নেটফ্লিক্সে ২০২১ সালে মুক্তি পায় ‘মীনাক্ষী সুন্দরেশ্বর’। সানিয়া মালহোত্রা ও বিবেক দাসানি অভিনীত সিনেমা অনেকটাই ‘মডার্ন প্রবলেম’-এর গল্প। কিন্তু সিনেমা দেখতে গিয়ে সবসময় সেটাকে (সেসব) ‘প্রবলেম’ মনে হয় না। মনে হয় অবস্থা বা পরিস্থিতি। যেমন এ সিনেমার একটা বড় বিষয় ছিল ‘লং ডিসট্যান্স রিলেশনশিপ’। অঞ্চলভিক্তিক সাংস্কৃতিক পার্থক্যের পাশে এ বিষয়ই একসময় মূল হয়ে ওঠে। বলিউডে নির্মাণ হয়েছিল ‘বারেলি কি বরফি’, ‘ড্রিম গার্ল’, ‘বালা’, ‘শুভ মঙ্গল সাবধান’, ‘ভিকি ডোনার’, ‘টু স্টেটস’, ‘বদ্রিনাথ কি দুলহানিয়া’, ‘মিসেস’, ‘পাগলাইত’ ইত্যাদি সিনেমা যা রম-কম থেকে জীবন জটিলতায় চলে যায়। বলিউডের চেনা এসব রম-কমের নানা বিষয় মিলেই বিবেক সোনির ‘আপ জ্যায়সা কোই’।
আয়ুষ্মান অভিনীত ‘বালা’য় (২০১৯) দর্শক দেখেছিল অল্প বয়সে চুল পড়ে গিয়ে বিয়ে না হওয়া এক পুরুষের কথা। বর্তমান সিনেমায় আমরা দেখি সংস্কৃতির শিক্ষক শ্রী চল্লিশের কোটা পার করেও অবিবাহিত, রীতিমতো ‘কুমার’ (কুমারী বলতে যা বোঝায় তার কোনো পুরুষবাচক শব্দ নেই)। একটা ছোট ব্যাক স্টোরি আছে তার, কিন্তু বিয়ে না হওয়ার পেছনে সে ‘অভিশাপ’ বিশ্বাসযোগ্য কোনো বিষয় না। এর বাইরে বাস্তবের নিরিখে দেখা যায়, নানা কারণেই পাত্রী পছন্দ হয় না শ্রীর কিংবা পাত্রী তাকে পছন্দ করে না। অতঃপর একটি ডেটিং অ্যাপ খোলে সে। সেখানে কথা হয় কারো কারো সঙ্গে। একটা সময় কুসুম ভাবির প্রতিবেশীর মাধ্যমে প্রস্তাব আসে। কফি হাউজে দেখা হয় মধু বোসের সঙ্গে।

মধু বোস ফ্রেঞ্চ শিক্ষক। সুন্দরী ও আধুনিকা। শ্রীর বিশ্বাস হয় না এ মেয়ে তাকে আসলেই পছন্দ করেছে, কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় মধু তাকে সত্যিই পছন্দ করে। দুই পরিবারের দেখা হয়। বিয়ে ঠিক হয়। কিন্তু এনগেজমেন্টের দিন জানা গেল, সেই ডেটিং অ্যাপে শ্রীর সঙ্গে একদিন মধুর কথা হয়েছিল। শ্রী বিষয়টি মানতে পারে না। বিয়ে ভেঙে দেয়। কিন্তু মধু তাকে বলে, তাহলে অন্য পুরুষদের সঙ্গে শ্রীর পার্থক্য কী হলো। যে ডেটিং অ্যাপে মধু ছিল সেখানে শ্রীও ছিল। তাহলে দোষ কেবল মধুর কেন হবে? তাছাড়া একদিন সেখানে শ্রীর সঙ্গে কথা হওয়ার পরই মধু নিজে শ্রীকে খুঁজে নিয়েছে।
সিনেমার শ্রী ত্রিপাঠি বসবাস করে জামশেদপুরে। তার বড়ভাই রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী। সংস্কৃতির ধার ধারেন না। কিন্তু পুরনো সংস্কারে বিশ্বাসী। তার স্ত্রী কুসুম ভালো আচার বানান, কিন্তু তাকে আচার নিয়ে ব্যবসা করার ‘অনুমতি’ দেয় না ভানু ত্রিপাঠি। এমনকি মেয়ে বিদেশে পড়তে যাওয়ার সুযোগ পেলেও তাকে ঘরের কাজ শেখায় বেশি মন দিতে বলেন। অন্যদিকে মধুর পরিবারের বাস কলকাতায়। দাদি সংগীত শেখান ছোটদের। পুরো পরিবারই তথাকথিত সাংস্কৃতিক ও ‘প্রগতিশীল’। দুই পরিবারের বৈপরীত্যের মধ্যেই তারা সম্পর্ক তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং এ বৈপরীত্য বেশ ভালোভাবেই ফুটিয়ে তুলেছেন বিবেক সোনি। তবে সিনেমাটি দেখতে গিয়ে দর্শকের মনে পড়তে পারে ২০১৪ সালে মুক্তি পাওয়া অভিষেক বর্মণের ‘টু স্টেটস’।
