মার্কিন গায়ক প্রিন্স রজার্স নেলসন। তিনি প্রিন্স নামেই বেশি পরিচিত। এজরা এডেলম্যান তাকে নিয়ে নির্মাণ করেন তথ্যচিত্র ‘প্রিন্স’। প্রচার হওয়ার কথা নেটফ্লিক্সে। কিন্তু বহুল প্রতীক্ষিত তথ্যচিত্রটি এ ওটিটি প্লাটফর্ম বাতিল করেছে। এ ঘটনা একটি গভীর সংকটকে স্পষ্ট করে। কেননা তারকাদের নিয়ে এখনকার অধিকাংশ তথ্যচিত্র হয়ে উঠছে একঘেয়ে, প্রচারমূলক ও অপ্রিয় সত্য তুলে ধরার সাহস হারাচ্ছে।
এডেলম্যান অস্কার জিতেছিলেন ‘ও.জে.: মেড ইন আমেরিকা’ দিয়ে। তিনি নেটফ্লিক্সের জন্য প্রিন্সের ওপর একটি ৯ ঘণ্টা দৈর্ঘ্যের তথ্যচিত্র তৈরি করছিলেন। এতে ছিল তার ব্যক্তিগত আর্কাইভের দৃশ্যায়ন এবং তার ঘনিষ্ঠজনদের সাক্ষাৎকার। প্রাথমিকভাবে এটি কয়েকজন দেখেছেন। তারা জানান, এ তথ্যচিত্রে প্রিন্সের প্রতিভা যেমন উঠে এসেছে, তেমনই তার অন্ধকার দিকও আছে। নারী সঙ্গীদের প্রতি মানসিক নির্যাতন ও কড়া ব্যান্ডলিডার হিসেবে তার নিষ্ঠুরতাও স্পষ্টভাবে উপস্থাপন হয়েছে।
কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে প্রিন্সের এস্টেট (সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ) এ তথ্যচিত্র নিয়ে আপত্তি জানায়। তাদের আপত্তির মুখে নেটফ্লিক্স পুরো প্রকল্পটি বাতিল করে দেয়। তারা এখন এস্টেট অনুমোদিত নতুন একটি তথ্যচিত্র তৈরি করবে। এটিকে অনেকেই বানোয়াট সংস্করণ বলে মনে করছেন।

এ ঘটনার মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে, আজকের সেলিব্রিটি ডকুমেন্টারির জগতে বাস্তব চিত্র তুলে ধরার সাহস কমে যাচ্ছে। নেটফ্লিক্স, ডিজনি+, অ্যামাজনের মতো প্লাটফর্মগুলো ভরে গেছে অনুমোদিত ও পুঁজিনির্ভর ডকুমেন্টারিতে, যেগুলোর উদ্দেশ্য সত্য উদ্ঘাটন নয়, বরং ব্র্যান্ড রক্ষা করা।
সমস্যা এটা নয় যে এসব প্রজেক্ট তারকা বা তাদের প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নিয়ে তৈরি হচ্ছে। বরং সমস্যা হলো, এগুলোই এখন বাজার দখল করে নিচ্ছে। ফলে সাহসী, স্বাধীন প্রকল্পগুলো পেছনে পড়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সেলিব্রিটিরা নিজেরাই এসব প্রজেক্ট প্রযোজনা করছেন, ফলে তথ্যচিত্র হয়ে দাঁড়ায় আত্মপ্রশংসার মাধ্যম।
হ্যারি অ্যান্ড মেগানকে উদাহরণ হিসেবে আনা যায়। এ নেটফ্লিক্স সিরিজটি হ্যারি ও মেগানের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নির্মিত, যা এক ধরনের আত্মমিথ্যাচার হয়ে দাঁড়িয়েছে। টেইলর সুইফটের ‘মিস আমেরিকানা’ তার নিজের দৃষ্টিভঙ্গির চিত্র দেখায়। অন্যদিকে ‘এরাস ট্যুর’ সিনেমা তো তিনি নিজেই প্রযোজনা করেছেন। এমনকি হিলারি ক্লিনটনের ওপর হুলুর একটি সিরিজও তার অনুমোদনে, তার বাছাই করা টিম দিয়ে নির্মিত।
এ তথাকথিত ‘নিরাপদ’ ডকুমেন্টারিগুলোর বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে কোয়েস্টলাভের ‘স্লাই লাইভস’, যা কিংবদন্তি স্লাই স্টোনকে ঘিরে নির্মিত। তথ্যচিত্রটি খোলাখুলি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক আলোচনার মাধ্যমে গভীর এক চিত্র ফুটিয়ে তোলে। অন্যদিকে ‘বিকামিং লেড জ্যাপলিন’ ব্যান্ড অনুমোদিত হওয়ায় যৌন নিপীড়ন বা চৌর্যবৃত্তির মতো বিষয় এড়িয়ে গেছে।
