সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী আমার শ্বশুর। আব্বুর সঙ্গে সামাজিকভাবে আমার প্রথম দেখা হয় কিছু কমন বন্ধুর মাধ্যমে। বিভিন্ন দাওয়াতে, ইফতারে বা নতুন বছরের অনুষ্ঠানে তাকে দেখতাম। তার মুখে সবসময় হাসি লেগেই থাকত। নাসিমের সঙ্গে আমার সম্পর্ক তৈরি হওয়ার সময় আব্বুর ভাবভঙ্গি দেখে আমার মনে হয়েছিল, তিনি বিষয়টি নিয়ে সন্তুষ্ট। সেই দিনগুলোতে তিনি হাসিমুখে উপস্থিত ছিলেন, আর বাবা-মায়েরা তাদের মতো এক কোণে গল্প করতেন।
তার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন, কথোপকথন শুরু করার বিষয়টি আমার কাছে সবসময় খুব সহজ মনে হয়েছে। প্রথম পরিচয়ের প্রায় সাত-আট মাস পর আমাদের বিয়ের কথাবার্তা হয় এবং তারা আমাদের বাড়িতে প্রস্তাব নিয়ে আসেন। সেই ঘরোয়া আয়োজনে তার মধ্যে শ্বশুর হিসেবে কোনো দম্ভ বা বাড়তি আচরণ ছিল না।
এক বছর পর আমাদের বিয়ে হয়। শ্বশুর হিসেবে তিনি আমার কাছে খুবই সহজ ছিলেন। সামাজিকভাবে পুত্রবধূ ও শ্বশুর—এই দূরত্বে তিনি আমাকে কখনই দেখেননি। আমার রান্না করা খাবার তিনি খুব পছন্দ করতেন। নতুন কিছু রান্না করলে তিনি খুব আগ্রহ দেখাতেন। তিনি আমাকে মজা করে বলতেন, ‘তোমার তো প্রফেশনাল শেফ হওয়া উচিত!’
খাবারের মাধ্যমে আমরা টেবিলে একসঙ্গে একত্র হচ্ছি, এ বিষয়টি তিনি খুব উপভোগ করতেন।
আমাদের বিয়ের পর মাঝখানের কিছু সময়ে আমি আমেরিকায় পিএইচডি করছিলাম। তিনি তখন আমার খুব খোঁজখবর নিতেন এবং আমি ও নাসিম যখন আলাদা থাকতাম, তখন তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাপোর্টিভ। আমার পড়াশোনার সূত্রে তাকে কখনই বলতে দেখিনি যে—বিয়ের পর মেয়েদের পড়াশোনার কী প্রয়োজন? আকার-ইঙ্গিতেও তিনি এ ধরনের কথা বলেননি।
আমি যখন একেবারেই দেশে ফিরে আসি, তখন আমার ক্যারিয়ার নিয়ে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করতেন। আমার সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল হাসিমুখের এবং স্বাচ্ছন্দ্যের। কোনোদিনই মনে হয়নি যে আমি কোনো ভারী সম্পর্ক বহন করছি।

স্ত্রীর সঙ্গে সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী
পারিবারিক আড্ডা তিনি খুব পছন্দ করতেন। অনেক গল্প করতেন, পুরনো স্মৃতির কথা বলতেন। সমাজ, রাজনীতি—অনেক কিছু নিয়েই কথা বলতেন, অভিজ্ঞতা শেয়ার করতেন। তার স্নেহ প্রকাশের ভঙ্গিটাও ছিল ঠাট্টা-মশকরার মতোই। তিনি একেবারেই জাজমেন্টাল ছিলেন না।
দর্শনের জায়গা থেকে আমার মনে হয়েছে, তিনি স্বাধীনতা দিতে পছন্দ করতেন এবং নিজের মতামত চাপিয়ে দিতেন না। তিনি ছিলেন খুব দৃঢ় মূল্যবোধসম্পন্ন। তার সততা, দয়ালু মনোভাব—এগুলো শুধু ব্যক্তিগত ছিল না, সমাজকে নিয়ে চলার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য ছিল। আমি কখনো অনুভব করিনি বাবা হিসেবে ওনার নির্দিষ্ট কোনো চাওয়া-পাওয়া আছে।
আমার শ্বশুর সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর আকাঙ্ক্ষা ছিল—সবাই মিলে ভালো থাকা। তিনি আসলে একজন দেশপ্রেমিক ছিলেন, যা তিনি মনেপ্রাণে ধারণ করতেন। যখন তিনি দ্বিতীয়বারের মতো উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছিলেন, তখন তিনি কাজটা খুব সিরিয়াসলি নিয়েছিলেন। আমি দেখেছি, দেশের একটা মুহূর্ত সুন্দর করে পার করাটাই তার মূল চিন্তা ছিল।
আমার শ্বশুর ছিলেন খুব ভ্রমণবিলাসী। নাতি-নাতনি সবাইকে নিয়ে ঘুরতে খুব ভালোবাসতেন। ভ্রমণে গেলে তিনি খুব পরিকল্পনা করে কাজ করতেন এবং সবার আনন্দ তিনি উপভোগ করতেন। একবার আমরা ঢাকা থেকে রোমে যাই এবং সেখান থেকে একটি ক্রুজ নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করি। আমার বাবা-মাও অনেক সময় আমাদের সঙ্গে যেতেন। মরক্কোয় একবারের ভ্রমণটাও ছিল অনেক মজার। তিনি ভ্রমণকে আরো আনন্দময় করে তুলতেন সেখানকার ঐতিহাসিক গল্পগুলো বলে। আমার মনে হয়, এই স্মৃতিগুলো বাচ্চারা মনে রাখবে।
আব্বু ছিলেন এক অসামান্য মানুষ। তার সরলতা, উদারতা এবং জীবনের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি—এ সবকিছুই আমাকে প্রতিনিয়ত মুগ্ধ করেছে।
সামিয়া হক: সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর পুত্রবধূ। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও স্কুল অব জেনারেল এডুকেশনের ডিন










