২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায়ের নাম। এ অভ্যুত্থান শুধু রাজপথেই থেমে থাকেনি, তার প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়েছে গানের সুরে, কবিতার ছন্দে, র‍্যাপের শব্দঝংকারে। তরুণদের ভাবনা, ক্ষোভ আর প্রতিবাদ গর্জে উঠেছিল ব্যানার-ফেস্টুন ছাড়িয়ে গানের ভাষায়। স্লোগান আর পোস্টারের পাশাপাশি চলেছে গান—যা কখনো রক্তমাখা আর্তি, আবার কখনো শেকলভাঙার বজ্রধ্বনি। জুলাই আন্দোলনে র‍্যাপ গানের যে বিস্ফোরণ ঘটেছে, তা বাংলাদেশের সংগীত ইতিহাসে বিরল। অন্তত ৪০টির বেশি র‍্যাপ গান প্রকাশ পেয়েছে আন্দোলনের সময়, যা রাজপথের তরুণদের মুখে মুখে ফিরেছে। নারায়ণগঞ্জের তরুণ র‍্যাপার সেজানের ‘কথা ক?’ গানটি সামাজিক মাধ্যমে ঝড় তোলে—‘আমার ভাই-বইন মরে রাস্তায়, তর চেষ্টা কইরে? কথা ক?’—এই একটি প্রশ্নই যেন বহন করছিল হাজারো নির্যাতিত কণ্ঠের জবাবহীনতা। এক সময়কার ‘শূন্য’ ব্যান্ডের গান ‘শোনো মহাজন’ এক দশক পর নতুন প্রাণ পায় এ বিপ্লবে। ২০১৪ সালের ‘ভাগো’ অ্যালবামের গানটি যেন জুলাই আন্দোলনে পুনর্জন্ম লাভ করে। গায়িকা পারশা মাহজাবীন মাত্র ১০ মিনিটে লিখে-সুর করে ফেলেন ‘চলো ভুলে যাই’—আন্দোলনের আবেগঘন সময়ে যে গান কান্না হয়ে নেমে আসে বহু শ্রোতার মনে। হান্নান হোসাইন লিখেছিলেন ‘আওয়াজ উডা’—যা আন্দোলনের স্লোগানে রূপ নেয়। তবে গানটির জন্য তাকে হুমকি, গ্রেফতার, এমনকি ১২ দিনের কারাবাসও পোহাতে হয়েছে। আন্দোলনে আরো সরব ছিলেন সংগীতশিল্পী ফারজানা ওয়াহিদ সায়ান (‘ভয় বাংলায়’), অনি হাসান (‘আমরা বীর’), শহরতলী ব্যান্ডের সোহাগসহ (‘ও প্রধান’) অনেকেই। এছাড়া জনপ্রিয় শিল্পীদের গাওয়া ‘হৃদয় আমার বাংলাদেশ’ ও ‘দেশটা তোমার বাপের নাকি’ গান দুটিও পেয়েছে অভাবনীয় জনসমর্থন। এমনকি কাজী নজরুল ইসলামের ‘এই শিকল পরা ছল’ নতুন করে পরিবেশন করেন শেখ ইশতিয়াক, রায়েফ রাফা প্রমুখ শিল্পীরা।

জুলাই আন্দোলন শুরুতে কোটা সংস্কার আন্দোলন হলেও তা দ্রুত রূপ নেয় সর্বজনীন গণ-আন্দোলনে। স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে, বাকস্বাধীনতা ও মর্যাদার দাবিতে মানুষ নেমে আসে রাজপথে। এ গণজাগরণে গান হয়ে ওঠে লড়াইয়ের অস্ত্র, প্রতিবাদের সবচেয়ে কার্যকর ভাষা। এ গানগুলো কেবল সংগীত নয়—এগুলো হয়ে উঠেছে আন্দোলনের দলিল, আত্মমুক্তির শপথ। এ গানগুলো ভবিষ্যতের সংস্কৃতির ভিত হয়ে দাঁড়াবে—যেখানে প্রতিটি সুর গাইবে ন্যায়ের পক্ষে, উচ্চারণ করবে মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।