ড. ফিরদৌসী কাদরী বাংলাদেশের একজন প্রথিতযশা বিজ্ঞানী। তিনি শুধু একজন মানুষ নন, একটি প্রতিষ্ঠান। কেন একজন মানুষকে আমি প্রতিষ্ঠান বলছি। এর পেছনে ছোট একটা গল্প আছে। ড. ফিরদৌসী কাদরী এ দেশের বিজ্ঞান ও দেশের মানুষের কল্যাণে তার সুদীর্ঘ জীবন উৎসর্গ করেছেন। তিনি আইসিডিডিআর,বিতে কাজ করেছেন। এখনো করছেন। তার জীবনকে সেখানে নিবেদন করেছেন।
তার গল্পটা ওখানেই থেমে থাকেনি। আরেকটি প্রতিষ্ঠানের কথা না বললে ফিরদৌসী কাদরীকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা যাবে না। প্রতিষ্ঠানটির নাম আইদেশি। যার পূর্ণরূপ ‘ইনস্টিটিউট ফর ডেভেলপিং সায়েন্স অ্যান্ড হেলথ ইনিশিয়েটিভ’। সংক্ষেপে ‘আইদেশি’।
প্রতিষ্ঠানটির ধারণা তৈরি হয়েছিল ২০১২ সালে। তখন ড. ফিরদৌসী কাদরী, তার স্বামী ড. সৈয়দ সালেহীন কাদরী এবং দেশের কিছু প্রখ্যাত বিজ্ঞানী একত্রিত হয়ে বাংলাদেশে জুনিয়র ও তরুণ বিজ্ঞানীদের জন্য একটি প্লাটফর্ম তৈরি করার কথা চিন্তা করেন। সে ভাবনা পূর্ণরূপে বিকশিত হয় ২০১৪ সালে। ফিরদৌসী কাদরী ফ্রান্স থেকে একটি পুরস্কার পান। সে পুরস্কারের অর্থ বা প্রাইজ মানি দিয়ে তিনি ‘আইদেশি’র যাত্রা শুরু করেন। সেই থেকে আইদেশি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে।
আইদেশি একটি গবেষণাধর্মী ও অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের তরুণ বিজ্ঞানীদের জন্য একটি প্লাটফর্ম। এটি তাদের বুদ্ধি, মেধা ও বিজ্ঞানমনস্ক চেতনাকে প্রস্ফুটিত করার যুগোপযোগী প্রতিষ্ঠান। এ ধরনের একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি ও টিকিয়ে রাখায় যে ধরনের সহযোগিতা প্রয়োজন, তার সবই ফিরদৌসী কাদরীর পরিবার দিয়েছে। ওনার আশপাশে প্রখ্যাত বিজ্ঞানীরা সমর্থন ও সাহস জুগিয়েছেন। তাই অনেক প্রতিষ্ঠান হারিয়ে গেলেও আইদেশি কিন্তু হারিয়ে যায়নি।
প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪ সালে ১০ বছর পূর্ণ করেছে। আইদেশি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বড় বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করে তাদের আস্থা অর্জন করেছে। এর মধ্যে অন্যতম বিল গেটস ফাউন্ডেশন, যেটা আধুনিককালে গেটস ফাউন্ডেশন নামে পরিচিত, জনস হপকিনস, স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি, এনআইএইচ, ফ্রান্সের ফাউন্ডেশন মেরু অথবা থ্রাসার ফাউন্ডেশন। এ রকম বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আইদেশির মাধ্যমে বাংলাদেশে তাদের পরিচালিত গবেষণা সম্পন্ন করে যাচ্ছে।
আজকে আইদেশি চত্বরে একঝাঁক তরুণ ও তরুণী নিবিড়ভাবে বিজ্ঞান চর্চা করছেন। এখানে তাদের জন্য যে নিরাপত্তা ও আর্থিক নিরাপত্তা দরকার ড. ফিরদৌসী কাদরী আইদেশির মাধ্যমে সেটি তৈরি করেছেন। তরুণরা গবেষণা করছেন। এ গবেষণার মাধ্যমে তারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিয়েছেন। এ প্রতিষ্ঠানের তরুণ বিজ্ঞানীরা এখন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সুনামের সঙ্গে অধ্যয়ন ও চাকরি করছেন। এটা এক বিরাট অর্জন। দেশের জন্য গর্বের বিষয়। যারা বিদেশে গেছেন তাদের প্রত্যেককে ফিরদৌসী কাদরী উদারভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি রেকমেন্ডেশন লেটার দিয়েছেন। তিনি তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে বিদায় দিয়েছেন বুক ভেঙে, চোখের জলে। কিন্তু তিনি আশীর্বাদ করেছেন প্রাণভরে, যাতে তার হাত ধরে গড়া ছেলেমেয়েগুলো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে যেতে পারে এবং একইভাবে বিজ্ঞানের জন্য তাদের মেধা ও শ্রমকে কাজে লাগাতে পারে।
