বর্তমানকে ছেড়ে আপনি অতীত, ভবিষ্যৎ ও কল্পনার জগতে প্রবেশ করছেন—ডিজনিল্যান্ডে প্রবেশের পর দর্শক প্রথমেই একটি ফলকে কথাটি দেখবেন। ওয়াল্ট ডিজনি ১৯৫৫ সালে ডিজনিল্যান্ড চালু করেন। এটি পার করেছে ৭০ বছর। সাত দশক পরও এর ডিজনিল্যান্ডের অ্যাডভেঞ্চারল্যান্ড, ফ্রন্টিয়ারল্যান্ড, ফ্যান্টাসিল্যান্ড, টুমরোল্যান্ড ও মেইন স্ট্রিট, ইউএসএ এখনো মানুষকে টানে। স্পেস মাউন্টেন ও জঙ্গল ক্রুজের মতো স্মরণীয় আকর্ষণগুলো লাখ লাখ মানুষকে আকৃষ্ট করে।

কিন্তু আজ এদের পাশাপাশি ডিজনি যুক্ত হয়েছে করপোরেট সহমিলনে। বিষয়টি শুনতে কঠিন ও এর মধ্যে কেতাদুরস্ত ভাব থাকলেও জাদুর ছিটে আজও সর্বত্র বিরাজমান। তবে এখন তা পুরো কোম্পানির প্রতিটি বিষয়ের সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ডিজনি এক্সপেরিয়েন্সের চেয়ারম্যান জশ ডি’আমারো এক সাক্ষাৎকারে ভ্যারাইটিকে বলেন, ‘আমি মনে করি, এ সবকিছুর শুরু ৭০ বছর আগে। সে সময় থেকে বিশ্বের ওপর ডিজনির প্রভাব সত্যিই গভীর ছিল এবং এটি গল্প বলার ধারণাকেই সম্পূর্ণভাবে বদলে দিয়েছে।’

১৯৫৫ সালের ফ্যান্টাসিল্যান্ডে ছিল ‘ডাম্বো’ ও ‘স্নো হোয়াইট’-এর মতো অ্যানিমেটেড ডিজনি চলচ্চিত্র থেকে অনুপ্রাণিত রাইড। সেখানে ২০১২ সালে ডিজনি ক্যালিফোর্নিয়া অ্যাডভেঞ্চার একেবারে নতুনভাবে ভক্তদের প্রিয় ডিজনি চলচ্চিত্রগুলোর সঙ্গে সংযোগের সুযোগ করে দেয়। কারস ল্যান্ড—পিক্সারের হিট ছবি ‘কারস’ থেকে অনুপ্রাণিত, রুট সিক্সটি সিক্সের রেডিয়েটর স্প্রিংস শহরটিকে বাস্তব আকারে ফুটিয়ে তোলে।

ডিজনির বিখ্যাত ইম্যাজিনিয়ারিং টিমকে কৃতিত্ব দিয়ে জশ বলেন, ‘আমরা নিরলসভাবে চেষ্টা করছি বৃহৎ পরিসরে, প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডিজনির গল্প বলার। আমাদের টিমটি একটা সৃজনশীল পাওয়ারহাউজ। তারা আমাদের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সঙ্গে এতটাই সংযুক্ত যে সে চলচ্চিত্রগুলো যেন পর্দা থেকে বেরিয়ে বাস্তব জগতে এসে যায়। আপনি যেন সে গল্পের মধ্যে বাস করছেন। সেটাই তো আমাদের ভক্তরা সবচেয়ে বেশি অনুভব করতে চান। এমন কিছু পৃথিবীতে আর নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা যত উন্নত হয়েছি, যত বেশি ভক্তদের চাওয়া শুনেছি, আমাদের গল্প বলার পরিধি ততই বিস্তৃত হয়েছে।’

46

কারস ল্যান্ড চালু হওয়ার পর থেকেই ভক্তরা সে ধরনের আরো দুর্দান্ত অভিজ্ঞতার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছে। ডিজনিল্যান্ডের টিম তা তৈরি করতে সবসময় প্রস্তুত। ২০১৯ সালে ডিজনিল্যান্ড চালু করে স্টার ওয়ার্স: গ্যালাক্সিজ এজ—একটি বিস্তৃত থিম ল্যান্ড। এটি অতিথিদের নিয়ে যায় দূরবর্তী সীমান্ত গ্রহ বাটুতে। সেখানে উপস্থিত থাকে কাইলো রেন, চিউবাকা ও পরবর্তী প্রজন্মের মজাদার রোবট বিডিএক্স ড্রয়ডরা।

এটাই এখনকার ডিজনিল্যান্ডের মূল আকর্ষণ। সেখানে একটি সম্পূর্ণ নতুন জগত তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে ই-টিকিট। এটি ‘স্টার ওয়ার্স’ চলচ্চিত্র ও তার জনপ্রিয় ভিডিও গেম থেকে অনুপ্রাণিত।

