ভারতের বিখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনার মনীশ মালহোত্রা। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতীয় সৌন্দর্য, আভিজাত্য ও চলচ্চিত্রনির্ভর ফ্যাশনের যে ভাষা তৈরি হয়েছে, তার কেন্দ্রে থেকেছেন তিনি। পোশাক ডিজাইনাররা যখন নিজেরা রেড কার্পেটে হাঁটার কথা ভাবতেও পারেননি, তখন এক তরুণ ষাট ও সত্তরের দশকের নান্দনিকতাকে পুঁজি করে বলিউডে পা রাখলেন। তিনি শুধু পোশাকই ডিজাইন করেননি, বদলে দিয়েছেন মূলধারার ভারতীয় সিনেমার চেহারা।
১৯৯৫ সালে ‘রঙ্গিলা’র জন্য প্রথমবারের মতো ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ কস্টিউম ডিজাইনের পুরস্কার জয় করেন মনীশ। এ পুরস্কারই প্রথম তার প্রতিভাকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। এরপর ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’, ‘জাব উই মেট,’ ‘রকস্টার’, ‘ওম শান্তি ওম’, ‘রকি অউর রানি কি প্রেম কাহানি’ এমনই একটির পর একটি সিনেমায় তার ডিজাইন করা পোশাক পর্দায় যতটা আলো ছড়িয়েছে, তার থেকেও বেশি ছড়িয়ে গেছে পর্দার বাইরে। কলেজ ক্যাম্পাসে, টি-শার্টে নান্দনিকতা কিংবা শাড়ির সঙ্গে ন্যুড টোন, সবই তার হাত ধরে মানুষের দৈনন্দিন পোশাকে জায়গা করে নেয়। কিন্তু তার এ বিপুল সাফল্যের আড়ালেও আরেকটি স্বপ্ন চুপচাপ বেড়ে উঠছিল। একটি স্বপ্ন, যা ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে আসার আগেই তার ভেতর জন্মেছিল।

ফ্যাশনের ঝলমলে জগতে প্রবেশের আগেই মনীশ নিজেকে কল্পনা করতেন পর্দার পেছনে প্রযোজক, পরিচালক, গল্পকার হিসেবে। কিন্তু যখন তার ফ্যাশন ব্র্যান্ডের বিস্তার বাড়তে লাগল, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজ বাড়তে থাকল, চলচ্চিত্র তৈরির সে ইচ্ছা থমকে রইল ব্যস্ততার ভিড়ে।
কভিডের নীরব সময় সেই থেমে থাকা জায়গাটুকুকে উন্মুক্ত করে দিল। স্থিরতা তাকে আবার মনে করিয়ে দিল, তিনি সিনেমার মানুষ। সেখান থেকেই জন্ম ‘স্টেজ ফাইভ প্রডাকশন’-এর। কয়েক বছরের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করেছে তিনটি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী চলচ্চিত্র।
মনীশ যখন প্রযোজনা শুরু করলেন, সবাই ধরেই নিল, তিনি নিশ্চয় বড় তারকাদের নিয়েই সিনেমা তৈরি করবেন। কিন্তু তার উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। তিনি চেয়েছিলেন এমন গল্প বলতে, যেগুলো বড় প্রযোজনা সংস্থাগুলো সাধারণত ভাবে না। এমন নির্মাতাদের পাশে দাঁড়াতে, যাদের গল্প হয়তো শক্তিশালী কিন্তু সমর্থন নেই। তার কাছে সিনেমা হলো ঝুঁকি নেয়ার জায়গা, পরিচিত ফর্মুলায় আটকে থাকার জগৎ নয়।
তারই ফল ‘সালি মোহাব্বাত’ সিনেমাটির কোমল ও পরিচ্ছন্ন স্ক্রিপ্ট। দ্বিতীয় সিনেমা ‘বান টিক্কি’ আবেগঘন পিতা-পুত্রের গল্প, যেখানে সূক্ষ্মভাবে বোনা রয়েছে সমাজের এলজিবিটিকিউ সোসাইটির জন্য এক গভীর বার্তা। তারপর এল ‘গুসতাখ ইশক’। নস্টালজিয়া, ঐশ্বর্য, কবিতা আর আভিজাত্যে ভেজা এক চলচ্চিত্র, যার প্রতিটি ফ্রেমে ধরা পড়ে স্মৃতির গন্ধ আর অতীতের নরম আলো। গত ২৮ নভেম্বর এ সিনেমার প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয় ‘ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল অব ইন্ডিয়া’-তে।
