বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ এ চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নেয় বাংলাদেশের সিনেমা ‘মাস্টার’। উৎসবের বিগ স্ক্রিন কমপিটিশন বিভাগে ১২টি সিনেমার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে শীর্ষ পুরস্কার অর্জন করে এ সিনেমা। মাস্টার পরিচালনা করেছেন নির্মাতা রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিত। সিনেমাটির নির্মাণ, রটারড্যামে পুরস্কার প্রাপ্তি ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে এ নির্মাতা কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অহিদুর রহমান

রটারড্যাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের বিগ স্ক্রিন কমপিটিশনে শীর্ষ পুরস্কার অর্জনকে আপনি ব্যক্তিগত ও পেশাগতভাবে কীভাবে দেখছেন?

সম্প্রতি রটারড্যাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ৫৫তম আসরে আমার দ্বিতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা মাস্টার বিগ স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ড জিতেছে। এটি আমার ব্যক্তিগতভাবে অনেক বড় একটি অর্জন, অন্যদিকে এটি পেশাগত ও সামষ্টিক অর্জনও এ অর্থে, আমার সঙ্গে আমার অসাধারণ কাস্ট এবং ক্রু সদস্যরা ছিলেন। যারা আমার সঙ্গে রটারড্যামে গিয়েছিলেন, তাদের পাশাপাশি যারা পেছন থেকে সাপোর্ট করেছেন এবং টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী, মধুপুর, এমনকি জামালপুরেও আমরা শুট করেছি, সেখানে যারা আমাদের চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন তাদের সবার সমর্থন আমাদের সঙ্গে ছিল। তাই এটি আমাদের পুরো টিমের অর্জন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সিনেমার জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন বলে আমি মনে করি।

রটারড্যাম উৎসবে অংশ নেয়ার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল? কোনো বিশেষ মুহূর্ত কি রয়েছে, যা আলাদা করে মনে রাখার মতো?

রটারড্যাম চলচ্চিত্র উৎসব বিশ্বের অন্যতম প্রধান চলচ্চিত্র উৎসবগুলোর একটি। এ উৎসব নতুন ট্যালেন্টকে খুঁজে নেয় এবং নতুন ভয়েস আবিষ্কার করতে চায়। পৃথিবীতে খুব কম ফেস্টিভ্যাল আছে, যারা এত ইউনিক প্রোগ্রামিং করে। ইউনিক প্রোগ্রামিং এবং ডিসকভারি মোডে অপারেট করা এ দুই বৈশিষ্ট্যের জন্য রটারড্যাম চলচ্চিত্র উৎসব খুবই নামকরা।

এ উৎসবে আমাদের মতো যারা নতুনভাবে গল্প বলার চেষ্টা করছে, সে রকম নির্মাতারা আরো অনেকে ছিলেন। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তারা এসেছিলেন। বিগ স্ক্রিন কমপিটিশনে ছিল ১২টি সিনেমা, পাশাপাশি টাইগার কমপিটিশনেও ১২টি সিনেমা ছিল।

ফেস্টিভ্যালের পরিচালক আমাদের জানিয়েছেন, কেন তারা মাস্টার সিনেমাটি সিলেক্ট করেছেন। একজন ব্যক্তি ক্ষমতা পেয়ে কীভাবে পরিবর্তিত মানুষ হয়ে যায়, গল্পটি তাদের কাছে ভীষণ প্রাসঙ্গিক এবং বৈশ্বিক মনে হয়েছে। এটি সরাসরি শুনে আমার খুব ভালো লেগেছে। এটি একটি বিশেষ মুহূর্ত ছিল।

এছাড়া প্রচুর সিনেমা দেখেছি এবং বিভিন্ন নির্মাতার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছে। মনে রাখার মতো একটি অভিজ্ঞতা হলো, স্ক্রিনিং শেষে ইরানি চলচ্চিত্র নির্মাতা Mohammad Rasoulof–এর সঙ্গে আমার কথা হয়। তিনি শুনে খুব খুশি হন যে আমি বাংলাদেশ থেকে একজন নির্মাতা হিসেবে এসেছি এবং কমপিটিশন বিভাগে অংশ নিচ্ছি। তিনি বলেন, ‘এটি একটি দারুণ ফেস্টিভ্যাল, এখানে চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সিনেমা এবং তাদের নিজস্ব স্বরের প্রতি বিশেষ যত্ন নেয়া হয়।’ তিনি আমাকে বলেন যে আমি ঠিক জায়গায়ই আছি। এটি শুনে আমি ভীষণ অনুপ্রাণিত হয়েছি।

