বাগস বানির কোনো এপিসোড শুরু হওয়া বিদ্যমান। শুরুতেই ইংরেজিতে ডব্লিউ বি দুটো অক্ষরের একটা লোগো। লোগোটি ওয়ার্নার ব্রাদার্সের। বেবি লনি টুনসেরও তা-ই। সুপারম্যান, ব্যাটম্যানের অ্যানিমেশন দেখা যাক। সেখানেও এই লোগো। তবে শুধু অ্যানিমেশন নয়। হলিউডের বড় বড় সিনেমারও প্রযোজক, নির্মাতা ওয়ার্নার ব্রাদার্স। সম্প্রতি ওয়ার্নার ব্রাদার্সের সঙ্গে একটি চুক্তিতে গেছে নেটফ্লিক্স। চুক্তি অনুসারে ওয়ার্নার ব্রাদার্সের সিনেমা, স্টুডিও, এইচবিও ও এইচবিও ম্যাক্স অধিগ্রহণ করবে নেটফ্লিক্স। এরপর থেকেই ওয়ার্নার ব্রাদার্স নিয়ে স্মৃতিকাতরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। ওয়ার্নার ব্রাদার্সের দীর্ঘ ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত বহু কনটেন্ট। সেগুলো যেমন বৈচিত্র্যময় তেমনি আগ্রহজাগানিয়া।

হলিউডের শুরুর যুগের অন্যান্য চলচ্চিত্র ব্যবসায়ীদের তুলনায় হ্যারি, স্যাম, অ্যালবার্ট ও জ্যাক ওয়ার্নার চার ভাই ছিলেন একেবারেই আলাদা ধরনের মানুষ—দূরদর্শী, স্পষ্টভাষী, সাহসী ও আবেগপ্রবণ। এদের মধ্যে হ্যারি ছিলেন সবচেয়ে স্থিতধী ও ব্যবসায়িক মানসিকতার; স্যাম ছিলেন প্রযুক্তিমনস্ক স্বপ্নদ্রষ্টা, যার মৃত্যু হয় খুব তাড়াতাড়ি; অ্যালবার্ট জনসমক্ষে কম এলেও পরিবারের নির্ভরযোগ্য প্রতিনিধি; আর জ্যাক ছিলেন চঞ্চল, বিনোদনপ্রিয় এবং কখনো কখনো অনিয়ন্ত্রিত। তারাই গড়ে তোলেন ওয়ার্নার ব্রাদার্স।

a1

নিজেদের বানানো একটি থিয়েটারের সামনে অ্যালবার্ট ওয়ার্নার

১৯০৩ সাল ছিল সিনেমার ইতিহাসে এক বড় মোড় ফেরানো সময়। দর্শকের সামনে ঘটনার সরাসরি প্রদর্শনের ধারা বদলে গিয়ে নতুন কাহিনিভিত্তিক চলচ্চিত্রের দিকে এগোতে শুরু করল। এ নতুন ধারা জনপ্রিয় হবে কিনা তা পরীক্ষা করার উপায় ছিল দর্শকের প্রতিক্রিয়া। স্যাম ওয়ার্নার নতুন এ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের প্রস্তাব দেন। প্রজেক্টরটির দাম ছিল ১ হাজার ডলার, সঙ্গে এসেছিল ১৯০৩ সালের বিখ্যাত ‘দ্য গ্রেট ট্রেইন রবারি’ চলচ্চিত্রের একটি কপি। চার ভাই মিলে যা টাকা জোগাড় করেছিলেন তা যথেষ্ট ছিল না, তাই তাদের বাবা বেঞ্জামিন ওয়ার্নার নিজের সোনার ঘড়ি বন্ধক রেখে বাকি অর্থ জোগাড় করেন।

নিজেদের উঠোনে তাঁবু খাটিয়ে প্রতিবেশীদের আমন্ত্রণ জানিয়ে যখন প্রথম প্রদর্শনী হলো, তা দারুণ সাড়া ফেলল। এরপর তারা আরো স্থায়ী স্থানের খোঁজে ওহাইওর নাইলস শহরে একটি খালি দোকান ভাড়া নেন, কারণ সেখানে একসময় কার্নিভাল বসার কথা ছিল।

অ্যালবার্ট টিকিট বিক্রি করতেন, আর স্যাম পরিচালনা করতেন প্রজেক্টর। তবে হ্যারি ও জ্যাক তাদের সঙ্গে ছিলেন কিনা তা নিয়ে বিতর্ক আছে। কিন্তু এর মধ্যেই অ্যালবার্ট ও স্যাম তাদের কাজ চালিয়ে যান। ক্ষতিগ্রস্ত ও ছেঁড়া ফিল্ম মেরামত করে স্যাম প্রতিটি শো ঠিক রাখতেন। নাইলসে প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হওয়ায় মানুষের ভিড় উপচে পড়ে এবং ছোট সিনেমার সম্ভাবনা প্রমাণিত হয়।

1b

লস অ্যাঞ্জেলেসে ওয়ার্নার ব্রাদার্সের সানসেট বুলেভার্দ স্টুডিও, ১৯২০ খ্রি. ছবি: দ্য হলিউড রিপোর্টার

কিছুদিন পর তুষারঝড়ে দর্শক কমে যায়, কিন্তু ভ্রমণময় শো থেকে তারা সপ্তাহে প্রায় ৩০০ ডলার করে আয় করতেন দুই ভাই। হ্যারি উপলব্ধি করেন—নিজেদের স্থায়ী থিয়েটার থাকলে লাভ আরো বাড়বে। তাই নিউ ক্যাসল শহরের একটি পুরনো নিকেলোডিয়ন ভাড়া নেন। সমস্যা হচ্ছিল—চেয়ার কেনার টাকা নেই। তখন তারা স্থানীয় এক ফিউনারেল পার্লারের সঙ্গে চুক্তি করেন যে প্রয়োজন না হলে তারা সেই চেয়ারগুলো ব্যবহার করতে পারবেন। এভাবেই তাদের ক্যাসকেড থিয়েটার শুরু হয়।

