এপেক্স ফুটওয়্যারে আমার কাজ শুরু ১৯৯৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর। এখানে যোগদানের পেছনে প্রধান কারণ ছিল সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী স্যারের সঙ্গে কাজ করা। চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি পড়াকালীনই আমি বিভিন্ন করপোরেট হাউজে অডিটের সুযোগ পাই। সেই সূত্রে অনেক বড় বড় করপোরেট ব্যক্তিত্বের বক্তব্য শোনা, তাদের চিন্তাধারা বোঝার চেষ্টা করা এবং তাদের দেয়া বার্তাগুলো গভীরভাবে উপলব্ধি করার অভিজ্ঞতা আমার হয়েছিল। সেই সময় থেকেই আমার মনে একটি সুস্পষ্ট লক্ষ্য তৈরি হয়, যদি কোনোভাবে সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী স্যারের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাওয়া যায়, তবে সেটিই হবে আমার কর্মজীবনের সেরা প্রাপ্তি। আমার বিশ্বাস ছিল, এমন একজন মানুষের সঙ্গে কাজ করতে পারলে কর্মক্ষেত্রে আমি একটি আদর্শ জায়গা খুঁজে পাব। সে লক্ষ্যকে সামনে রেখেই ১৯৯৬ সালে আমি এপেক্স গ্রুপে যোগ দিই।
মঞ্জুর এলাহী স্যার আজ আর আমাদের মাঝে নেই। তবে এ দীর্ঘ সময়ে তার কাছ থেকে আমি যে শিক্ষা, মূল্যবোধ ও মানবিকতা পেয়েছি, তা খুব অল্প মানুষের মধ্যেই দেখা যায়।
মানুষকে সম্মান করার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অসাধারণ। মানুষকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখতেন। একজন পিওন, ড্রাইভার, সাধারণ কর্মী কিংবা একজন ম্যানেজিং ডিরেক্টর সবার সঙ্গে একই আচরণ করতেন। এ নিয়ে তার মধ্যে আমি কখনো কোনো পার্থক্য দেখিনি। তিনি সবার সঙ্গে অত্যন্ত নরমভাবে কথা বলতেন, ব্যক্তিগত খোঁজখবর নিতেন, এমনকি তাদের পরিবারের খবরও জানতে চাইতেন। বিষয়টি আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করত। কারণ তিনি শুধু আমাদের কর্মজীবন নিয়েই ভাবতেন না, আমাদের পরিবারকেও নিজের দায়িত্বের অংশ হিসেবে দেখতেন।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আমি কখনো তাকে রাগান্বিত অবস্থায় দেখেছি বলে মনে পড়ে না।
তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ ছিল, মানুষের কথা শোনার অসাধারণ ক্ষমতা। অভিজ্ঞতাটি আমার ক্ষেত্রেই বেশি হতো। কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুরো গ্রুপের ফাইন্যান্স সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব আমার ওপর এসে পড়ে। শুধু এপেক্স ফুটওয়্যার নয়, গ্রুপের সামগ্রিক আর্থিক বিষয় নিয়েই নিয়মিত তার সঙ্গে আলোচনা হতো। এ আলোচনাগুলোয় তিনি ছিলেন অসাধারণ মনোযোগী শ্রোতা। অনেক সময় প্রয়োজনের তুলনায় হয়তো আমি বেশি কথাই বলতাম, কিন্তু কখনই তিনি আমাকে থামিয়ে দিতেন না। ধৈর্যের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তিনি সব কথা শুনতেন। এরপর আমার বলা কথাগুলোর মধ্য থেকেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক তিনি বেছে নিতেন এবং আলোচনা করতে করতে এমনভাবে প্রশ্ন করতেন ‘এটা করলে কেমন হয়?’ বা ‘এই ব্যাপারে তোমার কী মনে হয়?’, যাতে শেষ পর্যন্ত আমরা একসঙ্গে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারতাম। সিদ্ধান্ত তিনি চাপিয়ে দিতেন না; বরং আলোচনার মধ্য দিয়েই একটি স্বাভাবিক উপসংহারে পৌঁছে দিতেন।
