জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী অভিনেত্রী রুনা খান। তিনি প্রতিনিয়ত নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করছেন। সম্প্রতি তিনি ‘চলচ্চিত্র দ্য সিনেমা’য় নায়িকা হিসেবে যুক্ত হয়েছেন। পাশাপাশি তার অভিনীত ‘বক’, ‘দাফন’ ও ‘লীলা মন্থন’ সিনেমাগুলো মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে। রুনা খান তার নতুন সিনেমার চরিত্র, ক্যারিয়ারসহ নানা বিষয় নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অহিদুর রহমান

সম্প্রতি ‘‌চলচ্চিত্র: দ্য সিনেমা’ নামক চলচ্চিত্রে অভিনয় করছেন। সিনেমাটি সম্পর্কে এবং এতে আপনার চরিত্র নিয়ে কিছু জানতে চাই।

চলচ্চিত্র: দ্য সিনেমায় আমি চুক্তিবদ্ধ হয়েছি অভিনয় শিল্পী হিসেবে। শুটিংয়ের তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ সিনেমায় যে চরিত্রে কাজ করতে যাচ্ছি, সে একজন সিনেমার জনপ্রিয় নায়িকা।

এ সিনেমার মাধ্যমে দর্শক রুনা খানকে একেবারেই নতুন আঙ্গিকে দেখবে, আপনি কী মনে করেন?

এমন চরিত্রে আমি আগে কখনো অভিনয় করিনি। এটি একজন অভিনেত্রী হিসেবে আমার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ। সিনেমায় একজন জনপ্রিয় নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করতে যাচ্ছি। সিনেমায় ওই অভিনেত্রীর পর্দার জীবনের চেয়ে ব্যক্তি জীবনের সংগ্রাম, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির নানা দর্শন, অর্থাৎ অভিনেত্রীর ব্যক্তি জীবনের অংশটি বেশি গুরুত্ব পাবে। ঠিকভাবে করতে পারলে দর্শক আমাকে সিনেমায় অবশ্যই নতুনভাবে দেখতে পাবেন। তবে এ সিনেমার চরিত্রের জীবনের যে জার্নি বা দর্শন, তার সঙ্গে ব্যক্তি রুনা খানের জার্নি বা দর্শনের কোনো মিল নেই।

সিনেমায় যুক্ত হলেন কীভাবে?

সিনেমাটির পরিচালক আলি জুলফিকার জাহেদী আমার নাম্বার বিদ্যা সিনহা মিমের কাছ থেকে নিয়ে আমাকে হোয়াটসঅ্যাপে একটি টেক্সট পাঠালেন যে তিনি একটি সিনেমার চরিত্রের ব্যাপারে আমার সঙ্গে কথা বলতে চান। তারপর আমি বললাম, আমাকে সিনোপসিস পাঠান। তিনি আমাকে সিনোপসিস পাঠালেন। আমার পছন্দ হলো। এরপর আমার বাসায় এসে সিনেমার গল্প ও চরিত্র নিয়ে আমার সঙ্গে আলোচনা করলেন। আমার চরিত্র ও গল্প পছন্দ হওয়ার পর সিনেমায় অভিনেত্রী হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হলাম।

আপনার অভিনীত ‘বক’, ‘দাফন’, ‘লীলা মন্থন’ সিনেমা আর এগুলোয় আপনার চরিত্র সম্পর্কে সংক্ষেপে জানতে চাই।

বক সিনেমার নির্মাতা মাসুদ পথিক। বক মূলত জীবনানন্দ দাশের ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতার ছায়া অবলম্বনে নির্মিত। সিনেমায় প্রকৃতি, জীবন ও নারীর সংগ্রামের গল্প বলা হয়েছে। এ সিনেমায় আমার চরিত্রের নাম শবিতা। তার স্বামী একজন বক শিকারি। শবিতা একজন গৃহবধূ, যার ছোট ছোট দুটি সন্তান আছে। বক শিকার করে তার স্বামী যে উপার্জন করে, তা দিয়ে সংসার চলে না। বহুদিন তাদের বাড়িতে চুলায় হাঁড়ি চড়ে না, খেতে-পরতে পারে না। এ প্রান্তিক পরিবারের জীবনের গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে বক।

