২০০১ সালে আমি আইসিডিডিআর,বিতে যোগ দিই। ড. ফিরদৌসী কাদরীর সঙ্গে আমার কাজের যাত্রা ২০০৩ সালে। সহকর্মী হিসেবে আমি দেখেছি তিনি অসম্ভব কর্মঠ, সময়নিষ্ঠ এবং কাজের ব্যাপারে সবাইকে ভীষণভাবে উৎসাহিত করেন। তিনি কাজ করতে প্রচণ্ড ভালোবাসেন। বিজ্ঞান নিয়ে তার অসংখ্য গবেষণা রয়েছে। সেই একই উৎসাহ তিনি সহকর্মীদের মধ্যেও ছড়িয়ে দেন।
আইসিডিডিআর,বিতে সবাই তাকে ‘আপা’ বলেই ডাকে। সেন্টারে ‘আপা’ বলতে আসলে একজনই—ডক্টর কাদরী। সায়েন্টিফিক বা পার্সোনাল, যেকোনো সাহায্যের জন্য তিনি সবার ভরসার জায়গা।
কলেরা, ই.টেক, সালমোনেলা, এইচ পাইলোরি—বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আমরা বড় বড় ভ্যাকসিন ট্রায়াল করেছি। আপার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমরা কমিউনিটি লেভেল থেকে শুরু করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়, এমনকি সরকারের সঙ্গে নানা ধরনের কোলাবোরেশন করেছি। দেশে যখনই কোনো জরুরি পরিস্থিতি এসেছে—যেমন রোহিঙ্গা পপুলেশনের সংকট—আপার নেতৃত্বে আমরা কক্সবাজার থেকে শুরু করে ভাসানচর পর্যন্ত গেছি। বাংলাদেশ সরকার আমাদের সহায়তা করেছে, আর আমরা সেখানে বিভিন্নভাবে ওরাল কলেরা ভ্যাকসিন দিয়েছি। এমনকি ঢাকা শহরের বিভিন্ন হটস্পটেও আমরা ভ্যাকসিনেশন করেছি। আগামী বছর তার নেতৃত্বে আরো বৃহৎ জনগোষ্ঠীতে ওরাল কলেরা ভ্যাকসিন দেয়ার পরিকল্পনা আছে।
তিনি বহু পুরস্কার পেয়েছেন। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ জাতীয় সম্মাননাও পেয়েছেন। আমার নিজের পিএইচডি, পড়াশোনা, ক্যারিয়ার সবকিছুতে আপার অবদান আছে। যে মুহূর্তে কেউ জয়েন করে—বিশেষ করে মেয়েরা—তিনি সবাইকে ভীষণভাবে উৎসাহ দেন, পাশে থাকেন এবং কাজ করার পরিবেশ তৈরি করে দেন। বিজ্ঞানের সঙ্গে থেকে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়ার অনুপ্রেরণা আমরা আপার কাছ থেকেই পেয়েছি।
আন্তর্জাতিক কোনো কনফারেন্সে গেলে বোঝা যায় যে তিনি আসলেই একজন ‘স্টার’। যেভাবে তিনি বাংলাদেশকে রিপ্রেজেন্ট করেন, সেটা সত্যিই অনন্য। পৃথিবীর যেকোনো দেশের যেকোনো কনফারেন্সে ইনফেকশিয়াস ডিজিজ, কলেরা বা টাইফয়েডের কথা উঠলেই সবার আগে ডক্টর ফিরদৌসী কাদরীর নাম আসে। আমাদের অনেক পাবলিকেশন হয়েছে। আমার নিজেরই আপার সঙ্গে প্রায় ১০০টি কাজ আছে। ল্যানসেট, নিউ ইংল্যান্ড জার্নালসহ সব বড় বড় জার্নালে তিনি নিজে প্রায় ৮০০টি পাবলিকেশন করেছেন। আন্তর্জাতিক কমিটি থেকে শুরু করে দেশের ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সব জায়গায় তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি উনি নাইট্যাগেও যোগ দিয়েছেন।
আপার ফিল্ড ‘মিউকোসাল ইমিউনোলজি ও ভ্যাকসিনোলজি ইউনিটে’ যারা কাজ করে তারা দ্রুত উন্নতি করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ, ব্র্যাক যেখান থেকেই শিক্ষার্থী আসুক, আপার ল্যাবে কাজ করতে করতে তারা এক-দুই বছরের মধ্যেই পিএইচডি বা মাস্টার্স প্রোগ্রামে চলে যায়। আপার ছাত্রছাত্রী এখন পৃথিবীর সব জায়গায়ই—যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, হার্ভার্ড, এমজিএইচে আছে।
যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক বা নর্থ সাউথ থেকে আসে, আপা তাদের সুযোগ করে দেন। যদি কেউ পড়াশোনা করতে চায়, সে যেন সেটা করতে পারে তা লক্ষ রাখেন। গবেষণা আপার কাছে শুধু কাজ নয়, এটা তার প্যাশন। উনি যেভাবে অনুপ্রাণিত করেন, তাতে মনে হয় আমরা শুধু সায়েন্স না, যেন একটা গল্প তৈরি করছি। কোনো স্টাডি শেষে পাবলিকেশন বা কনফারেন্সে প্রেজেন্টেশন যখন করি, তখন আপার ভূমিকা অসাধারণ। জুনিয়রদের জন্য ওনার সাপোর্ট বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। সবসময় চান জুনিয়ররা প্রেজেন্ট করুক, শিখুক, সামনে আসুক।
এককথায় তিনি ‘সিনসিয়ার’ এবং ‘পারফেকশনিস্ট’। তিনি গাছ ভীষণ ভালোবাসেন। গাছের প্রতি যেমন ভালোবাসা, আমাদের প্রতিও তেমনি। আর বাসার মানুষের প্রতি তো অবশ্যই।
ড. ফাহিমা চৌধুরী: সিনিয়র সায়েন্টিস্ট, আইসিডিডিআর,বি










