ড. ফিরদৌসী কাদরীকে আমরা ব্যক্তিগতভাবে শায়লা নামেই ডাকি। তার স্বামী সালেহীন কাদরী ছিলেন আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও ব্যাচমেট। সালেহীন পড়তেন বায়ো-কেমিস্ট্রিতে আর আমি অর্থনীতিতে। এই সূত্রেই আমাদের বন্ধুত্ব। আর সেই সুবাদে শায়লার সঙ্গে আমাদের পরিচয় এবং পরবর্তী সময়ে তা এক গভীর পারিবারিক বন্ধুত্বে রূপ নেয়। আজ শায়লার এ বিশাল সাফল্যের দিনে বন্ধু সালেহীনকে খুব মনে পড়ছে। কভিডের সময়ে তার চলে যাওয়াটা ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। অথচ আজকের এ অর্জনের পেছনে সালেহীনের অবদান ছিল অনস্বীকার্য।
একজন নিবেদিতপ্রাণ বিজ্ঞানী হিসেবে শায়লা যতটা কঠোর পরিশ্রমী, মানুষ হিসেবে ততটাই অমায়িক। গবেষণার প্রয়োজনে তাকে দিনের পর দিন ল্যাবে থাকতে হয়েছে, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়েছে। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় তিনি গবেষণার পাশাপাশি সন্তানদের প্রতি কখনো উদাসীন ছিলেন না। তার প্রথম পছন্দ ছিল গবেষণা, তার পরই ছিল সন্তানরা। আজ তার তিন সন্তানই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।
শায়লার অনাড়ম্বর জীবনযাপন আমাদের মুগ্ধ করে। এত বড় মাপের একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানী হয়েও তার মধ্যে কখনো ‘হামবড়া’ ভাব ছিল না। দাওয়াত দিয়ে যত্ন করে খাওয়াতেন। তার হাতের বিশেষ রান্না আর খাবারের পর আমার পান খাওয়ার সেই স্মৃতিগুলো আজও অমলিন।
মাইক্রোবায়োলজি ও সংক্রামক ব্যাধি, বিশেষ করে কলেরাসহ ছোঁয়াচে রোগ নিয়ে তার গবেষণা বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। তিনি চাইলেই যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের যেকোনো উন্নত দেশে স্থায়ী হতে পারতেন। কিন্তু মাটির টানে তিনি দেশেই থেকে গেছেন। এমনকি বিভিন্ন পুরস্কার থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে এ দম্পতি ব্যক্তিগত ল্যাব তৈরি করেছেন—নিজেদের পার্থিব সুখের কথা তারা ভাবেননি।
সালেহীনের মৃত্যুর পর তিনি কিছুটা একা হয়ে পড়লেও মানসিকভাবে দমে যাননি। সন্তানরা বিদেশ থাকায় তিনি কিছুটা একাকী হয়ে পড়েন। মাঝেমধ্যে তাদের কাছে বেড়াতে যান। গবেষণার মাঝেই তিনি নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন। আনুষ্ঠানিকভাবে আইসিডিডিআর,বি থেকে অবসর নিলেও তার কাজ থেমে নেই। তিনি এখনো গবেষণার মাধ্যমে মানবসেবা করে যাচ্ছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তার অবদান অনবদ্য। তার অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী আজ বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠিত, এমনকি আমার নিজের দুজন ভাগনেও তার সরাসরি ছাত্র। তার এ সম্মাননা কেবল তাকে নয়, বরং তার অগণিত ছাত্র-ছাত্রী এবং দেশের বিজ্ঞান সমাজকেও অনুপ্রাণিত করবে।
একজন শিক্ষক, একজন বিজ্ঞানী এবং সর্বোপরি একজন অসাধারণ মানুষ হিসেবে ড. ফিরদৌসী কাদরী আমাদের গর্ব। তিনি থেমে নেই, এগিয়ে যাচ্ছেন।
২.
