গুণী নির্মাতা কামার আহমাদ সাইমন। সেন্সর বোর্ডে প্রায় দুই বছর আটকে থাকার পর ১১ জুলাই প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় এ নির্মাতার ‘জলত্রয়ী’র দ্বিতীয় সিনেমা ‘অন্যদিন’। ইডফা, কান, লোকার্নো, সান্ড্যান্সসহ বিশ্বের প্রথম সারির চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয় সিনেমাটি। এ সিনেমা ও নেপথ্যের গল্প নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন নির্মাতা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অহিদুর রহমান
দুই বছর সেন্সরে আটকে থাকার পর আপনার নির্মিত সিনেমা অন্যদিন ১১ জুলাই দেশে মুক্তি পেয়ে এরই মধ্যে সাতদিন প্রদর্শিত হয়েছে। আটকে যাওয়া সিনেমাটি দর্শক দেখতে পেল। কেমন লাগছে?
সেন্সরে ছিল দুই বছর, তার আগে সেলফ-সেন্সরে ছিল আরো দুই বছর, মোট চার বছর। আমস্টারডামের তুসিন্সকি থিয়েটারে ইডফার মূল প্রতিযোগিতায় সিনেমাটি প্রিমিয়ার হয়েছিল ২০২১-এর নভেম্বরে। সে শোয়ে সরকারের পদস্থ কয়েকজন ব্যক্তি এসেছিলেন। সিনেমাটি দেখে তারা ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন, কিন্তু একই সঙ্গে আবার সিনেমাটি সেন্সর পাবে না বলেও আশঙ্কা জানিয়েছিলেন। যে কারণে সেন্সরে জমা দিতে আমরা নিজেরাই দুই বছর দেরি করি।
এছাড়া এটি ঠিক প্রচলিত অর্থে ছবি মুক্তি না। জুলাইকে উৎসর্গ করে সাতদিনে সাতটা বিশেষ প্রদর্শনী বলতে পারেন। সিনেমাস্কোপে ডলবি ৫.১ সাউন্ড সিস্টেমে বড় পর্দায় থিয়েট্রিক্যাল সেটআপে এরপর ছবিটা আর হয়তো দেশে দেখা যাবে না। এ ছবির ভিজ্যুয়াল ক্যানভাস বা সাউন্ডস্কেপ বোঝার জন্য এটি জরুরি ছিল। কিছু দর্শক অন্তত সিনেমাটির সে স্বাদটা পেলেন।
সিনেমাটি মাত্র সাতদিনের জন্য মুক্তি দেয়ার অর্থ কী ছিল?
আমাদের এখানে সাধারণ দর্শক পোস্টারে তারকা মুখ দেখে হলে যান। কিন্তু ‘অন্যদিন’-এ সে রকম ‘ব্যাংকেবল আর্টিস্ট’ নেই। আমাদের প্রদর্শনীটা অনেকটা শিল্পকলায় নাটক বা বেঙ্গলের এক্সিবিশন দেখতে যাওয়ার মতো। তাই নির্দিষ্ট দর্শকের জন্য সাতদিনে সাতটা প্রদর্শনী।
অন্যদিন জুলাইকে কেন উৎসর্গ করলেন?
জুলাইয়ের আগে এ ছবি নিষিদ্ধ ছিল। আবার জুলাইয়ের কারণেই এ ছবি সেন্সর ছাড়পত্র পেল। সে কারণেই জুলাইকে উৎসর্গ করা। জুলাই একটা অনেক বড় ঘটনা, আমাদের জাতীয় জীবনে এর প্রভাব অন্তত আগামী কয়েক দশক থাকবে।
অনেক সময় নিয়ে সিনেমাটি বানানো, পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পুরস্কার পাওয়া। যখন এমন একটি সিনেমা আটকে দেয়া হলো তখনকার অনুভূতি কেমন ছিল?
ছবি আটকানো মানে একজন নির্মাতাকে গুম করে দেয়া। এত খারাপ লেগেছিল যে একসময় ভাবা শুরু করেছিলাম আর ছবিই বানাব না।
সবচেয়ে খারাপ লেগেছিল আমাদের শিল্পী সমাজের অবস্থা দেখে। সব দেশে, সব সমাজেই অন্যায় হয়। কিন্তু যে সমাজে শিল্পী-বুদ্ধিজীবীরা সে অন্যায়ের প্রতিবাদে শামিল হন না, সে সমাজের অন্যায়ের ভাগ তাদের কাঁধেও এসে পড়ে।
ঠিক কী অভিযোগে সিনেমাটি আটকে দেয়া হয়েছিল ২০২৩ সালে?