৯৯ আসনের ক্যাসকেড থিয়েটারটি ২৮ মে ১৯০৫ সালে খোলে। মেমোরিয়াল ডেতে ফিউনারেলের কারণে চেয়ার ফেরত চাইলে তারা মৃত স্কুল সুপারিন্টেনডেন্টের স্ত্রীকে অনুরোধ করেন আরো একদিন দেরি করতে, বিনিময়ে তার সন্তানদের সারা বছর বিনামূল্যে সিনেমা দেখার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি সম্মত হন।

ক্যাসকেড দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সে সময় সিনেমা হলগুলো সাধারণত শহরের অন্ধকার বা অনিরাপদ এলাকায় থাকলেও ওয়ার্নাররা তৈরি করলেন পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। থিয়েটারের বাইরে লেখা থাকত ‘সজ্জন ভদ্রলোক, ভদ্রমহিলা ও শিশুদের জন্য পরিশীলিত বিনোদন।’ চলচ্চিত্র শুরু হওয়ার আগে স্যাম দর্শকের জন্য স্লাইড দেখাতেন—‘দয়া করে লেখাগুলো নিজে পড়ুন’, ‘মহিলারা টুপি খুলুন’, ‘পুরুষরা দয়া করে মেঝেতে থুতু ফেলবেন না’ ইত্যাদি। রিল বদলানোর সময় আরেকটি স্লাইড দেখা যেত। তাদের থিয়েটারের সিনেমা এতই জনপ্রিয় হয় যে প্রথম শোর পর দর্শক এতটাই মুগ্ধ ছিলেন যে আলো জ্বলে ওঠার পরও কেউ উঠছিল না।

তবে প্রাথমিক পর্যায়ে সিনেমা ব্যবসা ছিল বিপজ্জনক। সর্বত্র ধূমপানের চল ছিল। ফিল্ম তৈরি হতো সেলুলয়েডে এবং তা অত্যন্ত দাহ্য। জ্যাক ওয়ার্নারের একটি আত্মজীবনীমূলক কাহিনীতে বর্ণনা আছে কীভাবে এক সেফটি ইন্সপেক্টরের সিগারেট থেকে বিস্ফোরণ ঘটে প্রজেক্টর ঘর ধ্বংস হয় এবং ইন্সপেক্টরের মৃত্যু ঘটে। এদিকে ১৯০৭ সালের পর সিনেমার জনপ্রিয়তা যেমন বাড়তে থাকে, তেমনি সমালোচনাও। অনেকে মনে করতেন অন্ধকার হল অনৈতিক কাজের আখড়া। আবার কেউ কেউ বিশ্বাস করতেন সিনেমা তরুণদের বিপথে নিতে পারে। এসব সমালোচনার বিপরীতে দাঁড়িয়ে ব্যবসা বাড়াতে গিয়ে ভবিষ্যতে সেন্সরশিপ মোকাবেলায় ওয়ার্নাররা আরো দৃঢ় হন।

এ সময় হ্যারি বিয়ে করেন রিয়া লেভিনসনকে। অ্যালবার্ট বিয়ে করেন বেসি ক্রিগারকে। সিনেমার দর্শক বাড়ার কারণে নতুন সিনেমার চাহিদা বেড়ে যায়। হ্যারি বুঝতে পারেন প্রদর্শনের চেয়েও বেশি মুনাফা সিনেমা বিতরণে। পিটসবার্গে তারা ডুকেন অ্যামিউজমেন্ট সাপ্লাই কোম্পানি স্থাপন করেন। স্যাম ও অ্যালবার্ট নিউইয়র্কে যান এবং মার্কাস লোয়ের কাছ থেকে ব্যবহৃত চলচ্চিত্র ৫০০ ডলারে কেনেন।

পরবর্তী ১৫ বছর নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে কেটেছিল। থমাস এডিসনের পেটেন্ট গ্যাংদের হুমকি উপেক্ষা করে তারা এগিয়ে যেতে থাকেন। ১৯১৭ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসে স্থানান্তরিত হয়ে নিজেদের চলচ্চিত্র প্রযোজনা শুরু করেন। জন্ম হয় ওয়ার্নার ব্রাদার্স স্টুডিও।

১৯২২ সালের শেষ দিকে দুই ভাই ‘ওয়ার্নার ব্রাদার্স ক্ল্যাসিকস অব দ্য স্ক্রিন’ নামে নতুন ট্রেডমার্ক নেন। হ্যারির বিশ্বাস ছিল, এতে তাদের চলচ্চিত্রের স্বাতন্ত্র্য ও গুণমান প্রকাশ পাবে। ১৯২৩ সালের ৪ এপ্রিল ওয়ার্নার ব্রাদার্স স্টুডিও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। আর ১৯২০-এর দশক তাদের উদ্ভাবক, সামাজিক সচেতন নেতা এবং আমেরিকান চলচ্চিত্র শিল্পের দিকপাল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। আজ প্রতিষ্ঠানটি কিংবদন্তিতুল্য। তবে এর ভবিষ্যৎ কী হবে তা সময়ই বলে দেবে।

—দ্য হলিউড রিপোর্টার অবলম্বনে

মাহমুদুর রহমান