১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন কেবল রাষ্ট্রভাষার দাবি ছিল না, এটি ছিল সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের ঘোষণা। সেই আন্দোলনের মূল উপজীব্য ছিল মানুষের অস্তিত্ব ও পরিচয়ের সঙ্গে ভাষার অঙ্গাঙ্গি সম্পর্ক। তবে নব্বইয়ের দশক থেকে চলচ্চিত্র ও নাটকে এ ভাষাগত বৈচিত্র্য দীর্ঘদিন ধরে প্রমিত বাংলার সীমাবদ্ধ কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ ছিল। ঢাকাই, চাটগাঁইয়া, ময়মনসিংহি, বরিশালি ও রাজশাহীর আঞ্চলিক ভাষা উচ্চারণগুলো বহুদিন মূলত ‘লোকাল ফ্লেভার’ হিসেবে ব্যবহৃত হতো, যেখানে চরিত্রের বিশেষ বৈশিষ্ট্য বা কৌতুক চরিত্রের সংলাপে সীমাবদ্ধ থাকত। তবে কিছু ব্যতিক্রমও ছিল, যা সংখ্যায় খুবই কম।

নব্বইয়ের দশকের প্রমিত মানভাষা

নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশী সিনেমা ও টেলিভিশন নাটক গ্রামীণ পটভূমিতে ভরপুর ছিল। তখনকার চলচ্চিত্রের ভাষা ছিল মূলত প্রমিত মান বাংলা, যেখানে সীমিত আঞ্চলিক ‘টান’ থাকত গ্রামবাংলাকে বোঝানোর জন্য। দেশের যেকোনো প্রান্তের গ্রামের গল্প বলা হতো একই আঞ্চলিক ধাঁচের ভাষায়। সে সময় সালমান শাহ, মৌসুমী, শাবনূর ও রিয়াজের মতো তারকাভিত্তিক গ্রামীণ গল্পের সিনেমাগুলো সারা দেশে একীভূত বাজার দখল করে রাখত। জনপ্রিয় সিনেমা যেমন ‘‌কাঁচ কাটা হীরে’, ‘সুজন সখি’, ‘প্রেমের সমাধি’, ‘খেয়া ঘাটের মাঝি’- এগুলোতে আঞ্চলিক সংলাপ থাকত বিশেষত কৌতুক চরিত্র বা সহায়ক চরিত্রের মুখে। পুরো স্ক্রিপ্টে চাটগাঁইয়া, ময়মনসিংহ বা রাজশাহীর উপভাষা ব্যবহার তখন ব্যতিক্রমী, কারণ দর্শক বোঝার সুবিধা ও বাণিজ্যিক ঝুঁকির কারণে নির্মাতারা এড়িয়ে যেতেন।

10

এ পরিস্থিতি প্রথম ভেঙে দেয় ২০০৭ সালে গোলাম রব্বানী বিপ্লব পরিচালিত ‘স্বপ্নডানায়’। সিনেমাটি নওগাঁ অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষায় নির্মিত, যেখানে সংলাপের পুরো ধারা আঞ্চলিক উচ্চারণে চলে, ফলে আঞ্চলিক ভাষা কাহিনীর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায়।

টেলিভিশনে আঞ্চলিক ভাষার অভ্যুদয়

ভাষার সংস্কৃতিতে আমূল পরিবর্তন আসে ছোট পর্দায়। ২০০৮-০৯ সালের দিকে টেলিভিশনের নাটক নির্মাতারা বিশেষভাবে বৃন্দাবন দাস (পাবনা, সিরাজগঞ্জ) আঞ্চলিক ভাষায় নাটক নির্মাণ করেন। ‘সাকিন সারিসুরি’, ‘ঘরকুটুম’, ‘তিন গ্যাদা’, ‘হার কিপটে’-এসব নাটক তুমুল জনপ্রিয় হয়। সঙ্গে হুমায়ূন আহমেদের কিছু নাটকও ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলের আঞ্চলিক উচ্চারণকে গল্পের অংশ হিসেবে প্রাধান্য পেয়েছে। নাটকগুলো দর্শককে তথাকথিত ‘লোকাল ফ্লেভার’ থেকে বের করে আঞ্চলিক ও কথ্য ভাষায় অভ্যস্ত করতে শুরু করে। নোয়াখালী ও বরিশালের ভাষায় নির্মিত নাটকগুলোও এ পরিবর্তনের সাক্ষী।

