জ্ঞান হওয়ার পর থেকে বাবাকে অ্যাডাম স্মিথের ইনভিজিবল হ্যান্ড হিসেবে দেখেছি। আমার কোনো কাজে হস্তক্ষেপ করতেন না। কখনো কোনো ব্যাপারে হ্যাঁ-ও বলতেন না, না-ও বলতেন না। ছোটবেলায় মনে হতো যে কেন কিছু বলে না। কিন্তু এখন বুঝি, সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা সবার থাকা উচিত। সেটা খারাপ হলেও সেখান থেকে ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা নেয়া যায়।

ছোটবেলায় বাবার তুলনায় মায়ের সঙ্গে আমার নৈকট্য বেশি ছিল। মা ২০০৭ সালে আমাদের রেখে পরপারে চলে যান। আমি বেড়ে উঠেছি বাবার ‘ননইন্টারভেনশনিস্ট অ্যাটিটিউড’, অ্যাডাম স্মিথের ‘ইনভিজিবল হ্যান্ড’ আর মায়ের ‘ইন্টারভেনশনিস্ট’ মনোভাবের মধ্যে। ফলে আমার জীবনে বাবা-মা ছিলেন একে অন্যের পরিপূরক। বাবার যা সীমাবদ্ধতা ছিল তা মা পূরণ করেছেন, আর মায়েরটা বাবা। সে হিসেবে আমি একটা সাম্যাবস্থায় মানুষ হই।

আমার বাবা খুবই সফল মানুষ। শিক্ষক হিসেবে সফল ছিলেন, অ্যাডমিনিস্ট্রেটর হিসেবেও সফল। বাবা খুব ব্যস্ত থাকায় তার সঙ্গে সেভাবে সময় কাটানোর সৌভাগ্য বা সুযোগ হয়নি। ২০০২ সালে তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেন। তারপর কিছুদিন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। এরপর এআইইউতে আসেন।

২০১৬ সালে আব্বার দুবার স্ট্রোক হয়। ফলে আব্বাকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটা সিদ্ধান্ত নিতে হয়। মা চলে যাওয়ার পর তিনি নিজেকে নানা কাজে ব্যস্ত রেখেছিলেন। স্ট্রোকের পর তার থামার সময় চলে আসে। এর মধ্যে ২০২০ সালে আসে কভিড আর লকডাউন। ওই বছরই আগস্টে আব্বা পিছলে পড়েন। এতে তার মেরুদণ্ডের দুটো হাড়ে ফ্র্যাকচার হয়। ওই বয়সে অপারেশন করা সম্ভব না। চার মাস তাকে বিছানায় শুয়ে থাকতে হয়েছিল। দেখাশোনার জন্য একজন মানুষ ছিল। আমরাও কিছুটা মানসিক সাপোর্ট দিয়েছি। কিন্তু তার পক্ষে এ অসুস্থতা ও অসহায়ত্বের মধ্য দিয়ে যাওয়া, জীবনযাপন করা খুব কঠিন ছিল। কিন্তু আব্বা এক্ষেত্রেও খুব সফল।

এর একটা ভালো দিকও আছে। আব্বার সঙ্গে ছেলেবেলায় যেহেতু আমার সেভাবে সময় কাটানো হয়নি, এখন তার সঙ্গে অনেক সময় কাটানো হয়। বাসায় ফিরেই আব্বাকে ‘হ্যালো’ না দিলে তিনি মুখে কিছু বলেন না তবে মনে মনে রাগ হন। বার্ধক্যে তিনি দ্বিতীয় শৈশবে প্রবেশ করেছেন। আমার স্ত্রী, কন্যা আর আমি খুবই সৌভাগ্যবান যে তার সঙ্গে সময় কাটাতে পারছি। বাবা-মায়ের শেষ বয়সে সময় দিতে পারা সন্তানদের জন্য একটা বড় সুযোগ।

ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে নৈকট্য কম থাকলেও আমাদের জীবনে একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আছে। ১৯৭৩ সালের অক্টোবরে আমার বাবা যুক্তরাজ্যের ওয়েলসে যান পিএইচডি করতে। পরের বছর এপ্রিলে মা, ছোট বোনসহ আমি তার কাছে যাই। বাবার ফুল ফ্রি স্কলারশিপ না থাকায় মাকে চাকরি করতে হতো। এতে আব্বা আক্ষরিক অর্থেই হাউজ হাজবেন্ড হয়ে উঠলেন। সকাল ৮টায় তিনি আমাদের দুই ভাইবোনকে ঘুম থেকে ওঠাতেন। আমাদের স্কুলে আনা-নেয়া করতেন। ফিরলে আমাদের নাশতা খেতে দিতেন। সে সময় বাংলাদেশ বা দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশের বাবারাই সন্তানের সঙ্গে সময় কাটাতেন না। কিন্তু আমরা সে সুযোগ পেয়েছি। এটা ছিল আমার জীবনের গোল্ডেন টাইম।

আমার বাবার ধৈর্য খুব বেশি। অনেক অনেক বেশি পর্যবেক্ষণ করে তারপর সিদ্ধান্ত নেন। এটা দাদার ক্ষেত্রেও ছিল। আমারও বয়স যত হচ্ছে তত ধৈর্য বাড়ছে। আগে পর্যবেক্ষণ করি পরে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিই।

বাবা তার কর্মজীবনে নানান সময়ে নানান পদে ছিলেন। সে সূত্রে নানা ধরনের মানুষের সঙ্গে মিশতে হয়েছে। আমি দেখেছি, বাবা সবসময় তার সহকর্মী ও অধীনদের চোখ দিয়ে পৃথিবী দেখার চেষ্টা করতেন। তার ভেতর সহমর্মিতা ছিল। বাবার দায়িত্ববোধ ছিল প্রবল, সবার সুযোগ-সুবিধা তিনি উপলব্ধি করতেন। তবে তিনি নিজের এ গুণটা প্রকাশ করতে চাইতেন না। তিনি ভীষণ নিভৃতচারী ছিলেন।

বাবা-মায়ের সম্পর্কে বেশ রাগ-অনুরাগ ছিল। আব্বা কিছু বললে মা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠতেন, আর মা কিছু বললে আব্বাও ছাড় দিতেন না। তাদের রসায়ন ছিল অন্য রকম। আর এজন্যই বাবা এখন মায়ের অভাবটা খুব অনুভব করেন।

আসরারুল ইসলাম চৌধুরী

ড. আমিরুল ইসলাম চৌধুরীর পুত্র। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক