ফিরদৌসী কাদরী আপার নাম প্রথম যখন শুনি, তখন আমি প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগে তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। তখন জানতাম, যাকে আমরা কাদরী আপা বলে ডাকি—তিনি আইসিডিডিআর,বির (কলেরা হাসপাতাল) একজন শীর্ষ গবেষক। তিনি একসময় আমাদের বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন। দুর্ভাগ্যবশত, তার ক্লাস সরাসরি করার সুযোগ আমার হয়নি।

মাস্টার্সে পড়ার সময় গবেষণার কাজে আমাদের রিসোর্সের ঘাটতি ছিল, এটা সবারই জানা। কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে আমার সুপারভাইজার আমাকে কাদরী আপার কাছে পাঠাতেন। তখনই প্রথম সরাসরি তার সঙ্গে দেখা। ইমিউন সিস্টেমের মতো জটিল বিষয়ে গবেষণা করেন। তাই আমার ধারণা ছিল, তিনি হয়তো খুবই গম্ভীর ও দূরত্ব বজায় রাখা মানুষ হবেন। কিন্তু প্রথম সাক্ষাতেই সে ধারণা পাল্টে যায়। তিনি অত্যন্ত হাস্যোজ্জ্বল, সহজ ও অন্যকে আপন করে নেয়া মানুষ। সেই দিনই আমার সব দ্বিধা ও ভয় কেটে যায়।

পরবর্তীকালে এমফিল করার সময় আমার থিসিসের এক্সটার্নাল এক্সপার্ট ছিলেন কাদরী আপা। থিসিস পর্যালোচনা করে তিনি আমার কাজের অনেক প্রশংসা করেন। এটা আমার জন্য বড় প্রেরণা ছিল। এরপর বিভাগে যোগ দেয়ার পর বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও কনফারেন্সে তার সঙ্গে দেখা হতো। প্রতিবারই তিনি জানতে চাইতেন এখন কী কাজ করছি। কাজ কেমন চলছে? বলতেন, ‘কাজ করতে থাকো।’ অর্থাৎ, লেগে থাকতে উৎসাহ দিতেন। এ উৎসাহ সবসময় আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে।

কাদরী আপা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বহু পুরস্কারে ভূষিত হলেও কখনই খ্যাতির পেছনে ছুটতে দেখিনি। তিনি একনিষ্ঠ, গবেষণানিবেদিত একজন মানুষ। বাংলাদেশের লাইফ সায়েন্স গবেষণাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যারা পরিচিত করেছেন, তাদের মধ্যে তিনি নিঃসন্দেহে অন্যতম। গবেষক হিসেবে তার মূল্যায়ন আমার পক্ষে সম্ভব নয়—তার সাইটেশন, প্রকল্প ও আন্তর্জাতিক পরিচিতিই সে কথা বলে।

মানুষ হিসেবে কাদরী আপা অত্যন্ত সহজ ও আন্তরিক। তার সঙ্গে কথা বললে কখনই মনে হয় না যে তিনি বিশ্বখ্যাত একজন গবেষক, যাকে বিভিন্ন দেশের শীর্ষ বিজ্ঞানীরা এক নামে চেনেন। তিনি সবাইকে আপন করে নিতে ভালোবাসেন।

VinFuture-Photo---Dr-FQ-Apa

ভিনফিউচার ২০২৪ পুরস্কার হাতে ড. ফিরদৌসী কাদরী

এক পর্যায়ে কাদরী আপা নিজেই প্রস্তাব দেন, আমরা যেন একসঙ্গে পিএইচডি শিক্ষার্থীদের সুপারভিশন করি। এতে তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ পাই এবং অনেক কিছু শেখার সুযোগ তৈরি হয়। তিনি আমাকে স্বাধীনভাবে শিক্ষার্থীদের গাইড করার সুযোগ দিয়েছেন। সবসময় বলেন, ‘তুমি কাজ করো, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখো, কোনো সমস্যা হলে আমাকে জানিও।’ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তরুণ শিক্ষকদের জন্য এ আস্থা ও সাহস জোগানো সত্যিই বিরল এবং অত্যন্ত মূল্যবান।

আমাদের বিভাগের একটি কমন ল্যাবরেটরি আছে। কিন্তু ছয়-সাত বছর আগেও এ ল্যাব ছিল না। তখন আমাদের বিভাগের শিক্ষার্থীরা মাস্টার্স থিসিসের জন্য আইসিডিডিআর,বিতে যেত। কাদরী আপার ল্যাব ছিল তাদের প্রথম পছন্দ। সেখান থেকে কাজ করে আজ যারা আমাদের বিভাগের শিক্ষক হয়েছেন, তাদের সঙ্গেও কাদরী আপার আচরণ ঠিক তেমনই আন্তরিক ও সহায়ক—যেমনটা আমাদের সবার সঙ্গে।

গবেষণার বাইরে ব্যক্তিজীবনেও কাদরী আপাকে আমি সফল মানুষ হিসেবেই দেখেছি। তার স্বামী প্রয়াত অধ্যাপক ড. সালেহীন কাদরী আমাদের বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। ড. ফিরদৌসী কাদরী তিন সন্তানের জননী এবং সন্তানদের সফলভাবে গড়ে তুলেছেন। তার বন্ধুবৎসলতা ও মানবিক সম্পর্ক থেকেও আমাদের শেখার অনেক কিছু আছে।

আমার মনে হয়, গবেষণাই কাদরী আপার প্রধান শখ। গবেষণার মধ্যেই তিনি সবচেয়ে স্বচ্ছন্দ, সুস্থ ও আনন্দিত থাকেন।

বিশেষ স্মৃতির কথা বলতে গেলে থ্যালাসেমিয়া প্রকল্পের কথা বলতে হয়। ‘২০২৮ সালের মধ্যে থ্যালাসেমিয়ামুক্ত বাংলাদেশ’—এ লক্ষ্য নিয়ে কাদরী আপা ও তার সহকর্মীরা একটি কর্মসূচি শুরু করেছিলেন। সে প্রকল্পে স্যাম্পল সংগ্রহের কাজে তার সঙ্গে যাওয়ার সুযোগ আমার হয়েছিল। সেখানে দেখেছি যে তরুণ গবেষকদের চেয়েও তার কর্মস্পৃহা ও উদ্দীপনা কতটা বেশি। কীভাবে কাজ হবে, কে কী করবে—সবকিছুতেই তার সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। আমার বিশ্বাস, এ অদম্য কর্মস্পৃহাই তাকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে।

কাদরী আপা সবসময় বলেন, যতদিন শক্তি আছে, তিনি গবেষণার সঙ্গেই থাকতে চান। তিনি ‘আইদেশি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। সেখানে লাইফ সায়েন্স–সম্পর্কিত গবেষণা—বিশেষ করে বায়োকেমিস্ট্রি, মলিকিউলার বায়োলজি, বায়োটেকনোলজি, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও মাইক্রোবায়োলজির শিক্ষার্থীরা গবেষণার সুযোগ পায় এবং পরে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও সহায়তা পায়। এক্ষেত্রে তার উদারতা ও দায়বদ্ধতা সত্যিই অনন্য।

সব মিলিয়ে কাদরী আপা একজন সফল শিক্ষক, একজন আন্তর্জাতিক গবেষক, একজন সফল মা ও একজন সফল স্ত্রী। তার জীবন ও কর্ম আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস।

এএইচএম নুরুন্নবী: অধ্যাপক, প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়