যার হাত ধরে বাংলাদেশের তরুণ বিজ্ঞানীরা পৃথিবীব্যাপী কাজ করছেন, তিনি সাধারণের মাঝে অসাধারণ মানুষ। তার কোনো অহংকার নেই। তিনি কাজ ও বিজ্ঞান পাগল মানুষ। তার একটি কথা আমি উল্লেখ করতে চাই। কোনো এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি কোনোদিন অবসর গ্রহণ করতে চাই না। আমি যেন কাজ করতে করতে দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করতে পারি।’ এমন কাজ পাগল মানসিকতার মানুষ সমাজে ক’জন আছে? ক’জন ফিরদৌসী কাদরী আমাদের সমাজে আজকে বর্তমান? এটি ভেবে দেখার বিষয়।
ড. ফিরদৌসী কাদেরীকে একজন ডাউন টু আর্থ বা মাটির মানুষ হিসেবে আমি উল্লেখ করেছিলাম। আরো বহু গুণ আছে তার। এই আইদেশিতে একশর বেশি ছেলেমেয়ে কাজ করছে। তাদের সবার কাছে তিনি আপা নামে পরিচিত। এখানে তিনি মাতৃস্নেহ ছড়িয়ে রেখেছেন। যার সুবিধা সবাই পাচ্ছেন।
আজকে আইদেশি এগিয়ে চলেছে। এটি বর্তমানে ১০৬ জনের পরিবার। বাংলাদেশে তিনটি জায়গায়—ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে প্রতিষ্ঠানটি বিস্তৃত হয়েছে। গবেষণার মাধ্যমে অর্ধেক বাংলাদেশজুড়ে আইদেশির তার কাজের ছাপ রেখেছে।
আরেকটি বিষয়, বিজ্ঞানীদের কিন্তু শুধু প্লাটফর্ম থাকলেই হয় না। বিজ্ঞানে মেধা থাকলেই হয় না। এ মেধাবী ছেলেমেয়েগুলোকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য যে অসম্ভব মেধাসম্পন্ন একটা গাইডেন্স বা উৎসাহের দরকার হয়। সে জায়গায় ডক্টর ফিরদৌসী কাদরী কিন্তু অনন্য।
তিনি কলম ধরে দেখিয়ে দেন কীভাবে গবেষণা করতে হয়। কীভাবে গবেষণা করলে একটি সার্থক গবেষণায় পরিণত হয়। এটা তিনি আমাদের শিখিয়েছেন ও শেখাচ্ছেন। আগামীর তরুণ প্রজন্ম যতদিন তার স্পর্শ পাবে, আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, তার হাত ধরে তারা আগামীর বিজ্ঞানীতে পরিণত হবে।
তিনি সবসময় যে একটি কথা জোর দিয়ে বলেন, ‘আমি কাজ করি বাংলাদেশের জন্য। আমি কাজ করি বিজ্ঞানের জন্য। আমি কাজ করি আগামী প্রজন্মের বিজ্ঞানীর জন্য। তাদের মাঝেই আমি বেঁচে থাকতে চাই।’
আইদেশির একজন সদস্য হিসেবে আমাদের আবেদন থাকবে। বাংলাদেশে যেন আরো ফিরদৌসী কাদরী গড়ে তোলা হয়। যারা বিজ্ঞানের পেছনে নিজের শ্রম দেন এবং বিজ্ঞানকে এ দেশের মানুষের জন্য কল্যাণকর একটি মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। সে প্রচেষ্টা যেন সবার মাঝে থাকে।
আমরা সরকারি নীতিনির্ধারকদের কাছে অনুরোধ করব, ফিরদৌসী কাদরী বা তার মতো প্রতিষ্ঠানের হাত ধরে যারা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন, তাদের যেন সরকারি সহযোগিতা করা হয়। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারের আরো অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজন আছে। এটি করা না হলে ভবিষ্যতে সমাজে ফিরদৌসী কাদরীর মতো মানুষ তৈরি হবে না।
ড. মোহাম্মদ রফিকুর রহমান: চিফ অপারেটিং অফিসার, ইনস্টিটিউট ফর ডেভেলপিং সায়েন্স অ্যান্ড হেলথ ইনিশিয়েটিভ (আইদেশি)