মাস্টারের প্রযোজনা, চিত্রনাট্য ও পরিচালনা সব দায়িত্ব নিজেই সামলেছেন। এ বহুমুখী দায়িত্ব পালন কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিল?

চিত্রনাট্য, পরিচালনা ও প্রযোজনা এ তিন দায়িত্ব একা পালন করা আসলেই খুব কঠিন একটি চ্যালেঞ্জ। আমি শুরুতে প্রযোজক খুঁজেছি, কিন্তু উপযুক্ত প্রযোজক না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত নিজেকেই প্রযোজনার দায়িত্ব নিতে হয়েছে। তবে চিত্রনাট্য লেখার ক্ষেত্রে আমার একজন সহলেখক ছিলেন। পরিচালনার দায়িত্ব তো ছিলই।

কাজের সময় অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জ এসেছে। কোনো দৃশ্য পরিকল্পনা অনুযায়ী করা সম্ভব হচ্ছে না, তখন পরিচালকের হ্যাট খুলে প্রযোজকের হ্যাট পরতে হয়েছে। আবার কোনো নির্দিষ্ট লজিস্টিক বা রিসোর্স পাওয়া যাচ্ছে না, সেক্ষেত্রে পরিচালকের হ্যাট খুলে চিত্রনাট্যকারের হ্যাট পরে নতুন করে দৃশ্য লিখতে হয়েছে। এ মাল্টিটাস্কিং সহজ ছিল না।

মাস্টার সিনেমার নির্মাণ প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কোনটি ছিল এবং কীভাবে তা মোকাবেলা করেছেন?

মাস্টার একটি পলিটিক্যাল থ্রিলার ঘরানার সিনেমা। রাজনীতির ক্যানভাস সাধারণত বড় হয়। যদিও গল্পটি উপজেলা পর্যায়ে , তার পরও এর ক্যানভাস ছিল বিস্তৃত। অনেক চরিত্র, অনেক মানুষের অংশগ্রহণ সব মিলিয়ে একটি জটিল কাঠামো।

টাঙ্গাইলে যখন আমরা কাজ করেছি, ঢাকা থেকে কিছু অভিজ্ঞ ও পরিচিত অভিনেতা গিয়েছিলেন। কিন্তু প্রায় ৭০-৭৫ শতাংশ অভিনেতাই ছিলেন নন-প্রফেশনাল। তাদের অভিনয়ের পূর্ব অভিজ্ঞতা বা ট্রেনিং ছিল না। একই দৃশ্যে প্রশিক্ষিত অভিনেতা এবং নন-প্রফেশনাল অভিনয়শিল্পীরা একসঙ্গে ছিলেন। যদি তাদের পারফরম্যান্স একই ফ্রিকোয়েন্সি ও রিদমে না আসে, তাহলে দৃশ্য কার্যকর হবে না—এটাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

আমরা সবার জন্য আলাদা আলাদা প্রস্তুতি নিয়েছি। ওয়ার্কশপ করেছি, রিহার্সাল করেছি, চরিত্র বোঝাতে সময় দিয়েছি। তার পরও কিছু দৃশ্যের ক্ষেত্রে বারবার টেক নিতে হয়েছে। ধৈর্য ও সমন্বয়ের মাধ্যমে আমরা বিষয়টি সামাল দিয়েছি।

আপনার পরবর্তী কাজ?

এ মুহূর্তে আমি আমার তৃতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য কাজ ‘তুফান আইতেছে’-র পোস্ট-প্রডাকশনের কাজ করছি। পাশাপাশি ফিকশনে একটি বড় সিনেমা নির্মাণের ইচ্ছা আছে এ বছর।