সেই সময়ের মধ্যে অনেক ফোনকল এলেও তিনি সেগুলো রিসিভ করেননি। আমার কাছে এটি ছিল একজন মানুষের পক্ষ থেকে আরেকজন মানুষের প্রতি অসাধারণ সম্মানের প্রকাশের বিষয়। এটা শুধু অফিসেই নয়, অনেক পরিবারেও বিরল, যেখানে সন্তানরা বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলার সময় এমন পূর্ণ মনোযোগ ও সুযোগ পায় না। সে জায়গা থেকে বললে, অভিজ্ঞতাটি আমি ব্যতিক্রমভাবে উপভোগ করেছি।
এপেক্স ফুটওয়্যার একসময় রফতানিমুখী ব্যবসার ওপরে শতভাগ নির্ভরশীল ছিল। তখন খুচরা ব্যবসা বা সারা দেশে যে আউটলেট, তা ছিল না। ২০১৪ সালে আমাদের ব্যবসা ছিল ইউরোপের সঙ্গে। জাপানে সামান্য কিছু বিজনেস ছিল। তখন হঠাৎ করে ইউরোর বিপরীতে আমাদের লোকাল কারেন্সি অনেকটাই কমে যায়। যেমন এক ইউরোর বিনিময়ে যেখানে আমরা ২০১৩ সালে পেতাম ১১৩-১১৪ টাকা। যেটা ২০১৪ সালে এমনও হয়েছে যে ৮১ টাকা রিসিভ করেছি। তখন বাধ্য হয়ে ইউরোপিয়ান কাস্টমারদের ইউএস ডলারে ইনভয়েস করার জন্য বারবার করে অনুরোধ করা হয়েছে। কিন্তু তখন এর সমাধান করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। ওখানে আমরা লোকসানে পড়ে যাই। তখন মঞ্জুর এলাহী স্যার পরামর্শ দিলেন, ‘তোমাদের এখন লোকাল মার্কেটের কথা ভাবা উচিত। লোকাল মার্কেটই হতে পারে তোমাদের যে সাস্টেইন করা এবং বেটার ফিউচার। লোকাল মার্কেটই তোমাদের পথ দেখাতে পারে। এক্সপোর্ট কখন ঠিক হবে, এটা অনেক অনিশ্চিত।
উনি সবসময় বলতেন, যে মানুষদের নিয়ে চলবে তাদের জন্য তৈরি যে কোনো পণ্যের স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেইন করো, প্রডাক্টের কোয়ালিটি ধরে রাখো, তাহলে লোকাল মার্কেটে ভালো করবেই। তার পরই আমরা সারা দেশব্যাপী খুচরা ব্যবসা শুরু করি। অল্পসময়ের মধ্যেই দেশে নাম্বার ওয়ান ব্র্যান্ড হিসেবে এপেক্স চলে আসে। আমার মনে হয় পাঁচ-ছয় বছর ধরে এপেক্স দেশের নাম্বার ওয়ান ব্র্যান্ড। ওনার পরামর্শে এটা সম্ভব হয়েছে। রফতানি ক্ষেত্রে যে উত্থান-পতন, সেখানে লোকাল বিজনেস বড় সাপোর্ট দিচ্ছে। তা না হলে আমরা যারা এপেক্সে কাজ করি তাদের চাকরিটা কন্টিনিউ করাটা সম্ভব হতো না। অনেককেই প্রতিষ্ঠানে ধরে রাখা যেত না।
২০১৪ সালে খারাপ সময় গেল, তাকে কখনো দুশ্চিন্তাগ্রস্ত দেখা যায়নি। তিনি সবসময় সাহস দিতেন। কভিডের সময় খুবই বাজে অবস্থা ছিল। দোকান বন্ধ, ফ্যাক্টরি বন্ধ, চলাফেরা বন্ধ। তিনি বললেন, এ রকম অভিজ্ঞতা তোমাদের লাইফে নেই, আমার লাইফেও নেই। কিন্তু ফেস করতে হবে। ফেস করার মতো সাহসটা রাখতে হবে। সৎভাবে চেষ্টা করো। এ সংকট থেকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে পারবে।
এখানে একটা মানবিক উদ্যোগের কথা বলি। একদিন মঞ্জুর এলাহী স্যার তার ব্যক্তিগত পারিবারিক খরচের জন্য সংরক্ষিত কিছু অর্থ আমার হাতে তুলে দেন। কোম্পানিরও একটা সহযোগিতা ফান্ড ছিল। তিনি বলেন, ‘মানুষের জীবনে কখন কে কোন অবস্থায় পড়বে তা কেউ জানে না, আমরা সহকর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। সে বিশ্বাস থেকেই তিনি আমাকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে অর্থটি দেন, যাতে কোনো সহকর্মীর পরিবার বিপদে পড়লে, অসুস্থতা বা সংকটে আক্রান্ত হলে, সে অর্থ ব্যবহার করা যায়। এ মানবিক সিদ্ধান্তটি আমার কাছে এতটাই গভীর ও অনন্য যে এটি আমার জীবনের এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে আছে।
দিলীপ কাজুড়ী: অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেড










