সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীকে সবদিক দিয়ে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। তার নানা গুণের কারণে মানুষ তাকে গভীর শ্রদ্ধা করত। তার ছিল অমায়িক ব্যবহার, তীব্র পেশাদারত্ব। দক্ষতা ও নিয়মানুবর্তিতায় তিনি একজন অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব।
ব্যবসায়িক অঙ্গনে সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী বাংলাদেশের জন্য একটি রোল মডেল বা উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছেন। তার নেতৃত্বেই বিশাল সংগঠনের প্রসার ঘটেছিল। শতভাগ সততা বজায় রেখে, প্রতিটি নিয়ম মেনে এবং যথাযথভাবে কর পরিশোধ করে তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। এ কারণেই তিনি সবার কাছে এতটা শ্রদ্ধেয় ছিলেন। শুধু ব্যক্তিগত পরিচিতজন নয়, যারা তার সংস্পর্শে এসেছেন, প্রত্যেকেই তাকে শ্রদ্ধা করতেন।
ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর যে গুণটি তাকে বিশেষভাবে পরিচিত করেছে, তা হলো তার গভীর দেশপ্রেম ও দেশের মানুষের প্রতি সহানুভূতি। তিনি বিশাল ব্যবসায়ী হওয়া সত্ত্বেও মানুষ হিসেবে সবাইকে সমান সম্মান করতেন। কাউকে কখনো ছোট করে দেখতেন না।
তার এ মানবিক দিকটির প্রতিফলন দেখা যায় মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন নামের সামাজিক সংগঠনে তার ভূমিকার মাধ্যমে। ২০০২ সাল থেকে তিনি সংগঠনটির শুরু থেকেই সভাপতি হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
ব্যক্তিগতভাবে দীর্ঘদিনের পরিচয় থাকলেও কাজের ক্ষেত্রে তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক শুরু হয় ২০০২ সালে। কাজের প্রতি তার নিষ্ঠা ছিল অবাক করার মতো। তিনি এ সংগঠনের চেয়ার ছিলেন, কিন্তু একটিও মিটিং মিস করেননি। সময় নিয়ে মিটিং নির্ধারণ করা হলে তিনি নিশ্চিত করে বলতেন, ‘যখন তোমাকে কথা দিয়েছি, অবশ্যই আমি মিটিংয়ে থাকব।’ জীবনের শেষ দুই-তিন বছর অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি সিঙ্গাপুর থেকে জুমের মাধ্যমে মিটিংয়ে নিয়মিত অংশ নিতেন। তিনি বাজেট পর্যালোচনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রতি অত্যন্ত সজাগ দৃষ্টি রাখতেন। তার দেয়া উপদেশ ছিল—‘গোঁজামিল দিয়ে কখনো কাজ করবে না। সবকিছু স্বচ্ছ রাখবে।’ তিনি আমাকে সম্মান করতেন এবং আমিও তাকে সম্মান করতাম।
তার প্রতি শ্রদ্ধাবোধে এখনো আবেগাপ্লুত হতে হয়। তিনি আমাকে স্নেহ করতেন এবং ডোনারদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার সময় গর্ব করে বলতেন, ‘শাহীন ইনকরাপ্টেবল। তোমরা শাহীনকে এবং এ সংগঠনকে টাকা দাও। কারণ এটার নির্বাহী পরিচালক একজন ইনকরাপ্টেবল।’
এ কথাগুলো আমার মনে সর্বদা জাগরূক থাকত এবং সংগঠনের চেয়ার হিসেবে তার নির্ধারিত মানদণ্ড বজায় রাখার অনুপ্রেরণা জোগাত।
রাজনীতির ক্ষমতা নিয়ে তার কোনো লোভ ছিল না। কিন্তু তিনি যখন দায়িত্ব পেলেন নিষ্ঠার সঙ্গে সেটা পালন করেছিলেন। নীতি, সততা নিয়ে তিনি তার দায়িত্ব সফলতার সঙ্গে পালন করেছেন। এখনো অনেকেই বলে যে তিনি আমাদের একজন সফল উপদেষ্টা ছিলেন। আসলে মানুষ তো টাকা-পয়সা দিয়ে কিছুটা সম্মান পায়, কিন্তু আসল সম্মান তিনি অনেক মানুষের মনের মধ্যে একটা জায়গা করে নিতে পেরেছিলেন। তাকে যারা চেনেন-জানেন ওনাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী ছিলেন একজন পারিবারিক মানুষ। তার স্ত্রী নিলুফার আপা, এক ছেলে (নাসিম), এক মেয়ে (মুনা) এবং নাতি-নাতনিদের নিয়ে তার জীবন ছিল পরিপূর্ণ। তার সুযোগ্য সন্তান নাসিম ও মুনা তার রেখে যাওয়া আদর্শ ও উত্তরাধিকারকে আরো বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যাবেন বলে বিশ্বাস করি। সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর স্মৃতিকে আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি এবং প্রতিনিয়ত তাকে মিস করি।
শাহীন আনাম: মানবাধিকার কর্মী; নির্বাহী পরিচালক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন










