তখন বাসুদেব কৃষ্ণ তাকে বোঝান তার কর্তব্য কী। এরপর অর্জুন অস্ত্র তোলেন, যুদ্ধ করেন। এক জীবনে মানুষ বারবার এ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। কোনোটা ছোট, কোনোটা হয়তো খুব বড়। সে মুহূর্তে সম্পর্ক, ধর্ম আর কর্তব্যের মধ্যে কোনটিকে বেছে নেবে একজন সাধারণ মানুষ? তাদের জীবনে তো কৃষ্ণ থাকে না। সিদ্ধান্ত নিজেকেই নিতে হয়। এমনই এক গল্প নিয়ে হাজির হয়েছেন পুলকিত। সিনেমায় প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন সাইফ আলী খান। ভারতের প্রান্তিক অঞ্চলের রূঢ় বাস্তবতায় একজন মানুষের কর্তব্য পালনের গল্প এটি।

গল্প শুরু হয় উত্তর ভারতের ঝামলিতে। সেখানে পুলিশ অফিসার (এসএইচও) পবনের জন্মদিন পালন করছে তার সহকর্মীরা। এর পরই হাজির হয় একজন সাংবাদিক। সে অন্য কোনো স্থান থেকে এসেছে। তার নিরাপত্তার ভার পবন ও তার টিমের। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়। গভীর রাতে রাস্তার ওপর গুলি করে হত্যা করা হয় সাংবাদিককে। পবনকে সাসপেন্ড করা হয়। সাতদিনের মধ্যে এ কেসের তদন্ত করার কথা জানিয়ে পবন তার সাসপেনশন পিছিয়ে দেয়। কিন্তু এর মধ্যে তার পরিবারেই আরেক সংকট। তার ভাই এক ভিন্ন জাতের মেয়েকে নিয়ে পালিয়েছে। মেয়েটির ভাই অভিযোগ নিয়ে এসেছে। পবনের বাবা চায় দুজনকে খুঁজে বের করে তাদের হত্যা করা হোক। কেননা ওই অঞ্চলে এটাই রীতি।

6

গ্রামের পঞ্চায়েত খুঁজছে পবনের ভাইকে। পবন খুঁজছে ভিন রাজ্য থেকে আসা সাংবাদিকের হত্যাকারীকে। এর মধ্যে নাম আসে স্থানীয় এক আধ্যাত্মিক গুরুর। আনন্দ শ্রী সেখানে দারুণ প্রভাবশালী। তার ডেরায় পুলিশও যেতে পারে না। অভিযোগ আছে, এ ব্যক্তি শিশুদের অপহরণ করে। তদন্ত সূত্রে পবন জানতে পারে হরপাল নামে এক শিশুকে দিয়েই হত্যা করানো হয়েছিল সাংবাদিককে। হরপালকে খুঁজে বের করে আনন্দের হাতে তুলে দেয়ার জন্য পবনকে চাপ দেয় তারই সিনিয়র অফিসার। কিন্তু পবনের মন বলে ছেলেটাকে বাঁচানোই তার কর্তব্য। পবন সে চেষ্টাই করে।

সভ্যতা আসলে কী? এমন প্রশ্নের উত্তর দেয়া কঠিন। প্রযুক্তি, আধুনিক সুবিধাদি, উন্নত শিক্ষা এখন পৌঁছে গেছে অনগ্রসর অঞ্চলেও। কিন্তু সব জায়গায় মানুষ সে অগ্রগতির সঙ্গে নিজেকে মেলাতে পারেনি। ঝামলির বাস্তবতাও একই রকম। পবনের বাবা প্রাচীনপন্থী। তার গ্রামের মানুষও প্রাচীনপন্থী। তারা চায় ভিন জাতের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক না হোক। সিনেমায় দর্শক দেখবেন, রীতিমতো পঞ্চায়েত বসে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এ ‘অপরাধী’ জুটির শাস্তি কী হবে। এমনকি মেয়েটার ভাই সে কথা বলে রসিয়ে রসিয়ে। কেননা তারা মনে করে, এটিই তাদের কর্তব্য। পুরনো অনেক ঘটনারও উদাহরণ টানা হয়। দেখা যায়, সেসব ঘটনা নিয়ে পঞ্চায়েত গর্বিত।

