গোলাম মোহাম্মদ ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা-পরবর্তী অন্যতম প্রতিভাবান সংগীত পরিচালক। কিন্তু জীবদ্দশায় ছিলেন অবহেলিত। ‘পাকিজা’ ও ‘মির্জা গালিব’-এর মতো কালজয়ী চলচ্চিত্রে সুরারোপ করলেও আলোচনার কেন্দ্রে কখনই আসতে পারেননি। তার সুর আজও ভারতীয় সংগীতাঙ্গনে সমহিমায় উজ্জ্বল। কিন্তু তিনি নিজে প্রায় বিস্মৃত, জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে দারিদ্র্য ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। পাকিজা মুক্তির কয়েক বছর আগেই তিনি খাদ্য ও ওষুধের অভাবে মৃত্যুবরণ করেন। কখনো নিজের সাফল্যের ফল ভোগ করতে পারেননি
প্রাথমিক জীবন ও ১০০ টাকা বেতনের চাকরি
গোলাম মোহাম্মদ ১৯০৫ সালে ভারতের রাজস্থানের বিকানের জেলার নাল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা নবী বক্স ছিলেন একজন বিশিষ্ট তবলা বাদক। শৈশবে বাবার কাছেই গোলাম মোহাম্মদ সংগীতের প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। বাবার তত্ত্বাবধানে তিনি ঢোল, তবলা ও পাখোয়াজ বাজাতে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। একবার তিনি তৎকালীন জুনাগড় রাজ্যে সংগীত পরিবেশন করতে গেলে এক মন্ত্রী তার বাজানো দেখে এতই মুগ্ধ হন যে তাকে একটি স্বর্ণমণ্ডিত তলোয়ার উপহার দেন।
ইন্ডিয়া এক্সপ্রেসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ১৯২৪ সালে গোলাম মোহাম্মদ সংগীতজীবনের সন্ধানে বোম্বেতে (বর্তমান মুম্বাই) চলে যান। সেখানে আট বছরের সংগ্রামের পর মাসে মাত্র ১০০ টাকা বেতনে তিনি প্রথম সুযোগ পান একজন তবলা বাদক হিসেবে। তার প্রথম দিকের কাজের মধ্যে ছিল রোজ মুভিটোনের ভারতীয় পৌরাণিক চলচ্চিত্র ‘রাজা ভর্তারি’ ১৯৩২। পরে আরেক কিংবদন্তি সংগীত পরিচালক নওশাদের সহকারী হিসেবে ১২ বছরের বেশি সময় কাজ করেন এবং তার কাছেই চলচ্চিত্র সংগীত রচনার সূক্ষ্ম কাজগুলো শেখেন। ১৯৪৭ সালে টাইগার কুইন চলচ্চিত্রের মাধ্যমে স্বাধীন সংগীত পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এরপর গোলাম মোহাম্মদ বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করেন, এর মধ্যে অন্যতম ছিল মধুবালা অভিনীত ‘পরদেশ’। এ ছবিতে তার সুরে লতা মঙ্গেশকর গেয়েছিলেন ‘জিয়া লাগে নাহি মোরা’ এবং ‘রাত হায় তারন ভারি’ গান। পরের কাজ ‘লাড়কি’ (১৯৫২), আম্বর (১৯৫২) ও ‘দিল-এ-নাদান’ (১৯৫৩)। সে সময় তার সুর ও গায়কী সমালোচকদের প্রশংসা পেলেও বাণিজ্যিক সাফল্য তেমনভাবে ছুঁতে পারেননি। জীবনের বেশির ভাগ সময়ই তিনি অর্থকষ্টে দিন কাটিয়েছেন।
মির্জা গালিব ও জাতীয় পুরস্কার