11

৫১ বর্তী ও ফারুকীর নাটক-সিনেমায় মুখের ভাষার ব্যবহার

নির্মাতা মোস্তফা সরওয়ার ফারুকী তার নির্মিত ‘‌৫১ বর্তী’ ধারাবাহিকে আঞ্চলিক ও প্রমিত মিলিয়ে এক ধরনের মিশ্র ভাষা, ‘থার্ড পার্সন সিঙ্গুলার নাম্বার’ সিনেমায় বিশেষ চরিত্রের মুখে পুরান ঢাকার আঞ্চলিক ভাষা এবং আরো বহু নির্মাণ আঞ্চলিক ভাষাকে মানুষের কাছে সহজ, বোধগ্য ও জনপ্রিয় করে তুলেছে। ফলে ২০১০ পরবর্তী প্রজন্ম ধীরে ধীরে আঞ্চলিক উচ্চারণকে গল্পের অংশ হিসেবে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে থাকে। একটা সময় নাটক-সিনেমায় প্রমিত ভাষা ব্যবহার করা হলেও তা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে ফারুকী জোয়ারে। তার সিনেমাতেও মিশ্র ও আঞ্চলিক ভাষাই শোনা যায়।

২০১৫-বর্তমান: ভাষা কাহিনীর কেন্দ্রবিন্দুতে

২০১৫-এর পর চলচ্চিত্রের দিগন্ত পরিবর্তিত হয়। নতুন প্রজন্মের পরিচালকরা গল্পের প্লট বা স্থানকে শুধু লোকেশন নয়, বরং ভাষাসহ একটি পূর্ণ সাংস্কৃতিক বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করেন। আঞ্চলিক উপভাষা ও উচ্চারণ কাহিনীর অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে, ফলে গল্পের চরিত্র ও অভিজ্ঞতা আরো প্রাঞ্জলভাবে ফুটে ওঠে।

একটি মাইলফলক হলো তৌকির আহমেদ পরিচালিত ‘হালদা’ (২০১৭)। হালদা নদীর পাড়ের মৎস্যজীবীর জীবন চাটগাঁইয়া ভাষায় নির্মিত, যেখানে ভাষা শুধু সংলাপ নয়, গল্পের প্রাণশক্তি।

13

২০১৯ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ন ডরাই’ গ্রাম উপকূলীয় এক কিশোরীর গল্পকে চাটগাঁইয়া/কক্সবাজারের উপভাষা আরো প্রাণ দেয়। এরপর ‘মেইড ইন চিটাগাং’ (২০২২), সাঁতাও (২০২৩) ও ‘হাওয়া’ (২০২২)-এর মতো সিনেমাগুলোতে কথ্য বাংলা ভাষায় বৈচিত্র্য স্পষ্টভাবে দেখা যায়। এসব সিনেমায় ভাষা কেবল আলংকারিক উপাদান নয়, এটি অভিনয়ের শক্তিশালী অস্ত্র, গল্পের অভিজ্ঞতা ও আবেগের শব্দভাণ্ডার।

ওটিটি প্লাটফর্ম: ভাষার নতুন দিগন্ত

২০১৯-পরবর্তী সময়ে ওটিটি প্লাটফর্মের উত্থান দেশে ভাষাগত বৈচিত্র্যের নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে। ওটিটি এখন শহুরে ও গ্রামীণ জীবন, সামাজিক সংকট এবং আঞ্চলিক অভিজ্ঞতাকে সরাসরি ক্যামেরায় ধরে।

এর গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো মোহাম্মদ তৌকির ইসলামের ‘শাটিকাপ’ (২০২২)। আট পর্বের সিরিজটি রাজশাহী অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষায় নির্মিত, চরিত্রের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও আঞ্চলিক ভাষার মধ্য দিয়ে গল্প দর্শকের কাছে আরো গ্রহণযোগ্য হউয়ে উঠেছে। এছাড়া ‘অ্যালেন স্বপন’-এর মতো সিরিজগুলো আঞ্চলিক ভাষার জনপ্রিয়তা এবং ‘ট্রেন্ডি’ ভাব তৈরি করেছে, মানুষের মধ্যে আঞ্চলিক ভাষার প্রতি আগ্রহ জাগিয়েছে।

12

বাংলাদেশী পর্দায় ভাষার ব্যবহার সরল রেখায় চলেনি। ১৯৯০-২০০০ দশকে আঞ্চলিক ভাষা ছিল চরিত্র ও পরিবেশের ইঙ্গিত, শুধু আলংকারিক বা কৌতুকমূলক। ২০১৫-এর পর থেকে আঞ্চলিক ভাষা হয়ে উঠেছে গল্পের হৃদয়। ওটিটির উত্থান, আন্তর্জাতিক উৎসবে অংশগ্রহণ এবং দর্শকের ভাষাগত বৈচিত্র্যে আগ্রহ এ পরিবর্তনকে দ্রুততর করেছে। এর বাংলা চলচ্চিত্র ও নাটকে আঞ্চলিক ভাষা গল্পের অভিজ্ঞতা এবং দর্শকের সংযোগের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ বিবর্তন আমাদের ভাষার ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করছে এবং নতুন প্রজন্মকে পরিচয় করাচ্ছে বাংলা ভাষার বৈচিত্র্যময় ভাণ্ডারের সঙ্গে।