হুমায়ূন আহমেদের একটি গল্প আছে, নিমফুল। এক চোরকে (বা ডাকাত) ধরার পর তার চোখ তুলে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় গ্রামের কর্তারা। এরপর সেখানে চৌধুরীর বাড়িতে রীতিমতো উৎসব লেগে যায়। চোখ তোলা দেখার জন্য হাজির হয় বহু মানুষ। তারা বিষয়টিতে কৌতূহলী হয়, মজা পায়। ‘কর্তব্য’ সিনেমা গল্পটি মনে করিয়ে দেয়। মানুষের পিশাচ হয়ে ওঠাকে তুলে ধরে।

সিনেমায় পবন চরিত্রে অভিনয় করেছেন সাইফ আলী খান। দুর্ঘটনার পর তাকে স্ক্রিনে এই প্রথম দেখা গেল। সাইফ ভালো অভিনয় করেছেন। সাইফের শরীরের গড়ন, ভাষার ব্যবহার পবন চরিত্রটিকে জাস্টিফাই করে। পবনের সহকর্মী অশোকের চরিত্রে অভিনয় করেছেন সঞ্জয় মিশ্র। তিনি বরাবরের মতোই ভালো। পবনের বাবার চরিত্রে জাকির হোসেন। তিনিও ভালো অভিনয় করেছেন। সংলাপ খুব কম, তবে অভিব্যক্তিতে তিনিও তার চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলেছেন। পবনের স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন রসিকা দুগাল।

তবে এ সিনেমার পর আলোচিত হয়েছেন সৌরভ দ্বিবেদী। প্রথম সিনেমায়ই প্রমাণ করেছেন অভিনয়টা তিনি পারেন না। শেখার চেষ্টা ছিল কিনা তা বোঝার উপায় নেই। আনন্দ শ্রী চরিত্রে তার স্ক্রিন টাইম কম ছিল। সংলাপও বেশি নয়। তবে খল চরিত্রের কোনো উপাদানই তার সংলাপ বা অভিব্যক্তিতে ছিল না।

কর্তব্য নিয়ে আলোচনা বা সমালোচনা করার ক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন, এটা ওয়েব ফিল্ম। ওয়েব ফিল্মের ক্ষেত্রে সিনেমার পরিসর তুলনামূলক ছোট হয়। এ সিনেমার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়। শাখা-প্রশাখাবিহীন একটি গল্প নিয়ে সিনেমা। সেখানে প্রধান চরিত্রটি (সাইফ) ভালো অভিনয় করেছেন। গল্পের মূল সুর বা বক্তব্যটিও স্পষ্ট। কর্তব্য পালন করতে গিয়ে পবন শেষ পর্যন্ত তার অপ্রিয় কাজ করতেই বাধ্য হয়। অর্জুনের মতো বড় নায়ক হয়তো সে না, কিন্তু কর্তব্যকেই ধর্মজ্ঞানে সে পালন করে। এটুকু জায়গায় সিনেমাটি তার বক্তব্য ও উদ্দেশ্য পূর্ণ করেছে।

কিন্তু সিনেমা হিসেবে কর্তব্য খুবই সাধারণ। পরিসর বাড়ানোর সুযোগ ছিল। পার্শ্ব চরিত্রগুলোকে আরো প্রাসঙ্গিক করে তোলা যেত। সেসবে যাওয়ার চেষ্টা করেননি পুলকিত বা রেড চিলিজ এন্টারটেইনমেন্ট। অবশ্য ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিতে এটুকুই একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে ধরা যায়। সেখানে এ সিনেমাও একটি কর্তব্য বলেই ধরে নেয়া যায়।