প্রায় ৪০ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে সে সময়ের কয়েকজন সংগীতশিল্পী মঞ্চে উঠলেন একটি মহৎ উদ্দেশ্যে। দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ নামে সেদিন পরপর দুটি পারফরম্যান্স অনুষ্ঠিত হয়, যা রক ইতিহাসে প্রথম বড়সড় চ্যারিটি কনসার্ট হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

কনসার্টের বীজ বোনা হয়েছিল হাজার হাজার মাইল দূরে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। ১৯৭১ সালের যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে লাখ লাখ মানুষ কঠিন মানবিক সংকটের মুখোমুখি হয়। বিধ্বংসী ১৯৭০ সালের ভোলা ঘূর্ণিঝড় এবং ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অত্যাচারে লাখ লাখ শরণার্থী প্রতিবেশী ভারত সীমান্তে পাড়ি দেয়, যেখানে তারা ক্ষুধা, রোগ ও স্থানচ্যুতির মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়।

এ প্রেক্ষাপটেই বাঙালি বংশোদ্ভূত ভারতীয় ‘সেতার জাদুকর’ পণ্ডিত রবি শংকর তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, জর্জ হ্যারিসনের কাছে এক আন্তরিক আবেদন জানালেন। তিনি হ্যারিসনের কাছে অনুরোধ করলেন এমন কিছু করার জন্য, যা বিশ্বব্যাপী মনোযোগ আকর্ষণ করবে এবং শরণার্থীদের সহায়তার জন্য তহবিল সংগ্রহ করতে সাহায্য করবে।

প্রথমে হ্যারিসন নিজেও স্বীকার করেছিলেন যে তিনি সংকটের পূর্ণ পরিধি সম্পর্কে খুব বেশি জানতেন না। কিন্তু যখন শংকর বাংলাদেশের মানুষের কষ্টের বিবরণ দিলেন, তখন হ্যারিসন দ্বিধা করলেন না।

হ্যারিসন সে সময় বড় কিছু কল্পনা করেছিলেন। তা হলো একটি ‘অল-স্টার কনসার্ট’, যেখানে জনপ্রিয় সংগীত জগতের জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বরা একত্র হয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তহবিল সংগ্রহ করবেন। নিজের প্রতিষ্ঠান, ‘অ্যাপল কর্পসের সহযোগিতায় হ্যারিসন দ্রুত নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেন বুক করলেন, যা বিশ্বের অন্যতম খ্যাতিমান ভেন্যু।

দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ছিল ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সেট, যেখানে রবি শংকর আর তার দীর্ঘদিনের সহযোগী আলি আকবর খান অংশগ্রহণ করেছিলেন। এরপর একে একে মঞ্চ মাতিয়ে তোলেন ‘দ্য বিটলস’-এর সাবেক লিড গিটারিস্ট জর্জ হ্যারিসন। সেদিন মঞ্চে আরো উঠেছিলেন আমেরিকার অন্যতম জনপ্রিয় গায়ক বব ডিলান। অংশগ্রহণ করেছিলেন রিংগো স্টার, এরিক ক্ল্যাপটন, লিয়ন রাসেল ও বিলি প্রেস্টন। এ সংগীতজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত দুটি পৃথক দল বেলা আড়াইটা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত রক, ফোক, ব্লুজ ও হৃদয়গ্রাহী শ্রদ্ধা মিলিয়ে পারফরম্যান্স উপস্থাপন করেছিলেন।

কনসার্টের তাৎক্ষণিক প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলারের টিকিট বিক্রি হয়েছিল। এটি কেবল তহবিল সংগ্রহের প্রথম ধাপ মাত্র ছিল। কনসার্টে রেকর্ড করা একটি লাইভ অ্যালবাম সে বছরের শেষে প্রকাশ হয় এবং তা বিক্রয় তালিকার শীর্ষে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ১৯৭৩ সালে অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার গ্র্যামি পুরস্কার অর্জন করে। পরবর্তী সময়ে এর ডিভিডি রিলিজগুলোও তহবিল সংগ্রহে অবদান রাখে। সব মিলিয়ে অ্যালবাম বিক্রি, বক্স সেট এবং চলমান রিলিজের মাধ্যমে, দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ আনুমানিক ১ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার ত্রাণ তহবিল সংগ্রহ করেছিল।

সম্ভবত কনসার্টের সবচেয়ে বড় অর্জন অর্থ নয়, ছিল বৈশ্বিক সচেতনতা সৃষ্টি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশের সংকট এ কনসার্টের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। এটি অল-স্টার দাতব্য কনসার্টের মডেলকে প্রবর্তন করেছিল, যা পরবর্তী সময়ে লাইভ এড (১৯৮৫), ফার্ম এড ও অসংখ্য অন্য চ্যারিটি-ভিত্তিক সংগীত অনুষ্ঠানকে অনুপ্রাণিত করেছিল।

জর্জ হ্যারিসন (১৯৪৩-২০০১) ‘দ্য বিটল’ নামক ব্যান্ডের লিড গিটারিস্ট হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত। তিনি এমন একজন সংগীতশিল্পী, যার আবেগের গভীরতা আর আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছিল। তার অন্য ব্যান্ডমেটদের তুলনায় হ্যারিসনের শিল্পী জীবন গভীরভাবে পূর্ব দার্শনিকতা, ধ্যান ও সাংস্কৃতিক সংগীত অন্বেষণের সঙ্গে জড়িত ছিল।

ইংল্যান্ডের লিভারপুলে জন্মগ্রহণকারী হ্যারিসন ১৯৬০-এর দশকের শুরুতে ‘দ্য বিটলস’ এর সঙ্গে কাজ করতে শুরু করেন এবং ‘হিয়ার কামস দ্য সান,’ ‘সমথিং’ ও ‘হোয়াইল মাই গিটার জেন্টলি উইপস’-এর মতো ক্ল্যাসিক সংযোজনের মাধ্যমে দলকে সমৃদ্ধ করেন। তবে মঞ্চের বাইরে তার জীবনও কম আকর্ষণীয় ছিল না। ১৯৭০ সালে ‘দ্য বিটলস’ ভেঙে যাওয়ার পর হ্যারিসন একটি সফল সলো ক্যারিয়ার চালিয়ে যান এবং মানবিক কার্যক্রমে আরো গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৭১ সালের শুরুতে রবি শংকরের সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং বাংলাদেশের মানুষের দুঃখ দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে হ্যারিসন ‘বাংলাদেশ’ গানটি রচনা ও প্রকাশ করেন, যা পপ সংগীতের প্রথম চ্যারিটি সিঙ্গেলগুলোর মধ্যে একটি।

জীবনজুড়ে হ্যারিসন মানবিক ও আধ্যাত্মিক কার্যক্রমকে সমর্থন করেছেন এবং তার কাজের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক দূরত্বকে দূর করেছেন। ২০০১ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তবে তার উত্তরাধিকার, বিশেষত ‘জর্জ হ্যারিসন ফান্ড ফর ইউনিসেফ’ (George Harrison Fund for UNICEF)—বিশ্বের সংবেদনশীল শিশু ও সম্প্রদায়কে আজও সমর্থন দিয়ে চলেছে।