অধ্যাপক আমিরুল ইসলাম চৌধুরীকে আমরা ‘ময়না ভাই’ বলে ডাকি। খাঁটি দেশপ্রেমিক ও পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব। তিনি ব্যক্তিগতভাবে নিভৃতচারী হলেও দেশের অর্থনীতির তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক উভয় ক্ষেত্রেই তার অবদান অবিস্মরণীয়।
ময়না ভাই আমার বেশ কয়েক বছরের সিনিয়র ছিলেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার পর তাকে নিবিড়ভাবে চেনার সুযোগ হয়। অর্থনীতির তুখোড় ছাত্র হিসেবে তিনি যেমন খ্যাতিমান ছিলেন, শিক্ষক হিসেবেও ছিলেন সমান সফল। তার কথা বলার ধরন ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট ও প্রাঞ্জল।
পরবর্তী সময়ে আমি যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলাম, তখন তাকে উপাচার্য হিসেবে কাজ করতে দেখেছি। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত সহজ ও বন্ধুত্বপূর্ণ। কোনো কৃত্রিম দূরত্ব তিনি রাখতেন না। তার সময়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্কের শিকার হয়নি। পরবর্তী সময়ে গণবিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি এবং ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হিসেবেও তিনি নিজ যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন। আজও বার্ধক্যজনিত কারণে লাঠিতে ভর দিয়ে হলেও তিনি মিটিংগুলোয় নিয়মিত উপস্থিত থাকেন। কাজের প্রতি তার এ নিষ্ঠা সত্যিই অনুকরণীয়।
ময়না ভাই কখনো সভা-সেমিনারে নিজেকে জাহির করতেন না। তার গবেষণার বিশেষ জায়গা ছিল আরবান ইকোনমি ও রিজিওনাল ইকোনমি। এ বিষয়ে বাংলাদেশে খুব বেশি মানুষ চর্চা করেননি। মাইগ্রেশন ও নগরায়ণসংক্রান্ত তাত্ত্বিক বিষয়ে তার অবদান আছে। আমিও ব্যক্তিগতভাবে তার অনেক কাজের রেফারেন্স ব্যবহার করেছি।
শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি নিয়ে তিনি শক্তিশালী প্রতিবেদন দিয়েছিলেন, তা আজও স্মরণীয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সে সময় প্রবল রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে সুপারিশগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। বাস্তবায়নের দায়িত্ব তার হাতে না থাকলেও আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে তার অবদান ছিল।
ব্যক্তিজীবনে ময়না ভাই একজন অসাধারণ সজ্জন ও সোনার মানুষ। তার সন্তানও একজন স্বনামধন্য শিক্ষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, যা একটি আদর্শ পরিবারের প্রতিফলন। তার অগণিত ছাত্রছাত্রী আজ দেশ-বিদেশে সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন। তাকে সম্মানিত করার খবর শুনে তার ছাত্র ও শুভানুধ্যায়ীরা অবশ্যই অত্যন্ত আনন্দিত হবেন।
শিক্ষক হিসেবে তিনি সফল, অর্থনীতিবিদ হিসেবে তিনি ব্রিলিয়ান্ট এবং মানুষ হিসেবে তিনি এক অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। অধ্যাপক আমিরুল ইসলাম চৌধুরীর মতো একজন নিভৃতচারী গুণীকে সম্মাননা জানানোর জন্য আমি বণিক বার্তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।
বণিক বার্তা এই যে শায়লা আর ময়না ভাইকে সম্মাননা দিচ্ছে, এর বহুমাত্রিক প্রভাব রয়েছে। এ দুজন মানুষ তাদের দীর্ঘ কর্মজীবনে যে ত্যাগ, নিষ্ঠা ও নৈতিকতা দেখিয়েছেন, তা অনন্য। তারা কখনো প্রচারের আলোয় আসার জন্য উদগ্রীব ছিলেন না; বরং নিভৃতে নিজেদের কাজ ও গবেষণার মাধ্যমে দেশের সেবা করে গেছেন। বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজে যে গুণের আকাল সবচেয়ে বেশি, তা হলো সততা। বাংলাদেশে সততা খুবই বিরল জিনিস। আমি আশা করি ওনারাও নিশ্চয় খুশি হবেন। আমি বলব যথোপযুক্ত মানুষকে সম্মানিত করেছেন।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ: উপদেষ্টা, অর্থ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়










