বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাদের প্রয়াণ সময়কে থামিয়ে দিলেও স্মৃতি ও ভালোবাসা আজও অম্লান। সালমান শাহ ঠিক তেমনই এক নক্ষত্র। মাত্র চার বছরের ক্যারিয়ারে ২৭টি চলচ্চিত্রে অভিনয়—এতেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক অদ্বিতীয় নায়ক। তার মৃত্যুর তিন দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তিনি রয়ে গেছেন দর্শকের হৃদয়ে।

১৯৯৩ সালে"‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবির মাধ্যমে বড় পর্দায় আত্মপ্রকাশ করেন সালমান শাহ। মুক্তির পর থেকেই দর্শক তাকে বরণ করে নেয় নতুন প্রজন্মের নায়ক হিসেবে। রোমান্টিক হিরো, মার্জিত পোশাক, নিজস্ব ঢঙ—সব মিলিয়ে বাংলা সিনেমায় তিনি তৈরি করেছিলেন এক নতুন ধারা। এর আগে এমন আধুনিক, প্রাণবন্ত ও স্টাইলিশ নায়ক দেখেনি দর্শক।

তুমুল জনপ্রিয় হিন্দি সিনেমা ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’-এর অফিশিয়াল রিমেক হওয়ায় গান থেকে শুরু করে কাহিনী–সবকিছুতেই হিন্দি সিনেমাটিকে অনুসরণ করা হয়। নায়িকা হিসেবে ছিলেন সেই সময়ের আনন্দবিচিত্রা ফটোসুন্দরি মৌসুমি। রিমেক হওয়া সত্ত্বেও আমির খানকে অনুকরণ করেননি সালমান। অভিনয়ে ছিল নিজস্বতা। আর সে কারণেই ঢালিউডের ইতিহাসে চতুর্থ সর্বোচ্চ আয় করা সিনেমাটির সে সময়ে আয় হয়েছিল প্রায় ৮ কোটি ২০ লাখ টাকা।

মাত্র চার বছরের ক্যারিয়ারে সালমান শাহ যে অর্জন তৈরি করেছেন, তা আজও বিস্ময় জাগায়। শাবনূরের সঙ্গে তার জুটি ছিল তুমুল জনপ্রিয়। সিনেমা হলে টিকিটের জন্য হাহাকার, রুপালি পর্দায় তার হাসি কিংবা দৃষ্টিতে অগণিত তরুণীর হৃদয়ে ঝড় বয়ে যেত। তাকে বলা হতো ‘ড্রিমবয়’ কিংবা ‘প্রজন্মের নায়ক’।

১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর, সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন এ স্বপ্নের নায়ক। তার প্রকৃত নাম শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন। পরিচালক সোহানুর রহমান সোহানের হাত ধরে রুপালি জগতে প্রবেশ করে হয়ে ওঠেন সালমান শাহ।

কেয়ামত থেকে কেয়ামতের পর ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘দেনমোহর’ ও ‘স্নেহ’ সিনেমায় অভিনয় করেছেন এ জুটি। এরপর ব্যক্তিগত মনোমালিন্যের কারণে জুটি ভেঙে গেলে ১৯৯৪ সালে শাবনূরের সঙ্গে জুটি হয়ে ‘তুমি আমার’ ছবিতে অভিনয় করেন সালমান শাহ। এ জুটিকে সাদরে গ্রহণ করেছিল দর্শক। এরপর একে একে ‘সুজন সখী’, ‘বিক্ষোভ’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘মহামিলন’, ‘বিচার হবে’, ‘তোমাকে চাই’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘জীবন সংসার’, ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’, ‘প্রেম পিয়াসী’, ‘স্বপ্নের নায়ক’, ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘বুকের ভিতর আগুন’ সিনেমা উপহার দিয়ে দর্শকদের হৃদয়ে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিয়েছিলেন তারা।

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মাত্র ২৫ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে চলে যান সালমান শাহ। সেই খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেশজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। ভক্তদের কান্নায় ভেসে গিয়েছিল তার গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকার রাজপথ। তার মৃত্যু ঘিরে এখনো রয়েছে নানা রহস্য ও প্রশ্ন।

সময় গড়িয়েছে, প্রজন্ম বদলেছে। তবু সালমান শাহ এখনো জীবন্ত নাম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিন নতুন নতুন আলোচনা, পুরনো ছবি কিংবা সংলাপ ভাইরাল হয়। গান-সংলাপ রিমিক্সে নতুন প্রজন্মও তাকে চিনে নিচ্ছে নতুন করে।