নির্দিষ্ট একটা বা দুইটা অভিযোগ না। প্রায় পুরা ছবিটা নিয়েই তাদের অবজারভেশন দিয়েছিল। এটি যেহেতু একটা রূপক ছবি, গত এক দশকের একটা মানচিত্র পাওয়া যায় ছবিতে। আমি যদিও শুধু সময়টাকে ফ্রেম করেছিলাম, সময়ের কুশীলবদের হয়তো সেটা পছন্দ হয়নি। ক্ষমতা মানুষকে অন্ধ করে দেয়, ক্ষমতায় থাকা মানুষ আয়না দেখতে চায় না, এ রকম কিছু হবে হয়তো।
সিনেমাটি এত সময় নিয়ে নির্মাণের কারণ কী ছিল?
এ ছবির এমন একটা ডিপার্টমেন্ট নেই, যেটা প্রচলিত সংজ্ঞায় কাজ করে। তাই প্রত্যেকটা বিষয় কনসেপ্ট থেকে স্ক্রিপ্ট, প্রি-প্রডাকশন, প্রডাকশন ডিজাইন, সেট, সাউন্ড, কাস্টিং, শুটিং, পোস্ট প্রতিটি জায়গায় প্রচলিত ধ্যানধারণাকে চ্যালেঞ্জ করতে হয়েছে। সেটা করতে গিয়েই সময়টা লেগেছে।
অন্যদিন সিনেমাটির দ্বারা সাধারণ দর্শক ও সমাজে কেমন প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন?
সেটা ক্রিটিকরা ভালো বলতে পারবেন। সিনেমার অ্যাঙ্গেল থেকে দেখলে ‘শুনতে কি পাও!’ এর পর ভেবেছিলাম নির্মাতাদের ন্যারেটিভ চিন্তায় প্রভাব ফেলবে। কিন্তু তেমন একটা ফেলেনি, শুধু ক্যামেরার ল্যাঙ্গুয়েজটা চেঞ্জ হয়েছিল। অন্যদিনে আরেকটা সম্ভাবনা আছে, শুধু ন্যারেটিভ না, সিনেমার ল্যাঙ্গুয়েজ বা ফর্মকে নতুনভাবে দেখার ক্ষেত্রে তরুণ নির্মাতাদের হয়তো অন্যভাবে ভাবার খোরাক জোগাতে পারে।
একজন সাধারণ দর্শক অন্যদিন কেন দেখবেন?
পর্দায় নিজেকে দেখার জন্য।
শিকলবাহা কবে মুক্তি পাচ্ছে? আপনার পরবর্তী নির্মাণ নিয়ে যদি জানাতেন।
‘শিকলবাহা’ জমা দেয়ার পর প্রায় এক বছর আটকে ছিল। এরপর অন্যদিন জমা দিলে সেটা আটকে শিকলবাহা ছেড়ে দিল। তখন তাই শিকলবাহা মুক্তির কাজ শুরু করেছিলাম। এশিয়ার বৃহত্তম চলচ্চিত্র আসর সাংহাইয়ে মেইন কম্পিটিশন গোল্ডেন গবলেটে ২০২৪-এর জুনে প্রিমিয়ার করল শিকলবাহা। কিন্তু ফিরে এসেই দেশে জুলাই শুরু হয়ে গেল। এরপর দুই মাস আগে হঠাৎ অন্যদিন ছাড়পত্র পেল। তাই এখন অন্যদিন নিয়ে কিছু পরিকল্পনা আছে, এগুলো শেষ করে শিকলবাহার কাজ শুরু করব।
যে সেন্সর আপনার সিনেমাটিকে আটকে দিয়েছিল, জুলাই আন্দোলনের পর সে সিস্টেমের বিলুপ্তি ঘটিয়ে সার্টিফিকেশন সিস্টেম চালু হয়। এতে কি চলচ্চিত্র নির্মাতাদের স্বাধীনতা বাড়বে?
কিচ্ছু পাল্টাবে না। জেলখানার নাম সরাইখানা দিলে তো আর সেটা সরাইখানা হয়ে যায় না। এখানেও একই অবস্থা। ২০২২ সালের প্রস্তাবিত নীতিমালাই রয়ে গেছে, সেন্সর ইতিহাসের ১০০ বছরে সবচেয়ে ভয়ংকর নীতিমালা এটা।