মনীশের জন্য সিনেমা মানে স্মৃতি, শৈশবের দেখা ছবি, ঘরে বাজতে থাকা গান, রোমান্সের ভাষা। তিনি বড় হয়েছেন যশ চোপড়া, বাসু চ্যাটার্জি, শ্যাম বেনেগাল, বিমল রায়, ভি. শান্তারামের সিনেমার নান্দনিকতায়। সে সৌন্দর্য তার কাজের ভেতর অদৃশ্য সুরের মতো লেগে থাকে।
গুসতাখ ইশক তৈরি হয়েছে সেই স্মৃতি থেকেই। উর্দু কবিতা, পুরনো দিনের মুসলিম ঐতিহ্য, আবেগঘন ও মার্জিত প্রেমের গল্প। তার সিনেমায় বিশাল ভরদ্বাজের সংগীত, গুলজারের লেখা, মানুশ নন্দনের ক্যামেরা, রেসুল পুকুট্টির সাউন্ড থেকেই বোঝা যায়, তিনি নির্মাণ শিল্পকে কতটা শ্রদ্ধা করেন। সিনেমায় তিনি এমন সব পুরনো সুরের কথা মনে করিয়ে দেন, যা ‘মুসাফির হু ইয়ারো’ বা ‘নামকিন’-এর মতো ক্ল্যাসিকের কথা মনে করিয়ে দেয়।
অনেকে ভাবেন, সিনেমায় তিনি শুধু কস্টিউম নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু বাস্তবতা তার উল্টো। মনীশ কাস্টিং, এডিট, সংগীত, ভিজুয়াল টোন, আচার-আচরণ, সবকিছুর মধ্যেই যুক্ত থাকেন।
তিনি চান না, তার প্রযোজনা এক ধরনের ছাঁচে আটকে থাকুক। থ্রিলার, পারিবারিক গল্প, ক্ল্যাসিকেল, রোমান্স সবই তিনি করছেন। আগ্রহ আছে পৌরাণিক কাহিনী ও ঐতিহ্যভিত্তিক গল্প নির্মাণেরও। কোথাও এক কোণে পড়ে আছে তার পরিচালনার স্বপ্ন—আভিজাত্য, আবেগ আর রোমান্সে ভরা এক ব্যক্তিগত গল্প।
প্রযোজক হিসেবে বর্তমানে প্রশংসা কুড়ালেও ডিজাইনার হিসেবে তার প্রভাব অশ্রুতপূর্ব। ১৯৯০-এর দশক ছিল ভারতীয় সিনেমার রূপান্তরের সময়, শাহরুখ খান, আমির খান এবং রাম গোপাল ভার্মা, আদিত্য চোপড়া, করন জোহর, ধর্মেশ দর্শন ও ফরাহ খানের মতো নির্মাতাদের উত্থান হয়েছে সেই সময়। সেই যুগে মনীশের ডিজাইন হয়ে ওঠে এক নতুন ভাষা। তিনি কখনো চরিত্রকে শুধু আবেদনময়ী বা সেন্সুয়াস হিসেবে দেখেননি। বরং তিনি দেখেছেন তারা কীভাবে বাঁচে, কী ভালোবাসে, কোন রঙ তাদের ভেতরের মানুষটিকে প্রকাশ করে। এ কারণেই তার পোশাক মানুষের মনে গেঁথে গেছে, চরিত্রকে করে তুলেছে বাস্তব। বলিউডের বহু আইকনিক মুহূর্ত এসেছে তার অনুপ্রেরণায়। ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’-তে কাজলের উজ্জ্বল সবুজ পোশাক কিংবা ‘দোস্তানা’র সেই বিখ্যাত রুপালি শাড়ি সবই তার ভিন্নধর্মী চিন্তারই প্রতিফলন। তিনি বলেন, ‘আইকনিক জিনিস পরিকল্পনা করে হয় না, সেটা নিজেই হয়ে ওঠে।’
পোশাক হোক বা গল্প, মনীশ মালহোত্রা কাজ করেন অনুভবের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকে। ‘স্টেজ ফাইভ প্রডাকশন’ তার সবচেয়ে ব্যক্তিগত, সবচেয়ে সাহসী পথচলা, একই সঙ্গে অতীতের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভবিষ্যতের প্রতি বিশ্বাস।
স্ক্রল ডটইন অবলম্বনে আনিকা চৌধুরী প্রিয়ন্তি










