১৯৪৫ সালে মুক্তি পায় ডেভিড লিন পরিচালিত ব্রিফ এনকাউন্টার। সিনেমাটি প্রথমবার জনসমক্ষে প্রদর্শিত হলে দর্শক হাসিতে ফেটে পড়েছিল। সিনেমাটি মোটেই কমেডি ছিল না। তাই বিষয়টি ছিল একেবারেই অস্বস্তিকর। পরিচালক এতটাই বিব্রত হয়েছিলেন যে তিনি হোটেলে ফিরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, পরদিনই ফিল্ম ল্যাবে ঢুকে সিনেমার নেগেটিভ পুড়িয়ে ফেলবেন।
কিন্তু ৮০ বছর পর দেখা গেছে, ব্রিফ এনকাউন্টারকে দর্শক একেবারেই ভিন্নভাবে গ্রহণ করছে। ট্রেনযাত্রাকে ঘিরে আবর্তিত প্রেমের গল্পের সিনেমাটি ব্রিটিশ সংস্কৃতিতে এতটাই গভীর প্রভাব রেখেছে যে কৌতুক অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে খাবারের বিজ্ঞাপন, সব জায়গায়ই এর ছায়া দেখা যায়।
১৯৯৯ সালে ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের ‘শতাব্দীর ১০০ সেরা ব্রিটিশ চলচ্চিত্র’র তালিকায় এটি স্থান পায় ২ নম্বরে। গ্রেটা গারউইগ একে বলেছেন, ‘সবচেয়ে রোমান্টিক সিনেমা।’ এর মূল দ্বন্দ্ব অপূর্ণ প্রেমের টান, যেখানে দুজন মানুষ কর্তব্যকে সুখের ওপরে স্থান দেয়। এটি হয়ে উঠেছে অনেক শ্রেষ্ঠ প্রেমনির্ভর চলচ্চিত্রের মডেল।’

নির্মাণযাত্রা মোটেই সহজ ছিল না। ১৯৩০-এর দশকের এক কুয়াশাচ্ছন্ন, রোমান্টিক ও আক্ষরিক অর্থে ‘বাষ্পময়’ পরিবেশে গল্পটি এগোয়। সিনেমায় সেলিয়া জনসন অভিনয় করেছেন লরা চরিত্রে। একেবারে সাধারণ চরিত্রের, বিবাহিত, মধ্যবিত্ত নারী সে। একদিন রেলস্টেশনে চোখে ধুলো পড়লে এক পথচারী ডাক্তার, অ্যালেক (ট্রেভর হাওয়ার্ড) তাকে সাহায্য করেন। সেখান থেকেই শুরু হয় এক ঝড়ের মতো প্রেম—যদিও দুজনই জানতেন, এটা তাদের করা উচিত নয়।
নোয়েল কাওয়ার্ডের নাটক স্টিল লাইফ অবলম্বনে এ সিনেমা তৈরি হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন ব্রিটেনে। মঞ্চ থেকে পর্দায় আসার পথে গল্প কিছুটা বদলে যায়। এক বছরের পরকীয়া রোমান্স সংকুচিত হয়ে সাত সপ্তাহের আকুলতায় পরিণত হয়। শুটিং চলাকালীন দলটি শুনতে পায়, টেকনিকালার ক্যামেরাগুলো বাকিংহাম প্রাসাদে পাঠানো হচ্ছে। জনসন স্মরণ করেছিলেন, শুটিংয়ের ফাঁকে সবাই দৌড়ে রেডিওর পাশে গিয়ে দাঁড়াতেন উইনস্টন চার্চিলের কণ্ঠে জার্মানির আত্মসমর্পণের খবর শোনার জন্য।
ফলে সিনেমাটি যখন মুক্তি পেল, তখন এটি হয়ে উঠল এক ‘যুদ্ধকালীন চলচ্চিত্র’, যা যুদ্ধের আগের সময়ের গল্প বলে, কিন্তু দেখা গেল যুদ্ধোত্তর দর্শকের সামনে। হয়তো সে কারণেই এ সিনেমাকে দর্শক শীতলভাবে গ্রহণ করে। সমালোচকদের প্রশংসা সত্ত্বেও এটি বক্স অফিসে কেবল মাঝারি ব্যবসা করেছিল।
অনেকের কাছে সিনেমাটি হয়ে উঠেছিল এক হারিয়ে যাওয়া ‘ব্রিটিশ মর্যাদা’র প্রতীক। এক প্রাক-যুদ্ধকালীন মূল্যবোধের স্মারক। ১৯৪৭ সালে লর্ড মাউন্টব্যাটেন নোয়েল কাওয়ার্ডকে লিখেছিলেন, ‘আমার কোনো সন্দেহ নেই, এ ধরনের চলচ্চিত্রই ব্রিটিশ মর্যাদা পুনর্গঠনে সাহায্য করছে, যা আপাতত ম্লান হয়ে আছে।’
অন্যদিকে অনেক দর্শকের কাছে সিনেমার গল্প ছিল অতিমাত্রায় ব্যক্তিগত। যুদ্ধকালে রেলপথ ও বিদেশে ক্রমাগত চলাফেরার ফলে বাস্তব জীবনেও অসংখ্য ব্রিফ এনকাউন্টারের মতো ঘটনা ঘটেছিল। সেসব প্রেম ও সম্পর্ক হয়তো সিনেমার মতো সংযত ছিল না। তাই সিনেমাটি তখন অনেকের কাছে অপরাধবোধের এক আয়না হয়ে দাঁড়ায়।
তবু বিশেষ কিছু গোষ্ঠীর অগাধ ভালোবাসা সিনেমাটিকে জীবিত রেখেছিল অনেক বছর। ১৯৪৬ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে এটি পুরস্কৃত হয়।
একুশ শতকে, সোফিয়া কপোলা তার ২০০৩ সালের ‘লস্ট ইন ট্রান্সলেশন’-এর জন্য ব্রিফ এনকাউন্টারকে প্রেরণার উৎস হিসেবে উল্লেখ করেন। ওয়ং কার-ওয়াই তার ‘ইন দ্য মুড ফর লাভ’ চলচ্চিত্রেও একই ধরনের থিম অনুসরণ করেন। গল্পে সম্পর্কের ওপর চাপ, সীমাবদ্ধতা এবং সে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও প্রেমের আকাঙ্ক্ষা। এর পরও সিনেমাটির আরো অনুকরণ-অনুসরণ হয়েছে।
৮০ বছর পরও ব্রিফ এনকাউন্টার তার রোমান্টিক সংবেদন, মানসিক দ্বন্দ্ব ও সামাজিক সীমাবদ্ধতার চিত্রণ দিয়ে দর্শকের হৃদয়ে অমর হয়ে আছে। এ সিনেমা প্রমাণ করেছে যে সত্যিকারের প্রেমের অনুভূতি, নিষিদ্ধ আকর্ষণ ও ব্যক্তিগত সংযমের টানাপড়েন কেবল গল্প নয়, বরং মানুষের চেতনার গভীরতম অংশকে স্পর্শ করে। ফলে ব্রিফ এনকাউন্টার কেবল ডেভিড লিন ও নোয়েল কাওয়ার্ডের নয়, বরং সমগ্র চলচ্চিত্র ও দর্শকসমাজের জন্য এক কালজয়ী ক্ল্যাসিক হিসেবে আজও জীবন্ত।
দ্য গার্ডিয়ানের নিবন্ধ অবলম্বনে বাশার খান










