ড. ফিরদৌসী কাদরীকে প্রায় তিন দশক ধরে চিনি। তার সম্পর্কে কথা বলতে গেলে সময় নিয়েও শেষ করা যায় না। আইসিডিডিআর,বিতে আমার কর্মজীবনের শুরুর দিকেই তার সঙ্গে আমার পরিচয়। সে সময় তিনি এ প্রতিষ্ঠানে একজন বিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করতেন। আর আমি জুনিয়র স্টাফ হিসেবে সেখানে যোগ দিয়েছিলাম। এ দীর্ঘ পথচলায় আমার পেশাগত উন্নয়নে তার অবদান অনস্বীকার্য।
আমাদের সম্পর্ক কেবল পেশাগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা পারিবারিক সম্পর্কের মতো হয়ে যায়। আমার বড় বোন নেই। এ শূন্যতা অনেকটা তিনি পূরণ করেছেন। তিনি দেশে থাকলে প্রতিদিন অন্তত একবার হলেও আমার সঙ্গে কথা হয়। অফিসে নিয়মিতই দেখা হয়। যদিও তিনি আমার সিনিয়র, তবুও সম্পর্কটা ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ, আন্তরিক ও নির্ভরতার।
কর্মক্ষেত্রে তিনি ছিলেন আমার অনুপ্রেরণার বড় উৎস। পড়াশোনা শেষে ইন্টার্ন হিসেবে আইসিডিডিআর,বিতে যোগ দিই এবং পরে রিসার্চ ফেলো হিসেবে কাজ শুরু করি। তার সঙ্গে পরিচয়ের পর আমার গবেষণা জীবনের দিকনির্দেশনা আরো স্পষ্ট হয়।
আমি যখন পিএইচডি করতে দেশের বাইরে যাই, তখন ফিরদৌসী আপার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার অবদান আমি কোনো দিন ভুলতে পারব না। দেশে ফিরে এসে যক্ষ্মা নিয়ে কাজ শুরু করার ক্ষেত্রেও তার অবদান ছিল। প্রায় ৩০ বছর আমি যক্ষ্মা নিয়ে কাজ করেছি। তিনি আমার সুপারভাইজার ছিলেন, তবে কেবল সুপারভাইজার নন—তিনি ছিলেন বড় বোন ও বন্ধুর মতো।
গবেষণার ক্ষেত্রে ড. ফিরদৌসী কাদরী বাংলাদেশ ও বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত একজন বিজ্ঞানী। ভ্যাকসিন গবেষণায় অবদানের কথা বলতে গেলে অগ্রগণ্য নামগুলোর মধ্যে তার নামই আগে আসে। বিশেষ করে কলেরা ভ্যাকসিন নিয়ে ফিরদৌসী আপার কাজ শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রশংসিত ও স্বীকৃত।
আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘আইদেশি’। নিজের অর্জিত পুরস্কারের অর্থ দিয়ে তিনি এ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। দেশের গবেষণা ক্ষেত্রে সংকট উপলব্ধি করে ব্যক্তিগত পুরস্কারের অর্থ গবেষণায় বিনিয়োগ করা—এটি ড. ফিরদৌসী কাদরীর দায়বদ্ধতা ও দূরদর্শিতার অনন্য উদাহরণ।
মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মিশুক ও অমায়িক। ছোট-বড় সবাই সহজেই তার কাছে যেতে পারত। একজন বড় মাপের বিজ্ঞানী হয়েও ফিরদৌসী আপার মধ্যে ছিল অসাধারণ সরলতা। আমি কখনো তার কাছ থেকে নেতিবাচক কথা শুনিনি। কোনো সমস্যায় পড়লে তিনি বলতেন, ‘এটা নিয়ে বেশি চিন্তা করো না, ঠিক হয়ে যাবে।’
আমাদের মধ্যে আরেকটি মিল ছিল—গাছের প্রতি ভালোবাসা। বাগান করা আপার বড় শখ। ঢাকার বাইরে তার একটি সুন্দর জায়গা রয়েছে, যেখানে তিনি গাছ লাগান।
সহকর্মীদের সঙ্গে আপার আচরণ ছিল অত্যন্ত মানবিক। তাকে খুব কমই রাগ করতে দেখেছি। তিনি সবাইকে সম্মান দিতেন, সবার সঙ্গে কথা বলতেন। পাশাপাশি তিনি নীরবে অনেক মানুষকে সহায়তা করেছেন—পড়াশোনা, চিকিৎসা ও নানা মানবিক প্রয়োজনে। কোনো প্রচার ছাড়াই এ কাজগুলো করতেন, যা তার চরিত্রের বড় গুণ।
আইসিডিডিআর,বিতে ড. ফিরদৌসী কাদরী ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছেন। যে কাউকে জিজ্ঞাসা করলে বলবে—তিনি একজন ভদ্র, অমায়িক ও দায়িত্বশীল মানুষ। তরুণ গবেষকদের গড়ে তোলাও ছিল তার অন্যতম বড় শক্তি। তার তত্ত্বাবধানে থেকে বহু জুনিয়র বিজ্ঞানী আজ সিনিয়র পর্যায়ে পৌঁছেছেন। তরুণদের সবসময়ই অনুপ্রেরণা দিয়েছেন তিনি। নতুনদের সক্ষমতা উন্নয়ন, ক্যারিয়ার গঠন ও নেতৃত্বে পৌঁছার পথে তিনি অত্যন্ত আন্তরিকভাবে কাজ করেছেন।
একটি স্মৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৯৮ সালে যখন আমরা যক্ষ্মা নিয়ে কাজ শুরু করি, তখন প্রতিষ্ঠানের ভেতরে নানা প্রশ্ন ও সংশয় ছিল—যক্ষ্মা নিয়ে কেন কাজ করা হবে। সে সময় ফিরদৌসী আপা আমাকে পুরোপুরি সমর্থন দেন। তিনি ঊর্ধ্বতনদের এ কাজের গুরুত্ব বোঝান। এরপর দীর্ঘ প্রায় ২৫ বছর আমরা যক্ষ্মা নিয়ে কাজ করি। ফলে দেশে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আসে, সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে বহু গবেষণা সম্পন্ন হয়। এসবের পেছনে তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে ফিরদৌসী কাদরী আপা একদিকে একজন খ্যাতিমান বিজ্ঞানী, দক্ষ সুপারভাইজার ও সহকর্মীদের প্রিয় মানুষ; অন্যদিকে একজন মানবিক, দয়ালু সামাজিক মানুষ। একই সঙ্গে তিনি একজন আদর্শ স্ত্রী ও মা। তার তিন সন্তান আজ সফল—এ সাফল্যের পেছনে তার অবদান অপরিসীম।
ড. সায়েরা বানু: সিনিয়র সায়েন্টিস্ট, আইসিডিডিআর,বি










