ও হাড় ক্ষয়
মহাকাশে মাধ্যাকর্ষণ প্রায় অনুপস্থিত থাকায় পৃথিবীতে পেশী ও হাড়ের উপর যে স্বাভাবিক চাপ থাকে, তা চলে যায়। ফলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ পেশী যেমন মেরুদণ্ড, ঘাড়, পা ও উরুর পেশী শিথিল হয়ে পড়ে। মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে পেশী শক্তি ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। ছয় মাসের মধ্যে এ হার ৩০ শতাংশে পৌঁছায়। একইভাবে, প্রতি মাসে ১ থেকে ২ শতাংশ হাড়ের ঘনত্ব কমে যায়। ফলে সহজেই হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয় এবং পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াটি কয়েক বছর পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে। এ কারণেই মহাকাশে নভোচারীদের প্রতিদিন প্রায় আড়াই ঘণ্টা নিয়মিত ব্যায়াম বাধ্যতামূলক। স্বাস্থ্য ধরে রাখতে তারা বিভিন্ন সাপ্লিমেন্টও সেবন করে।
উচ্চতা বৃদ্ধি
মহাকাশে থাকার সময় মেরুদণ্ড কিছুটা প্রসারিত হয়। ফলে নভোচারীদের উচ্চতা ২-৩ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে। এটি মেরুদণ্ডে ব্যথা সৃষ্টি করে। পাশাপাশি পৃথিবীতে ফিরে এলে ডিস্ক স্লিপের সমস্যার কারণ হতে পারে।
ওজন ও অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ায় পরিবর্তন
ওজনহীন অবস্থায় শারীরিক শক্তির চাহিদা কমে যায়। মহাকাশে খাদ্যাভ্যাসও অনেকটা নিয়ন্ত্রিত থাকে। এর ফলে ওজন কমে যায়। নাসার নভোচারী স্কট কেলি ৩৪০ দিনের মিশনে গিয়ে তার শরীরের ৭ শতাংশ ওজন হারিয়েছিলেন। একইসঙ্গে অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার সংমিশ্রণও বদলে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, মহাকাশযাত্রার পর অন্ত্রের এই পরিবর্তনগুলো দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও প্রভাব ফেলে।
দৃষ্টিশক্তির সমস্যা
পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ দেহের রক্তচলাচলকে নিয়ন্ত্রণ করে। মহাকাশে এই প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় এবং মাথার দিকে বেশি রক্ত জমা হয়। এর ফলে চোখের পেছনে ফ্লুইড জমে এবং দৃষ্টিশক্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অনেক নভোচারী ফিরে এসে দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হওয়া, চোখের গঠন পরিবর্তন এবং চোখের নার্ভের সমস্যার সম্মুখীন হন।
মস্তিষ্কের পরিবর্তন
মহাকাশে ওজনহীন অবস্থায় চলাফেরা করতে গিয়ে মস্তিষ্কের মোটর ফাংশন ও ব্যালেন্সের সঙ্গে সম্পর্কিত অংশগুলোতে পরিবর্তন ঘটে। রাশিয়ার এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৬৯ দিন মহাকাশে কাটানোর পর নভোচারীর মস্তিষ্কের নিউরাল সংযোগে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। এছাড়া মস্তিষ্কের তরল ধারণকারী অংশগুলোও প্রসারিত হয়, যা স্বাভাবিক হতে তিন বছর পর্যন্ত সময় লাগে।
ভবিষ্যতে মঙ্গল বা আরো দূরবর্তী গ্রহে মানুষের যাত্রা নিয়ে রয়েছে নানান জল্পনা-কল্পনা। মহাকাশে দীর্ঘ এ যাত্রার জন্য দেহকে মানিয়ে নিতে হলে এখনকার গবেষণা ও অভিজ্ঞতাই বিজ্ঞানীদের জন্য বড় সহায়ক হবে। মহাকাশে অবস্থান মানবদেহের ওপর যেমন বিপুল চাপ তৈরি করে, তেমনি আমাদের জানার সীমা আরো সম্প্রসারিত করে। এই জ্ঞানের ওপর ভর করেই আমরা হয়তো একদিন নিরাপদে মঙ্গল বা আরো দূর গ্রহে পা রাখতে পারবো।