জশ বলেন, ‘সবকিছুর শুরু হয় পৃথিবীর সেরা গল্পগুলো বলার মিশন থেকে। সবাই এ উদ্দেশ্যের সঙ্গে একমত এবং আমরা ভীষণ ভাগ্যবান যে এমন একটি ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে পেরেছি। এখানে ব্যবসার পাশাপাশি দর্শকের বিনোদনও নিশ্চিত হয়।’

ডি’আমারো জানান, ডিজনি এক্সপেরিয়েন্সেস ও স্টুডিওর মধ্যে এ সমন্বয় শুরু হয় একেবারে প্রথম দিন থেকেই। তিনি বলেন, ‘আমরা এখন ক্রমাগত আরো পরিণত ও দক্ষ হয়ে উঠছি। এসব ব্যবসাকে একসঙ্গে খুব আগেভাগেই সমন্বয় করার চেষ্টা করছি যেন কোনো গল্পের চিত্রনাট্য বা ধারণা যখন একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে থাকে, তখনই সব ব্যবসায়িক ইউনিট একত্র হয়ে কাজ শুরু করে। ফলে আমাদের ভক্তদের কাছে তা পুরোপুরি নির্বিঘ্ন মনে হবে।’

এ কাজের সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ হলো টিয়ানার বায়ু অ্যাডভেঞ্চার। এটি মূলত ‘প্রিন্সেস অ্যান্ড দ্য ফ্রগ’ চলচ্চিত্র থেকে অনুপ্রাণিত একটি লগ ফ্লুম রাইড। এটি গত বছর স্প্ল্যাশ মাউন্টেনের জায়গায় চালু হয়েছে।

এ নিয়ে জশ বলেন, ‘আমরা জানতাম, আমাদের অতিথিরা টিয়ানাকে আরো বেশি দেখতে চান। আমরা জানতাম, স্প্ল্যাশ মাউন্টেন একটি জনপ্রিয় আকর্ষণ ছিল। আমাদের মনে হয়েছিল, এ দুই বিষয়ের সমন্বয় একটি অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা তৈরি করবে। এটি একটি দুর্দান্ত গল্প বলে এবং নতুন প্রজন্মের ভক্তদের আমাদের থিম পার্কে টেনে আনছে।’

তিনি আরো জানান, রাইডটি এখন ডিজনিল্যান্ড ও ওয়াল্ট ডিজনি ওয়ার্ল্ড উভয় স্থানেই সবচেয়ে জনপ্রিয় আকর্ষণগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।

জশ জানান, ডিজনির পরিকল্পনায় ছিল বেশকিছু বিষয়। যেমন তারা চেয়েছিলেন কেবল সিনেমা-ভিত্তিক নিছক রাইডের বদলে দর্শক, ভক্ত ও ভ্রমণকারীদের এমন একটি অভিজ্ঞতা দেয়া যেখানে তারা নতুন কিছু খুঁজে পাবেন। কল্পনার জায়গা রাখতে চেয়েছেন তারা।

জশ ডি’আমারো বলেন, ‘একটা সময় আমরা মূলত সিনেমায় দেখা গল্পগুলোকে পার্কের ভেতর বাস্তব রূপে উপস্থাপন করতাম। আমার বিশ্বাস কাজটা আমরা দুর্দান্তভাবেই করতাম। কিন্তু আমরা বুঝতে পেরেছি, আমাদের ভক্তদের গল্পের প্রতি এক অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা আছে। তারা চান তাদের প্রিয় গল্পগুলো যেন চলতে থাকে। তাই আমরা এখন একেবারে প্রথম দিক থেকেই চিত্রনাট্যকার ও স্টুডিও পার্টনারদের সঙ্গে কাজ করি। এর মাধ্যমে পর্দার আড়ালের গল্প কিংবা দর্শকের কল্পনার গল্প নিয়ে আসার চেষ্টা করি।’

স্টুডিওর এসব কাজের প্রতিফলন আগামী বছর দেখা যাবে। সেখানে অ্যাভাটার থিমের একটি ল্যান্ড তৈরি করা হবে। ওয়াল্ট ডিজনির কথা স্মরণ করে ডি’আমারো বলেন, ‘ওয়াল্ট বলেছিলেন, ‘‘যতদিন পৃথিবীতে কল্পনা থাকবে, ডিজনিল্যান্ড কখনই সম্পূর্ণ হবে না’’ এবং সেটা আমাদের প্রতিটি ব্যবসায়ের ক্ষেত্রেই সত্যি।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের ইতিহাসে কখনো একসঙ্গে এতগুলো প্রকল্পের কাজ চলমান ছিল না। বর্তমানে আমাদের পরিকল্পনা খুবই উচ্চাকাঙ্ক্ষী। আমরা বিনিয়োগ চালিয়ে যাব, আমাদের ভক্তদের কথা শুনব। তারা যেখানেই থাকুক না কেন, তাদের চমকে দেব ও আনন্দিত করব। এটি ডিজনির ইতিহাসে সত্যিই একটি বিশেষ মুহূর্ত।’ ভ্যারাইটির প্রতিবেদন অবলম্বনে মাহমুদুর রহমান