আবার এ সিনেমায় আছে ড্রিম গার্লের কনসেপ্ট। সে সিনেমায় আয়ুষ্মান নারী কণ্ঠে কথা বলে। আপ জ্যায়সা কোইতে সে রকম কিছু না থাকলেও ডেটিং অ্যাপে অ্যানোনিমাস কথা বলার বিষয়টি কাছাকাছি ঘরানারই বিষয়। অন্যদিকে ২০২৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘রকি অউর রানি কি প্রেম কাহানি’ মনে পড়ার সম্ভাবনা বেশি। কেননা সেখানেও রানির পরিবারটি ছিল কলকাতার এবং একইভাবে প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক। দুই সিনেমায় কলকাতার পরিবার উপস্থাপন করার কিছু বিষয় মিলে যায়। তবে রকি আর শ্রী একেবারেই ভিন্ন।
সিনেমায় মধু এ সময়ের ‘স্বাধীন’ নারীর প্রতিচ্ছবি। মধু তার নিজের সম্পর্কে স্পষ্ট। তার বিশ্বাস সম্পর্কেও সে স্পষ্ট। প্রকাশে তার কোনো লুকোছাপা নেই। এমনকি শ্রীর প্রতি ভালোবাবাসা প্রকাশেও সে স্পষ্ট। কিন্তু শ্রীর মধ্যে এসব নেই।
বিবেক সোনিই ২০২১ সালে নির্মাণ করেছিলেন মীনাক্ষী সুন্দরেশ্বর। দুই সিনেমায় কিছু মিল আছে। যেমন সিনেমার আবহ একই রকম। রোমান্টিক আবহ, প্রধান দুই পাত্র-পাত্রীর মধ্যকার রসায়নের সঙ্গে দর্শক নিজেকে যুক্ত করতে পারবেন। সেই সঙ্গে ক্যামেরার কাজ, সিনেমাটোগ্রাফি ও দৃশ্যের সঙ্গে সংগীতের ব্যবহারও তাদের মুগ্ধ করবে।
এ সিনেমায় অবধারিতভাবে একসময় পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। বিশেষত যখন শ্রী মধুকে ‘মাফ’ করার কথা বলে। একইভাবে ভানু ত্রিপাঠি বলে ‘কুসুম’কে। সিনেমাটি দর্শককে দেখায় নারীর প্রতি পুরুষের প্রচলিত পুরনো ভুল ধারণা, যেখানে স্বামী মনে করে স্ত্রীর সীমা ও বাবা মনে করে কন্যার সীমা ঠিক করে দেয়া তাদের অধিকার। এ পর্যায়ে স্মরণ করা যায় গুণিত মোঙ্গার ‘পাগলাইত’ বা আরতী কাদবের মিসেস (২০২৩)।
তবে সিনেমাটি উপভোগ্য হয়ে ওঠে আর মাধবন (শ্রী) ও ফাতিমা সানা শেখের (মধু) অভিনয়ে। সেই সঙ্গে তাদের দারুণ সাপোর্ট করেছেন আয়েশা রাজা (কুসুম), ভানু ত্রিপাঠি (মনীশ চৌধুরী), নমিত দাস (দীপু), সাহেব চ্যাটার্জি (জয়), অনন্যা চ্যাটার্জি (সোনা) ও বীণা ব্যানার্জি (মধুর মাতামহী)। এছাড়া দেবজিৎ রায়ের সিনেমাটোগ্রাফি এবং জাস্টিন প্রভাকর ও রোচাক কোহলির সংগীত এ সিনেমার বড় শক্তি। সব মিলিয়ে ভারতীয় (বলিউড) রম-কমের সংশ্লেষ হলেও সিনেমাটি ‘ফিল গুড’ ও ‘ওয়ান টাইম ওয়াচ’ হিসেবে ভালো।