আরো ভয়ংকর প্রবণতা হলো কিছু তথ্যচিত্র আদৌ মুক্তি পায় না বা হারিয়ে যায়। যেমন ‘লিভিং নেভারল্যান্ড’। এটি মাইকেল জ্যাকসনের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ধরেছিল। তথ্যটিত্রটি এখন স্থায়ীভাবে স্ট্রিমিং থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এর দ্বিতীয় পর্ব ইউটিউবে মুক্তি পেলেও তেমন আলোড়ন তুলতে পারেনি।
এ ধরনের চাপের প্রতিফলন বইয়ের জগতেও দেখা যায়। সাংবাদিক মার্কাস জে মুর ‘ডি লা সোল’ ব্যান্ড নিয়ে একটি বই লেখেন। ব্যান্ডটি প্রকাশ্যে বইটিকে প্রত্যাখ্যান করে এবং আইনি ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দেয়। এমনকি ফেসবুকের মূল সংস্থা মেটা তাদের এক সাবেক কর্মীর স্মৃতিকথা প্রচারে বাধা দেয়ার চেষ্টা করে।
এ ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, আজকের ডকুমেন্টারি দুনিয়ায় সাংবাদিকতা আর ‘পিআর’-এর মধ্যে পার্থক্য মুছে যাচ্ছে। প্লাটফর্মগুলো শুধু তখনই কনটেন্ট তৈরি ও প্রকাশের সুযোগ পায়, যখন তারা সেলিব্রিটিদের পছন্দমতো কনটেন্ট তৈরি করে। এতে করে সাহসী ও সত্যনিষ্ঠ তথ্যচিত্রের অর্থায়ন ও মুক্তি আরো কঠিন হয়ে পড়ছে।
রাজনৈতিক পরিস্থিতিও এর সঙ্গে যুক্ত। ট্রাম্প পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর মিডিয়া কোম্পানিগুলো আরো সতর্ক হয়ে উঠেছে। এবিসি নিউজ ট্রাম্পের মামলায় ১৫ মিলিয়ন ডলারে মীমাংসা করে নেয়। ‘সিক্সটি মিনিটস’-এর নির্বাহী প্রযোজক সাংবাদিকতার মান বজায় রাখতে না পেরে পদত্যাগ করেন।
ফলে যখন ট্রাম্পভিত্তিক ডকুমেন্টারি ‘দি অ্যাপ্রেন্টিস’ মুক্তি পেতে যাচ্ছিল, তখন বড় বড় স্টুডিওগুলো সাহস না দেখিয়ে পিছিয়ে যায়। শেষে ছোট সংস্থা ব্রায়ারক্লিফ এন্টারটেইনমেন্ট এগিয়ে আসে। একইভাবে ফিলিস্তিনিদের জীবন নিয়ে নির্মিত ‘নো আদার ল্যান্ড’ অস্কার জেতা সত্ত্বেও এখনো যুক্তরাষ্ট্রে কোনো বড় বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান পায়নি।
অন্যদিকে অ্যামাজন প্রাইম ৪০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে মেলানিয়া ট্রাম্পকে নিয়ে এক ‘ভ্যানিটি প্রজেক্ট’ নির্মাণ করছে, যেখানে তিনিই অর্থ উপার্জন করবেন এবং সৃজনশীল অংশীদারও থাকবেন। এ পরিস্থিতির ফলে ডকুমেন্টারি জগতে সাংবাদিকতা, স্বাধীনতা ও সত্য প্রকাশের জায়গা সংকুচিত হচ্ছে। এখনকার অনেক ডকুমেন্টারি শুধু তারকাদের প্রশংসা করে, কিন্তু সত্য প্রকাশে ভয় পায়।
এজরা এডেলম্যান যেমন বলেছেন, ‘দর্শককে এখন খাদ মেশানো কনটেন্ট পরিবেশন করা হচ্ছে’। যদি ক্ষমতার কেন্দ্র—সেলিব্রিটি এস্টেট, বিলিয়ন ডলারের মিডিয়া কোম্পানি ও রাজনৈতিক শক্তি—থেকে সরে গিয়ে নির্মাণ ও প্রকাশের স্বাধীনতা না ফেরে, তাহলে সত্য প্রকাশে ইচ্ছুক শক্তিশালী ডকুমেন্টারিগুলো ভবিষ্যতেও বাতিল হতে থাকবে।
দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত জ্যাক শনফিল্ডের প্রতিবেদন অবলম্বনে মাহমুদুর রহমান