১৯৫৪ সালে মির্জা গালিব চলচ্চিত্রের জন্য সেরা সংগীত পরিচালক হিসেবে গোলাম মোহাম্মদ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের সম্মান অর্জন করেন। বিখ্যাত উর্দু কবির জীবনের ওপর নির্মিত এ ছবিতে তার সুর করা চিরন্তন গজল ‘দিল-এ-নাদান তুজে’, ‘ফির মুঝে দিদা-এ-তার’ এবং ‘আহ্ কো চাহিয়ে এক উমর’ বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ছবিটি রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রদর্শিত হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ব্যক্তিগতভাবে ছবির সংগীতের প্রশংসা করেন, এ সুরকে মির্জা গালিবের প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধার্ঘ্য বলে অভিহিত করেন।
পাকিজা র সাফল্য দেখার আগেই মৃত্যু
জাতীয় স্বীকৃতি পাওয়ার পরও গোলাম মোহাম্মদের কর্মজীবনে খুব উন্নতি আসেনি। ১৯৫৬ সালের পর কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়; পরবর্তী কয়েক বছর মাত্র একটি চলচ্চিত্রে কাজের সুযোগ পান। ১৯৬২ সালে পরিচালক কামাল আমরোহি তাকে ‘পাকিজা’ সিনেমার সংগীত পরিচালনার দায়িত্ব দিলে তার জীবনে নতুন আশার আলো জ্বলে।
তিনি এ ছবির সংগীতে প্রাণ ঢেলে কাজ করেন, এত গান তৈরি করেছিলেন যে শেষে পরিচালককে তিনটি গান বাদ দিতে হয়। কিন্তু বিভিন্ন কারণে পাকিজার মুক্তি বিলম্ব হয়, আর এ সময়ই গোলাম মোহাম্মদের শারীরিক অবস্থা অবনতির দিকে যায়। ১৯৬৮ সালে তিনি মারা যান। ছবিটির ব্যাকগ্রাউন্ড সংগীত পরে তার বন্ধু ও সাবেক গুরু নওশাদ সম্পন্ন করেন। পাকিজা মুক্তি পায় গোলাম মোহাম্মদের মৃত্যুর চার বছর পর ১৯৭২ সালে।
মুক্তির পর সিনেমাটি হয়ে ওঠে ভারতীয় চলচ্চিত্রের সংগীত জগতের অমর কীর্তি। ‘ইনহি লগন নে’, ‘ঠাড়ে রাহিয়ো’, ‘চলতে চলতে’, ‘মৌসুম হ্যায় আশিকানা’, ‘তীর-এ-নজর’, ‘নজরিয়া কি মারি’ এসব গান আজও ভারতীয় সংগীতের শ্রেষ্ঠ ঐতিহ্যের অংশ।
অভিনেতা প্রাণ কৃষাণ সিকান্দের প্রতিবাদ
১৯৭২ সালে অভিনেতা প্রাণ কৃষাণ ‘বেঈমান’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড পান, কিন্তু তিনি পুরস্কার গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। তার মতে, পাকিজার অসাধারণ সংগীতের জন্য প্রকৃত সম্মান গোলাম মোহাম্মদের প্রাপ্য ছিল। কিন্তু সে বছর সেরা সংগীত পরিচালকের পুরস্কার যায় শঙ্কর–জয়কিশানের হাতে (সিনেমা: বেইমান), কিন্তু প্রাণ প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন যে এ সম্মান আসলে প্রয়াত গোলাম মোহাম্মদেরই প্রাপ্য।
গোলাম মোহাম্মদের জীবন যেন শিল্পীর নিঃস্বার্থ সাধনার এক মর্মস্পর্শী প্রতীক। জীবদ্দশায় খ্যাতির আলো দেখা দেয়নি। জীবনভর দরিদ্রতা ও শেষ প্রান্তে অসুস্থতা তাকে পরাজিত করলেও তার সুর আজও সময়ের দেয়াল ভেদ করে অনুরণিত হয়। গোলাম মোহাম্মদের মতো মহাপ্রতিভা ও তার সৃষ্টি কখনো মরে না, শিল্পই তাকে অমর করে রাখে।