দাফন সিনেমার নির্মাতা কৌশিক শংকর দাস। এতে আমার চরিত্রের নাম কুলসুম। কুলসুম একজন গৃহকর্মী। সিনেমাটিকে বলা যায় কুলসুমের জীবনকাহিনী। দাফন একটি সত্যি ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত। এটি কৌশিক শংকরের ব্যক্তিজীবনের পরিচিত এক নারীর গল্প।

লীলা মন্থন সিনেমায় যে চরিত্রে কাজ করেছি সে এমন একজন নারী, যার স্বপ্ন, মা হওয়া, সন্তান ধারণ ও জন্ম দেয়া। তিনটি সন্তানই জন্মের পর পর মারা যায়। পরে জানা যায়, প্রসবের পর তার সন্তান মারা যাওয়ার পেছনে শিশু পাচারকারী চক্র জড়িত, যার মূল হোতা তার স্বামী। সিনেমাটি আমাদের দেশের শিশু পাচার, বিভিন্ন বড় সংগঠন ও হাসপাতালে কর্মীদের যোগসাজশের তথ্যের ভিত্তিতে চিত্রনাট্য করা হয়েছে।

জাপানের টোকিও চলচ্চিত্র উৎসবে আপনার অভিনীত ‘নীল পদ্ম’ সিনেমাটি শ্রেষ্ঠ ফিচার ফিল্ম জিতেছে। এ অর্জন নিয়ে আপনার অনুভূতি কী?

এ অর্জন অবশ্যই আনন্দিত হওয়ার মতো ঘটনা। সে সময় আমি দেশে ছিলাম না, আমেরিকায় ছিলাম। পরিচালক আমাকে মেইল করে তথ্যটি জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আমাদের বাংলা সিনেমা পুরস্কৃত হয়েছে, সম্মান বয়ে এনেছে এবং আমি সেই সিনেমার অভিনেত্রী। এটি অবশ্যই অনেক ভালো লাগার এবং আনন্দের।

এ পুরস্কারের ফলে আপনার ক্যারিয়ারে নতুন কোনো দিক খুলেছে বলে মনে করছেন?

পুরস্কারপ্রাপ্তির ফলে ক্যারিয়ারে নতুন কোনো দিক উন্মোচন হতে পারে, এমন কিছু আমার মনে হয় না। তবে যেকোনো কাজের জন্য যখন পুরস্কার পাওয়া যায়, তা জাতীয় হোক বা আন্তর্জাতিক, ভালো লাগার সঙ্গে তখন আরো একটি জিনিস যোগ হয়, তা হলো দায়িত্ববোধ। এটি হলো আরো ভালো কাজ করার চেষ্টা করা। আমি বিশ্বাস করি, যতদিন বেঁচে আছি, সুস্থ আছি, ভালো কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকতে চাই। এমন পুরস্কারে এ বোধ আরো শক্ত হয় যে আমাকে মন দিয়ে কাজটি করতে হবে।

নীল পদ্ম সিনেমায় সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং ব্যাপারটি কী ছিল?

