বহুদিনের নীরবতা ভেঙে পর্দায় প্রথমবারের মতো শোনা যায় বাংলা ভাষার সংলাপ। সেই সঙ্গে ভেসে আসে এক কোমল, হৃদয়স্পর্শী কণ্ঠ—মাহবুবা রহমান। ‘মনের বনে দোলা লাগে’ গানটি হয়ে ওঠে এক নবজাত চলচ্চিত্র সংস্কৃতির প্রথম স্পন্দন। সে স্পন্দনের কেন্দ্রে ছিলেন তিনি। মাহবুবা রহমান এমন একজন শিল্পী, যিনি নিজের কণ্ঠ দিয়ে এক ইতিহাসের সূচনা করেছিলেন, অথচ নিজে থেকে গেছেন আড়ালে, প্রায় বিস্মৃত।

ব্রিটিশ শাসনামলে চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করা মাহবুবা রহমান শৈশবেই সংগীতের দীক্ষা নেন গিরিন চক্রবর্তী, সুরেন চক্রবর্তী ও সুধীরলাল চক্রবর্তীর মতো গুণী শিল্পীদের কাছে। তার সংগীত জীবনের আনুষ্ঠানিক সূচনা ১৯৪৭ সালে। মাত্র ১২ বছর বয়সে অল ইন্ডিয়া রেডিওর ঢাকা কেন্দ্র থেকে প্রথম গান সম্প্রচারের মধ্য দিয়ে তিনি সংগীত জগতে প্রবেশ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের অস্থির সময়ের ভেতর শিল্প-সংস্কৃতি ছিল অনিশ্চিত। ওই সময়ে নারীদের জন্য সংগীতচর্চা ছিল আরো প্রতিকূল। ঠিক তখনই কিশোরী মাহবুবা রহমান নিজের কণ্ঠকে আশ্রয় করে জনসমক্ষে উঠে আসেন। এটি ছিল প্রতিভার পাশাপাশি এক অসীম সাহসের প্রকাশ।

পঞ্চাশের দশকের পূর্ববাংলায় পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র শিল্প তখনো গড়ে ওঠেনি। তখন রেকর্ডিং স্টুডিও ছিল সীমিত, প্রযুক্তিও ছিল অনুন্নত। সাংস্কৃতিক কাঠামো ছিল একেবারেই প্রারম্ভিক পর্যায়ে। সংগীতচর্চা আবদ্ধ ছিল মূলত রেডিও, মঞ্চ ও লোকজ ধারার ভেতর। এ বাস্তবতায় একজন নারী শিল্পীর জন্য পথ নির্মাণ মানে ছিল প্রতিনিয়ত নিজেকে প্রমাণ করা। মাহবুবা রহমান সেই কঠিন পথেই হেঁটেছিলেন।

তিনি কেবল শুধু সুর পরিবেশন করতেন না, সময়কেও ধারণ করতেন। ‘মনের বনে দোলা লাগে’ যেমন সরল, তেমনই গভীর একটি গান। এর সুরে নির্মলতার সঙ্গে মিশে আছে আত্মপ্রকাশের সাহস। ‘নিরালা রাতের প্রথম প্রহরে’ গানটি তিনি নিঃসঙ্গতাকেই শুধু প্রকাশ করেননি, অনুভব করিয়েছেন। ‘আমার যদি থাকত পাখির ডানা’-য় ধরা পড়ে মুক্তির এক গভীর আকাঙ্ক্ষা, আর ‘সোনালী এ ধানের ক্ষেতে’ গানটিতে তার কণ্ঠ মাটির সঙ্গে মিশে গিয়ে গ্রামীণ জীবনের গন্ধ, মানুষের ছন্দ ও প্রকৃতির সৌন্দর্যকে জীবন্ত করে তোলে। মাহবুবা রহমানের জীবনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক তার সাফল্য নয়, তার সংগ্রাম। ‘মুখ ও মুখোশ’ থেকে শুরু করে ‘জাগো হুয়া সাভেরা’, ‘আসিয়া’, ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’, ‘সাত ভাই চম্পা’ এ চলচ্চিত্রগুলোয় তার কণ্ঠ এক অদৃশ্য ভিত্তি নির্মাণ করেছে।

জীবনের শেষ অধ্যায়ে তিনি ক্রমেই জনজীবনের কোলাহল আর মিডিয়ার আলো থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাকে রাষ্ট্রীয় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করে। ২৬ মার্চ রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ৯২ বছর বয়সে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।