নীল পদ্ম সিনেমায় আমি যে চরিত্রে অভিনয় করেছি, তার নাম নীলা। সে একজন যৌনকর্মী। এমন চরিত্রে আমি প্রথমবার কাজ করেছি। এ কাজের সুবাদে প্রথমবার দৌলতদিয়ায় শুটিং করতে গিয়েছিলাম। সিনেমার একটি বড় অংশ শুটিং হয়েছে দৌলতদিয়ায়। প্রতিটি চরিত্রই চ্যালেঞ্জিং। চ্যালেঞ্জ ছিল ক্যামেরার সামনে কাজ করার পর ওটিটি, টিভি বা সিনেমার পর্দায় দেখলে চরিত্রটি বিশ্বাসযোগ্য হবে কিনা। এ চ্যালেঞ্জ নীল পদ্মের ক্ষেত্রেও ছিল।

যদি অভিনয় না করতেন, তাহলে কোন পেশায় নিজেকে কল্পনা করতেন?

অভিনয় না করলে কী করতাম, সেটা বিশেষভাবে ভাবা হয়নি। আমি যখন মাধ্যমিকে পড়তাম, তখন নাটক ও সিনেমার পোকা ছিলাম। বড় হয়েছি টাঙ্গাইল জেলার সখিপুরে। সে সময় সখিপুরে দুটি সিনেমা হল ছিল। সে সিনেমাগুলোয় যে সিনেমা চলত, সেগুলো আমরা স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে দেখতাম। পাশাপাশি টেলিভিশনে সাপ্তাহিক ধারাবাহিক নাটক দেখতাম। মাধ্যমিকের ষষ্ঠ বা সপ্তম শ্রেণী থেকেই মনে হয়েছে যে আমাকে যদি কখনো টেলিভিশন স্ক্রিনে দেখা যেত, খুব ভালো লাগত। এরপর সারা জীবন সে স্বপ্নের পথে হেঁটেছি। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সময় পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনও করতাম। অনার্সে থাকাকালে একটি কোচিং সেন্টারে পড়াতাম। যদি অভিনয় পেশা হিসেবে না নিতাম, সম্ভবত শিক্ষকতা পেশা বেছে নিতাম।

ভবিষ্যতে নির্মাণ বা প্রযোজক হিসেবে আসার চিন্তা আছে কি? অভিনয় ক্যারিয়ার নিয়ে পরিকল্পনা কী?

ভবিষ্যতে নির্মাণ বা প্রযোজক হিসেবে আসার এখন পর্যন্ত কোনো পরিকল্পনা নেই। নির্মাণ কাজকে আমি গুরুদায়িত্ব মনে করি। নিজেকে পরিচালক হিসেবে যোগ্য মনে করি না। প্রযোজক হিসেবে আসার সম্ভাবনাও নেই, কারণ প্রযোজনা করার জন্য অর্থশালী হতে হয়। আমি সীমিত উপার্জনের মানুষ; প্রযোজনা করার মতো অর্থ আমার নেই। তাই প্রযোজক হিসেবে যাওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ।

অভিনয় ক্যারিয়ার নিয়ে আগামী পরিকল্পনা?

ক্যারিয়ার নিয়ে বিশেষ কোনো পরিকল্পনা নেই। যতদিন বেঁচে আছি এবং সুস্থ আছি, অভিনয়ের সঙ্গে থাকতে চাই। এ সময়ের মধ্যে যে কাজের প্রস্তাব আসবে, তার মধ্যে যা ভালো লাগবে, সেগুলোর সঙ্গে যুক্ত হব। যেমনটি গত ২০ বছরে হয়েছে। আমি আসলে পরিকল্পনা করে কিছু করতে পারি না।

কাজের চাপ কম থাকলে কী করতে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন?

কাজের চাপ কম থাকলে বাকি সময় পরিবারকে দিই। মাসের ৩০ দিনে পাঁচদিন কাজের জন্য, বাকি ২৫ দিন আমার পরিবার ও ব্যক্তিজীবনের জন্য। আমি খুব কম কাজ করি—বছরে হয়তো দুটো বা তিনটি। কাজের বাইরের সময় পরিবারে কাটাই, গান শুনি, সিনেমা দেখি, বারান্দার ছোট জায়গা উপভোগ করি। এসবের মধ্যেই কাটে আমার কাজের বাইরের সময়।